Ajker Patrika

নদী সরু করতে চায় কারা?

আবু তাহের খান
নদী সরু করতে চায় কারা?

জানা গেছে, যমুনা নদীর দুই তীর ভরাট করে সেখানে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা তথা দেশের ‘উন্নয়ন’ ঘটানোর লক্ষ্যে নদীকে সরু করে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো); অর্থাৎ এত দিন পর্যন্ত নদীখেকো দখলদার ভূমিদস্যুরা যা করত, সেটিই এখন করার উদ্যোগ নিয়েছে পাউবো। আর তাদের এই উর্বর মস্তিষ্কজাত চিন্তাভাবনাকে বাস্তবে রূপদানের জন্য এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংকও (বিভিন্ন দেশের নানা সর্বনাশা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের জুড়ি মেলা ভার)। আর এ প্রকল্পটিকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে পাউবো, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের অসামান্য অবদান তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নদীর দুই তীর ভরাট করে সেখানে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার এ উন্নয়নচিন্তার প্রবর্তক কারা? অপরাধবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীমাত্রই জানেন, যেকোনো অপরাধ সংগঠনের আগে সাধারণভাবে কোনো একজন ব্যক্তি থেকে ওই চিন্তার উৎসরণ ঘটে, পরে কতিপয় মিলে সেটিকে একটি পরিকল্পনায় রূপ দেন এবং আরও পরে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আরও লোককে যুক্ত করেন। তো, এ ক্ষেত্রে এই অপরাধ-চিন্তার প্রবর্তক কি শুধুই পাউবো ও বিশ্বব্যাংক, নাকি এর নেপথ্যে মূল চিন্তার উদ্ভাবকদের মধ্যে নদীখেকো দখলদারেরাও রয়েছেন? আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে শেষোক্তদের যোগসাজশেই হয়তো পাউবোর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছেন, যার সঙ্গে যুক্ত 
রয়েছে বিশ্বব্যাংকসহ আরও নানা স্বার্থগোষ্ঠী। তবে এর লক্ষ্য এবং বাস্তবায়িত হলে এর ফলাফল দুটিই হবে অভিন্ন—নদী গ্রাস করা।

প্রকল্পটির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝাই যাচ্ছে, এটিও সাম্প্রতিক সময়ের নানা ‘খাই খাই’ প্রকল্পের জোয়ারে ভেসে এসেছে এবং বহু আত্মবিনাসী প্রকল্পের মতোই গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ রক্ষার জন্য দেশ ও জনগণের সর্বনাশ ঘটিয়ে হলেও স্বার্থান্বেষী মহল এর বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। প্রকল্পটির এত দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষ এত দিন তেমন কিছুই জানত না, যদিও দেশে একটি সংসদ আছে, যেখানে এ-জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পটি যেহেতু জনস্বার্থবিরোধী, সেহেতু জাতীয় সংসদ কার্যকর থাকলেও হয়তো এটিকে লুকানোর চেষ্টাই প্রবল থাকত। যা হোক, শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের সূত্রে বিষয়টি জনসমক্ষে চলে আসায় বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে গত ২১ মার্চ আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, উন্নয়নের নামে যারা যমুনা নদীকে ছোট করতে চায়, তারা নির্বোধ। কিন্তু আসলেই কি তারা নির্বোধ? মোটেও না; বরং তাদের স্বার্থবোধ ও ধান্দার তাড়না এতটাই প্রখর যে তারা আরও আগেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে একটি গণমাধ্যমকে বলে দিয়েছে, এত বড় যমুনা নদীর প্রয়োজন নেই! আসলে তাদের ও তাদের গোপন সহযোগীদের প্রয়োজন হচ্ছে নদীর তীর জবরদখল করা। এত দিন তারা কাজটি গোপনে ও বিচ্ছিন্নভাবে করলেও এখন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গে নিয়ে করার উদ্যোগ নিল বৈকি এবং এ ব্যাপারে তারা এতটাই মরিয়া যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ সমীক্ষা ও পরিবেশঝুঁকি যাচাই করে দেখার কথা থাকলেও কোনো কিছু না করেই প্রকল্পটি তারা সরাসরি পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় পেশ করেছে।

জানা যায়, ‘যমুনা নদীর দুই তীর রক্ষা এবং ঝুঁকি প্রশমনে টেকসই অবকাঠামো’ শীর্ষক এই প্রকল্পের ওপর গত ৬ ফেব্রুয়ারি পিইসি সভা হয়েছে, যা প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ার একটি খুবই প্রাথমিক পর্যায়, যেখান থেকে ইচ্ছা করলে খুব সহজেই এর অনুমোদন-প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়া যায়। এমতাবস্থায় বৃহত্তর জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটির অনুমোদন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব উদ্যোগ অবিলম্বে বাতিল করা উচিত বলে মনে করি। তবে শুধু এর অনুমোদন-প্রক্রিয়া বাতিল করলেই হবে না। স্বার্থান্বেষী মহল ভবিষ্যতে যাতে আবারও এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্প নিয়ে গোপনে এগোতে না পারে, তজ্জন্য যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত বলেও মনে করি।

২০১৩ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংককে অব্যাহতি দেওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ থেকে এই চতুর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির হয়তো স্থায়ী বিদায়ই ঘটে গেল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, সে আবার তার পুরোনো চরিত্র ও জৌলুশ নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে এ লেখায় যমুনা নদীকে মেরে ফেলার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্যও আহ্বান জানাচ্ছি। আর গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন প্রকল্পটির গতিবিধির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে, যাতে কোনোভাবেই এটি বাস্তবায়িত হতে না পারে। নইলে নদীখেকো ভূমিদস্যুদের স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা এ প্রকল্প গ্রহণে উদ্যোগী হয়েছেন, তাঁদের হাত থেকে যমুনাকে বাঁচানো সত্যি কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ডিজিএফআইয়ে নতুন ডিজি, আগের ডিজি পররাষ্ট্রে

নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের পরিচয়

যুদ্ধ এড়াতে পরমাণু ইস্যুতে ছাড়ে প্রস্তুত, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যা চাইছে ইরান

বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল

ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন লারিজানি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত