‘এ কোথায় এলাম?’ গাড়ি থেকে নেমে নিজেকেই প্রশ্ন করি, এদিক-ওদিক তাকাই অবাক দৃষ্টিতে। আমার সঙ্গে নেমেছে পশ্চিম কেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্র, কৃষ্ণাঙ্গ। সঙ্গের চালকটিও তা-ই। মনে মনে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো যে, মিনিট দশেক আগেও ইউরোপীয় ধাঁচে গড়া কেপটাউন শহর কেন্দ্রের মাঝখানে কফি খাচ্ছিলাম এবং মিনিট পাঁচেক আগে ইংল্যান্ডের সুনন্দ পল্লি অঞ্চলের আদলে শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত আবাসিক এলাকা পেরিয়ে এসেছি। এই পরিবর্তন অবিশ্বাস্য। আমার বিহ্বল দৃষ্টিকে অনুসরণ করে একটি ছাত্র বলে ওঠে: ‘বলেছিলাম না, লাঙ্গায় নিয়ে আসব? এটা, এটাই লাঙ্গা।’
দুদিন আগে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘একবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ আফ্রিকা’ শীর্ষক নাদিন গর্ডিমার স্মারক বক্তৃতা শেষে পশ্চিম কেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররাই বলেছিল যে, কেপটাউন ছাড়ার আগে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে তারা আমাকে লাঙ্গা দেখিয়ে নেবে। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো কৃষ্ণাঙ্গ বস্তি—বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার এবং যেখানে আশির দশকের শেষের দিকে সংগ্রামরত প্রতিবাদী মিছিলের ওপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশ গুলি চালিয়ে দুই ঘণ্টায় ১৩০০ মানুষকে মেরে ফেলেছিল।
এই সেই লাঙ্গা—চারদিকে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, শোষণের বীভৎস চিত্র। এ কোন মানবেতর জীবনপ্রবাহ দেখছি আমি? চারপাশের ছাপরা, নোংরা, ভাঙা পথঘাট। পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর বস্তিগুলোকেও যে হার মানায়। মানুষের ভাগাড় বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে এটাই হচ্ছে মানুষের ভাগাড়। নরকও যে এর কাছে হার মানবে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে মানুষগুলোর চোখ। ওখানে ক্রোধ, আক্রোশ আর চরম হতাশা ভিন্ন কিছুই নেই। মনে হচ্ছে, সে আক্রোশ অন্য যেকোনো মানুষের প্রতি, সে ক্রোধ সমগ্র পৃথিবীর ওপর, সে হতাশা সারা জীবনের প্রতি। কোনো সংঘর্ষ ভিন্ন মানুষের চোখে অমন হিংস্রতা আর কোথাও দেখিনি। সে হিংস্রতা উড়িয়ে দিতে পারে আশপাশ, পুড়িয়ে দিতে পারে সবকিছু।
‘কোনো দিকে তাকাবেন না, কারও চোখে চোখ রাখবেন না। কোনো কথা বলবেন না, কথা বলতে হলে আমরা বলব। কোনো অবস্থায়ই মুঠোফোন বের করবেন না। ছবি তোলার চেষ্টা করবেন না। বিশেষ বিশেষ জায়গায় আমরা ছবি তুলে দেব। কোনো হিংস্র কাণ্ড দেখে ভয় পেলেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করবেন। আমরা লাঙ্গারই লোক। আশা করছি কিছু হবে না। মনে রাখবেন, কৃষ্ণাঙ্গ ছাড়া এখানে কেউ ঢুকলে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। আপনার গায়ের রং এখানে নিষিদ্ধ।’
বলতে বলতে আমাদের গাড়িটি হুস করে দ্রুত বেরিয়ে যায়। এবার একটা শীতল ভয় আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ওঠে। টের পাই ঘামে ভিজে যাচ্ছে আমার পোশাক এবং একটা শিরশিরানি কাঁপুনি আমার সারা শরীরে। ‘গাড়িটা একটা নিরাপদ জায়গায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে,’ আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে একটি ছাত্র। তারপর তারা তিনজন আমাকে অনেকটা বেষ্টনীর মতো ঘিরে সামনে এগোতে থাকে।
নানান জায়গায় ছোট ছোট জটলা, বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছে এখানে-ওখানে, কর্মরত মহিলাদের দেখা যায় ইতস্তত। কিন্তু টের পাই, আমাদের চারজনের দলটাকে দেখলেই কথা থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসছে—পরিমাপ করা হচ্ছে আমাদের আনখশির। যেন একদল নেকড়ে দাঁত বের করে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আমাদের চারদিকে। একটু বেচাল হয়েই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ওপরে, ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে আমাদের।
মদের গন্ধে ঘন হয়ে আছে বাতাস আর আশপাশ। ‘এদের প্রধান খাদ্য কি জানেন?’ একটি ছেলে ফিসফিসিয়ে আমাকে জানায়: ‘সকালের নাশতায় মদ, দুপুরের খাবারে মদ, নৈশভোজে সবচেয়ে কড়া মদ নিট। বিশ্বাস করবেন যে, এরা শিশুদেরও মদ গিলিয়ে দেয়, যাতে ওরা ঘুমিয়ে থাকে। তাই লাঙ্গায় কেউই কখনো প্রকৃতিস্থ অবস্থায় থাকে না। সুতরাং যখন যা কিছু ঘটতে পারে। পুলিশও এখানে ঢুকতে ভয় পায়, ঢোকে না। ওই দেখুন বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।’
এক জায়গায় দেখি, একটি ঝুপড়ির সামনে একটি তরুণী মেয়েকে এক যুবক বেধড়ক মারছে। কেন, কে জানে? ছেলেটির হুংকারে, মেয়েটির চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। চড়-চাপ্পড়, লাঠির বাড়ি, অকথ্য গালিগালাজের তুবড়ি চারদিকে। আড়চোখে তাকিয়েও বুঝতে পারলাম, মেয়েটির চোখ-মুখ রক্তাক্ত। চারপাশ দিয়ে কতজন চলে যাচ্ছে, আশপাশে কতজন কথা বলছে, এদিকে-ওদিকে শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু কেউই ছেলেটিকে থামাতে আসছে না, কিংবা মেয়েটিকে রক্ষা করতে এগোচ্ছে না। যেন কিছুই হয়নি, যেন সবকিছুই স্বাভাবিক। এ কোন নির্বিকারত্ব, এ কোন নির্লিপ্ততা!
বিশ্বাস করুন কী দেখেছিলাম, আমার সবটা ভালো করে মনে নেই। যা মনে আছে, তা-ও বর্ণনা করার উপযুক্ত ভাষা আমার নেই। কেমন একটা ভীতির বুদ্বুদের মধ্যে, একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। যেন দেখতে পারছি না কিছু, যেন সবকিছু বোধের অগম্য। ছাত্রদের তোলা ছবিগুলো লাঙ্গার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি। ওর চেয়ে ভালো সাক্ষ্য আর নেই।
জানতাম চারটি জাতিশ্রেণি আছে দক্ষিণ আফ্রিকায়—শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, বর্ণিল (মিশ্রিত) ও ভারতীয়। যেটা জানতাম না, সেটা হচ্ছে বিভাজনটা তীব্রতম, অবিশ্বাসটা চরমতম এবং হিংসাটি ব্যাপকতম। আমি ভারতীয়ের মধ্যে পড়ব। এবং লাঙ্গায় ভারতীয়রাও গ্রহণযোগ্য নয়। লাঙ্গা কৃষ্ণাঙ্গদের। শুধুই কৃষ্ণাঙ্গদের।
দেখতে দেখতে বড় রাস্তায় পৌঁছলে দেখা গেল রাস্তার ওপারে আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছে। গাড়ির কাছে যেতেই কৃষ্ণাঙ্গ চালক নেমে গেল এবং সে জায়গায় উঠল এক বর্ণিল চালক। মনে হচ্ছে যেন একটা গোয়েন্দা চলচ্চিত্র। রাস্তার ওপারে বর্ণিল জনপদ বন্তেহিউয়েলে ঢুকব। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সুতরাং কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র তিনজনও সেখানে ঢুকতে পারবে না। তবে আমার গাত্রবর্ণের কারণে আমার অসুবিধে নেই। আর এ জনপদে ভারতীয়রা প্রবেশ করতে পারে। আসলে এ জনপদে একটি বড় ভারতীয় জনগোষ্ঠীও বসবাস করে।
আর এ জনপদ অত ভীতিকরও নয়। এ জনপদের অবস্থাও উন্নততর—একটি নিম্ন মধ্যবিত্তের জনপদ। তবে এখানেও নামব না এবং গাড়ি থেকেই ছবি তুলতে হবে। ৩০ মিনিটের মতো বর্ণিল চালক আর আমি ওই জনপদ ঘুরে এলাম। দেখলাম, বাচ্চাদের হাত ধরে মা-বাবা চলছেন, বাজারের থলে হাতে ফিরছেন এক মহিলা, লাঠি ঠুকে ঠুকে চলছেন এক বৃদ্ধ। শিশুরা খেলছে বাড়ির সামনে, রান্নার গন্ধ ভেসে আসছে কোনো বাড়ি থেকে, একদল কিশোর-কিশোরীর হাস্যরোল শুনতে পাচ্ছি এক পথের বাঁকে। এক স্বাভাবিক জীবনের চালচিত্র।
এবার সবাই মিলে বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা। গাড়ির কারও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু কিন্তু আমি জানি, প্রত্যেকের মনের মধ্যে প্রত্যেকে কথা বলছে। অন্যদের কথা তো বলতে পারব না। তবে আমার মনের মধ্যে শুধু তোলপাড় করতে লাগল একটিই প্রশ্ন: ‘এ কোন দক্ষিণ আফ্রিকা?’ বারবার মনে হতে লাগল জয় গোস্বামীর কয়েক লাইন:
‘এ কোন দেশে আমরা এলাম?
যতবার গেছি ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে তার নাম।
কোথায় সে দেশ—অতীতে না ভবিষ্যতে?’
লেখক: সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে বিএনপির নেতাদের মারধরের শিকার হয়েছেন অধ্যক্ষ ও একজন নারী প্রদর্শক। এ-সংক্রান্ত ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত না হলে বোঝা যেত না, কি রকম নিন্দনীয় কাজ করেছেন এই বিএনপি নেতারা। অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপির এই নেতারা কলেজে এসেছিলেন চাঁদা চাইতে।
১৭ ঘণ্টা আগে
জ্বালানি সংকট তো নতুন কোনো ব্যাপার নয়। আগে থেকেই সেটা ছিল। বর্তমান সংকটটা হলো সরবরাহের সংকট। আর একটা কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের শেষ ১০ বছরে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। সে সময় গ্যাস অনুসন্ধান এতটাই অবহেলিত থেকেছে যে গ্যাস আহরণের চেয়ে এলএনজি আমদানিতেই বেশি নজর দেওয়া হয়েছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা দেখে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি। দেশের ও বিশ্বের জলবায়ু সংকটের কালে এ ধরনের একটি মহতী উদ্যোগ দেশবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক। বিএনপির সেই ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজ বেষ্টনী তৈরি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব..
২০ ঘণ্টা আগে
কোনো অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে আমরা মাঝে মাঝেই ব্যর্থ হই। আমার একজন সহকর্মী যিনি আবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তিনি বললেন, আসলে যাদের কাছ থেকে আমরা প্রতিবাদ আশা করছি, তারা ন্যায়-অন্যায় বোঝার ক্ষমতা রাখে না। এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তারা বড় হচ্ছে যে, এই বিষয়টি চিহ্নিত কর
২ দিন আগে