Ajker Patrika

পরবর্তী আফগানিস্তান হতে চলেছে যে অঞ্চল

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭: ২৯
পরবর্তী আফগানিস্তান হতে চলেছে যে অঞ্চল

আফগানিস্তান দুই দশক শুধু নয়, বলা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এক রকম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য দেশটিকে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দেশটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এখানে একটা আপাত যতি চিহ্ন টেনে দিলেও, তা এই বাস্তবতার সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। এই একই বাস্তবতা বিদ্যমান পশ্চিম আফ্রিকাতেও। এ অবস্থায় এই অঞ্চলও আফগানিস্তানের ভাগ্য বরণ করতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে হওয়া যুদ্ধের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি সংযোগের বিষয়টি আর অপ্রকাশ্য নয়। ফলে যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতার বলি হতে হয় এসব দেশের সৈনিকদের, যার প্রভাব সংশ্লিষ্ট জনসমাজেও পড়ে। ভিন দেশে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত সেনাদের স্মরণের বিষয়টি তাই স্বাভাবিক। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছরের নভেম্বরে যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। এসব ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশের সাড়ে তিন হাজার সেনা, যাঁরা আফগানিস্তানে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। স্মরণ করা হয় আফ্রিকায় প্রাণ হারানো সেনাদেরও।

লন্ডনের সেনোটাফ অথবা প্যারিসের আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফে সমাহিত রয়েছেন আফ্রিকার যুদ্ধে মারা যাওয়া সেনারাও। পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে জিহাদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এসব সেনা। তবে আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ হলেও এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯ হাজার সেনা পশ্চিম আফ্রিকার ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছেন। চলমান এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা নির্ভর করে আফগানিস্তানে নিজেদের ব্যর্থতা থেকে পশ্চিমারা সঠিক শিক্ষা নিতে পারছে কি না, তার ওপর।

কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারে, যেখানে কোনো জাতীয় স্বার্থের চাপ নেই, সেখানে যুদ্ধ না করাই ভালো। তবে বিষয়টি এমন নয় যে, সাহেল অঞ্চলের আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা শুধু পশ্চিম আফ্রিকায় থাকা পশ্চিমা নাগরিক এবং দূতাবাসে হামলা চালায়। যদি তাদের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারা ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে আবার হামলা চালাবে। 

এক পশ্চিমা জেনারেলের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোই এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর লক্ষ্য এবং সংকল্প।

ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, সাহেল অঞ্চলে পশ্চিমাদের অবস্থানের পেছনে এর পাশাপাশি আরও বড় কারণ রয়েছে। ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজার। এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এর মধ্যে কয়েকটিকে ভেঙে ফেলার জন্য বিদ্রোহীদের খুব বেশি চাপ লাগবে না। এতে লাখ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হবে, যাদের মধ্যে অনেকেই শরণার্থী হিসেবে ইউরোপে পালিয়ে যাবে।

তাহলে এই বিপর্যয় কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলেই পারত। কারণ, তাদের অল্প সেনা উপস্থিতি তালেবানকে দমিয়ে রাখতে পারত বেশি হতাহতের ঘটনা ছাড়াই। পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে ফ্রান্সের উচিত হবে সাহেলে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়া।

এদিকে আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতি ও এর লক্ষ্য নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। আফগানিস্তানে একটি পূর্ণ গণতন্ত্র গড়ে তোলার চেষ্টা করা ছিল একটি বোকামির কাজ। সাহেলে এটি করতে কয়েক দশক সময় লাগবে। বরং সেখানে একটি সম্পূর্ণ ‘সামরিক সমাধান’ প্রয়োজন। আর এটি বাস্তবানুগ হতে হবে, যাতে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। নাইজারে ৯০-এর দশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তুয়ারেগের বিরুদ্ধে সেনারা জয় লাভ করে। তখন নাইজারের সেনারা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ তুয়ারেগদের দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মালিতেও ৪০টির বেশি স্থানীয় শান্তি চুক্তি ওই দেশকে সংঘাত থেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে শান্তির এই চুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে, এতে বাইরের শক্তিকে যুক্ত হতে হবে।

আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এ-ও দেখিয়েছে যে, অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও, স্থানীয় জনগণের সমর্থন না থাকলে বিদ্রোহকে পরাস্ত করা কঠিন। সাহেলেও কিন্তু একই ঘটনা ঘটছে। সেখানেও ক্ষমতায় থাকা অংশ, বিশেষত সেনাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি ঘুষ, দুর্নীতি, গণহত্যার অভিযোগ বেসামরিক নাগরিকদের পশ্চিমা-সমর্থিত শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। তাদের জঙ্গি মতাদর্শের দিকে ধাবিত করছে। কিন্তু সরকার এসব সেনাদের বিচার করতে ভয় পায় অভ্যুত্থানের ভয়ে।

এ ক্ষেত্রে নাইজারের দিকে তাকানো যেতে পারে। দেশটির শাসক জাতিগত বিবাদে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রধারী অংশকে নিরুৎসাহিত করতে পেরেছে। দেশটিতে জঙ্গিদের উৎপাত থাকলেও সেখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অনেকটাই কমানো গেছে। এদিকে সোমালিয়ায় বেসামরিক লোকদের হত্যার জন্য উগান্ডা তার দুই শান্তিরক্ষীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি দেখিয়েছে, নির্মম সেনারাও আইনের আওতাধীন এবং তাদের শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আফ্রিকার যুদ্ধের বিষয়ে পশ্চিমা সরকারগুলোকে তাদের ভোটারদের সিদ্ধান্তের প্রতি সৎ হতে হবে। যদি তারা দীর্ঘকালীন যুদ্ধের প্রতি সমর্থন না দেয়, তাহলে আফগানিস্তানের সঙ্গে যা ঘটেছে, আফ্রিকাতেও তাই হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এআইয়ের নাম শুনেই খেপে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীরা

যুবদল ও ছাত্রদলের ৮ নেতা-কর্মীর নামে মামলা দিয়ে ঝিনাইদহ ছাড়লেন পাটওয়ারী

পদত্যাগ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড

তেল বেচতে ভারতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্য ও কূটনীতির জট খুলবে কি

জামায়াত নেতার ডাকা খেয়াঘাট দখলে নিলেন বিএনপির আহ্বায়ক

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত