আবদুল বাছেদ

খবরটা প্রথমে টাচ করেনি। চলে গেলেন বেলা টার—এই বাক্যটা যেন একটু ধীরে চৈতন্যে এসে ঠেকল। তারপর মনে হলো, এই মানুষ তো সময়কে থোড়াই কেয়ার করেছেন, লেন্সের সামনে সময়কে দাঁড় করিয়ে সব তরিকায় অপদস্থ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর হজম হতে কিছুটা সময় নেওয়াই বরং স্বাভাবিক। আর তিনি তো ২০১১ সালেই চলে গিয়েছিলেন তুরিন হর্সের পর আর কোনো সিনেমা না বানানোর ঘোষণা দিয়ে। আজ তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা।
বেলা টারের সিনেমা দেখতে বসলে মিস্টার টাইমকে বলে দিতাম, গেট আউট। সময় গুনলে তার সিনেমা দেখা যায় না। সেখানে মানুষ হাঁটে, বাতাস বয়, দরজা খোলে, কিন্তু আসলে কিছুই ঘটে না। আবার সবকিছুই ঘটে। এই ‘না-ঘটা’র মধ্যেই বেলা টারের জায়গা। দৃশ্যপট যখন দ্রুত হতে চায়, তখন তিনি ক্যামেরাকে থামিয়ে দেন। এই থামানোর মধ্যে এক বিদ্রোহী রাজনীতি রয়েছে বটে।
সেই রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের এক আত্মজিজ্ঞাসার আশ্রয় নিতে হবে। বেলা তারের মতো চলচ্চিত্রকারের জন্ম পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির মতো জায়গায় কেন হলো? যেখানে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের বিকাশ, তার পতন ও মুক্তবাজারের আগ্রাসন—সিরিজটি চলছেই। বেলা টারের সিনেমা কি সেই দুর্বিষহ পরিক্রমার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ? হতে পারে, কেননা তাঁর সিনেমার নিরাশা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; সেটা ঐতিহাসিক। তাঁর দীর্ঘ শটগুলো যেন বলে—দেখো, সময় থামেনি, তাকে তাল দিতে গিয়ে মানুষ আশাহীন হয়ে গেছে।

শিল্পবিপ্লব ইউরোপকে গতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই গতিই একসময় বোঝা হয়ে উঠল। মানুষ যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজের ভেতরটা হারাতে শুরু করল। বেলা টারের সিনেমা কী সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরিয়ে আনার এক জেদি চেষ্টা। নিছক নস্টালজিয়া? সেই সমালোচনা হতেই পারে। তবে আজ সেই ক্ষণ নয়। আজ বেলা টার নেই। কিন্তু নৈঃশব্দটা থেকে গেল। সেটাই প্রাসঙ্গিক হোক।
ইউরোপীয় শিল্পচর্চার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ওরা নিজেদের সভ্যতাকেই প্রশ্ন করে। ধর্ম, বিজ্ঞান, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, প্রগতি—এই প্রত্যয়গুলোকে তারা ভক্তি করেছে, আবার প্রশ্নের বাণে বিদ্ধও করছে আজ অবধি। বেলা টার সেই ধারারই সন্তান। তিনি সিনেমায় ব্লকবাস্টারগিরি করেননি, প্লট টুইস্ট বা ক্লাইম্যাক্সও রাখেননি। তবে তিনি কি রেখে গেছেন? যার কারণে আমাদের কথা বলতে হয় তাঁর সিনেমা নিয়ে? তিনি শুধু যান্ত্রিক পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর গতির সঙ্গে লেন্সের তাল মেলাতে অস্বীকার করেছেন। এই নীরব অস্বীকৃতিই তাঁকে করে তুলেছে এক বিদ্রোহী। হয়ে উঠেছেন ইউরোপীয় সভ্যতার ক্লান্তির দর্পণ।
আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় কী বেলা টারের মতো কোনো চরিত্র রয়েছে? মাঝে মাঝে আমার এমন প্রশ্ন জাগত। তখন মনে হতো, জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু—তাঁরা কী বেলা টারের এক ভিন্ন প্রতিচ্ছবি? এই বাংলার মাটি ও জলের ছোঁয়ায়? নাকি তা নয়, কেউ আসেনি অমন, শুধু আমরা নিজ সভ্যতাকে প্রশ্ন করতে পারঙ্গম নই বলে?
এই ত্রয়ী কবি তাঁদের সৃষ্টিকর্মে নৈঃশব্দ্যের কিছুটা পরশ আমাদের দিয়ে গেছেন বটে। জীবনানন্দ ধানসিঁড়ির ধারে এক নিশ্চল বিকেলকে রেখে গেছেন। বিনয় মজুমদার তো প্রেমকেও হিসাবের ভেতর ফেলে দেখতেন। দূরত্ব, পুনরাবৃত্তি, ক্লান্তি—সবকিছু এত নির্লিপ্তভাবে লিখতেন। শেষে গিয়ে কেবল মানুষের একাকিত্বটাই রয়ে যায়।
আর উৎপল কুমার বসুকে পড়লে একটা অস্বস্তি হয়। মনে হয়, আমাকে কেউ ইচ্ছা করে কবিতাটার ভেতর ঢুকতে দিচ্ছে না। বরং ঢুকবার ইচ্ছাকেই প্রবল করে তুলছে। বেলা টারের সিনেমাও ঠিক তেমনি অমোঘ। সে দর্শককে ডাকে না, অনুরোধ করে না। তুমি যদি থাকতে পারো, থাকো, না পারলে ফটক খোলা। তবে তাঁর সিনেম্যাটোগ্রাফিকে এড়ানো কি অতই সোজা?
আমার ধারণা, তাঁরা সবাই জানতেন, থামতে না পারলে শিল্প নষ্ট হয়। তাই তাঁরা থেমেছিলেন, স্বকীয়তায় ও স্ব-মহীমায়। বেলা টার ২০১১ সালের পর আর সিনেমা বানাননি। বলেছিলেন, ভাষার কাজ শেষ। এই কথা আমাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়। কারণ, আমরা এমন সমাজে থাকি, যেখানে থামা মানেই হার।
বাংলাদেশের সিনেমা এখনো গল্পপ্রধান, তবু সেই গল্পের শরীরও আজকাল বেশ কৃশকায়। এখনো এখানকার সিংহভাগ দর্শককে নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য দেখানোর চেষ্টা করলে হল ছেড়ে পালাবে। বেরিয়ে ভাঙচুর করবে বৈকি। বলবে, টাকাটা জলে গেল। অথচ আমাদের জীবনটাই তো অপেক্ষা আর নিঃশব্দে ভরা। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস—আমরা কবে স্ক্রিনে সেই রূঢ় জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শিখব, স্বাদ আস্বাদন করতে শিখব বিষাদ ও শূন্যতার, ভাবব এর থেকে পরিত্রাণ নিয়ে।

খবরটা প্রথমে টাচ করেনি। চলে গেলেন বেলা টার—এই বাক্যটা যেন একটু ধীরে চৈতন্যে এসে ঠেকল। তারপর মনে হলো, এই মানুষ তো সময়কে থোড়াই কেয়ার করেছেন, লেন্সের সামনে সময়কে দাঁড় করিয়ে সব তরিকায় অপদস্থ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর হজম হতে কিছুটা সময় নেওয়াই বরং স্বাভাবিক। আর তিনি তো ২০১১ সালেই চলে গিয়েছিলেন তুরিন হর্সের পর আর কোনো সিনেমা না বানানোর ঘোষণা দিয়ে। আজ তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা।
বেলা টারের সিনেমা দেখতে বসলে মিস্টার টাইমকে বলে দিতাম, গেট আউট। সময় গুনলে তার সিনেমা দেখা যায় না। সেখানে মানুষ হাঁটে, বাতাস বয়, দরজা খোলে, কিন্তু আসলে কিছুই ঘটে না। আবার সবকিছুই ঘটে। এই ‘না-ঘটা’র মধ্যেই বেলা টারের জায়গা। দৃশ্যপট যখন দ্রুত হতে চায়, তখন তিনি ক্যামেরাকে থামিয়ে দেন। এই থামানোর মধ্যে এক বিদ্রোহী রাজনীতি রয়েছে বটে।
সেই রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের এক আত্মজিজ্ঞাসার আশ্রয় নিতে হবে। বেলা তারের মতো চলচ্চিত্রকারের জন্ম পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির মতো জায়গায় কেন হলো? যেখানে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের বিকাশ, তার পতন ও মুক্তবাজারের আগ্রাসন—সিরিজটি চলছেই। বেলা টারের সিনেমা কি সেই দুর্বিষহ পরিক্রমার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ? হতে পারে, কেননা তাঁর সিনেমার নিরাশা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; সেটা ঐতিহাসিক। তাঁর দীর্ঘ শটগুলো যেন বলে—দেখো, সময় থামেনি, তাকে তাল দিতে গিয়ে মানুষ আশাহীন হয়ে গেছে।

শিল্পবিপ্লব ইউরোপকে গতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই গতিই একসময় বোঝা হয়ে উঠল। মানুষ যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজের ভেতরটা হারাতে শুরু করল। বেলা টারের সিনেমা কী সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরিয়ে আনার এক জেদি চেষ্টা। নিছক নস্টালজিয়া? সেই সমালোচনা হতেই পারে। তবে আজ সেই ক্ষণ নয়। আজ বেলা টার নেই। কিন্তু নৈঃশব্দটা থেকে গেল। সেটাই প্রাসঙ্গিক হোক।
ইউরোপীয় শিল্পচর্চার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ওরা নিজেদের সভ্যতাকেই প্রশ্ন করে। ধর্ম, বিজ্ঞান, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, প্রগতি—এই প্রত্যয়গুলোকে তারা ভক্তি করেছে, আবার প্রশ্নের বাণে বিদ্ধও করছে আজ অবধি। বেলা টার সেই ধারারই সন্তান। তিনি সিনেমায় ব্লকবাস্টারগিরি করেননি, প্লট টুইস্ট বা ক্লাইম্যাক্সও রাখেননি। তবে তিনি কি রেখে গেছেন? যার কারণে আমাদের কথা বলতে হয় তাঁর সিনেমা নিয়ে? তিনি শুধু যান্ত্রিক পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর গতির সঙ্গে লেন্সের তাল মেলাতে অস্বীকার করেছেন। এই নীরব অস্বীকৃতিই তাঁকে করে তুলেছে এক বিদ্রোহী। হয়ে উঠেছেন ইউরোপীয় সভ্যতার ক্লান্তির দর্পণ।
আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় কী বেলা টারের মতো কোনো চরিত্র রয়েছে? মাঝে মাঝে আমার এমন প্রশ্ন জাগত। তখন মনে হতো, জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু—তাঁরা কী বেলা টারের এক ভিন্ন প্রতিচ্ছবি? এই বাংলার মাটি ও জলের ছোঁয়ায়? নাকি তা নয়, কেউ আসেনি অমন, শুধু আমরা নিজ সভ্যতাকে প্রশ্ন করতে পারঙ্গম নই বলে?
এই ত্রয়ী কবি তাঁদের সৃষ্টিকর্মে নৈঃশব্দ্যের কিছুটা পরশ আমাদের দিয়ে গেছেন বটে। জীবনানন্দ ধানসিঁড়ির ধারে এক নিশ্চল বিকেলকে রেখে গেছেন। বিনয় মজুমদার তো প্রেমকেও হিসাবের ভেতর ফেলে দেখতেন। দূরত্ব, পুনরাবৃত্তি, ক্লান্তি—সবকিছু এত নির্লিপ্তভাবে লিখতেন। শেষে গিয়ে কেবল মানুষের একাকিত্বটাই রয়ে যায়।
আর উৎপল কুমার বসুকে পড়লে একটা অস্বস্তি হয়। মনে হয়, আমাকে কেউ ইচ্ছা করে কবিতাটার ভেতর ঢুকতে দিচ্ছে না। বরং ঢুকবার ইচ্ছাকেই প্রবল করে তুলছে। বেলা টারের সিনেমাও ঠিক তেমনি অমোঘ। সে দর্শককে ডাকে না, অনুরোধ করে না। তুমি যদি থাকতে পারো, থাকো, না পারলে ফটক খোলা। তবে তাঁর সিনেম্যাটোগ্রাফিকে এড়ানো কি অতই সোজা?
আমার ধারণা, তাঁরা সবাই জানতেন, থামতে না পারলে শিল্প নষ্ট হয়। তাই তাঁরা থেমেছিলেন, স্বকীয়তায় ও স্ব-মহীমায়। বেলা টার ২০১১ সালের পর আর সিনেমা বানাননি। বলেছিলেন, ভাষার কাজ শেষ। এই কথা আমাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়। কারণ, আমরা এমন সমাজে থাকি, যেখানে থামা মানেই হার।
বাংলাদেশের সিনেমা এখনো গল্পপ্রধান, তবু সেই গল্পের শরীরও আজকাল বেশ কৃশকায়। এখনো এখানকার সিংহভাগ দর্শককে নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য দেখানোর চেষ্টা করলে হল ছেড়ে পালাবে। বেরিয়ে ভাঙচুর করবে বৈকি। বলবে, টাকাটা জলে গেল। অথচ আমাদের জীবনটাই তো অপেক্ষা আর নিঃশব্দে ভরা। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস—আমরা কবে স্ক্রিনে সেই রূঢ় জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শিখব, স্বাদ আস্বাদন করতে শিখব বিষাদ ও শূন্যতার, ভাবব এর থেকে পরিত্রাণ নিয়ে।

‘আমেরিকান জীবনযাত্রার ধরন বদলে যেতে চলেছে’—১৯৭৩ সালে বিবিসির তৎকালীন মার্কিন সংবাদদাতা জন হামফ্রিসের এই একটি বাক্যই কাঁপিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বকে। আজ যখন জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন ১৯৭৩ সালের সেই ভয়াবহ অক্টোবর ও তার পরবর্তী ঘটনাবলি এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে সামনে আসে।
১ দিন আগে
সৌন্দর্য শিল্প ছাড়াও যে সম্ভব, সেটা তো খুব স্পষ্ট। সারা পৃথিবীতে সৌন্দর্য ছড়ানো। সৌন্দর্য একটা গাছের পাতার গঠন থেকে সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের যে মেঘের রং—সর্বত্র দেখতে পাই। কিন্তু শিল্প যখন বলি, তখন তা মানুষের সৃষ্টি। সে অর্থে সুন্দর, বৈচিত্র্যে, ব্যাপ্তিতে শিল্পের চেয়ে অনেক বড়।
৬ দিন আগে
মাদারীপুর সদর উপজেলার চরমুগরিয়া বাজার এলাকাটিতে একসময় জাঁকজমক পাটের ব্যবসা ছিল। পাশের কুমার নদ দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলত। সেই জাহাজে পাট বোঝাই করে বিদেশেও নেওয়া হতো। তাই এলাকাটি চরমুগরিয়া বন্দর নামেও পরিচিত। কালের বিবর্তনে সেই ব্যবসা এখন আর নেই।
৭ দিন আগে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফেনী সরকারি কলেজকে তাদের নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। পাকিস্তানি সেনারা এবং তাদের এদেশীয় দোসররা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ফেনী কলেজ মাঠে ধরে আনত এবং অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করত। হত্যার পর লাশগুলোকে তারা মাঠের এক কোণে...
৮ দিন আগে