সকালের সোনালি রোদ কিংবা দুপুরের কর্মব্যস্ততা। আমাদের চারপাশের চেনা জগৎটা আপাতদৃষ্টে স্বাভাবিক মনে হলেও এর আড়ালে প্রতিনিয়ত বয়ে চলেছে একটি নীরব স্রোত। ঘরের চার দেয়াল কিংবা শিক্ষালয়ের পথ—কোথাও যেন আর নিরাপদ নয় আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা। প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে নতুন নতুন সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের সম্প্রতি প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ মাসে দেশে মোট ২ হাজার ১৭১ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮০৮ জন।
সহিংসতার গ্রাফে ঊর্ধ্বগতি: জুনে সর্বোচ্চ
বছরের শুরু থেকে নারী ও কন্যা নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে থাকলেও তা ভয়াবহ রূপ নেয় বছরের মাঝামাঝি সময়ে। পরিসংখ্যানে উঠেছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নির্যাতনের শিকার নারীর সংখ্যা যথাক্রমে ১৮৩ জন করে থাকলেও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০ জনে। এরপর এপ্রিলে ২২০ জন এবং মে মাসে তা ২৫৯ জনে গিয়ে ঠেকে। আর বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জুন। এই মাসে এককভাবে ৩৩৩ জন নারী ও কন্যা সহিংসতার শিকার হন। যদিও জুলাই মাসে কিছুটা কমে ২৯৯ জন এবং আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তা ২৫২ জনে নামে। তবু এই পরিসংখ্যান সমাজদেহে গভীর ক্ষতেরই ইঙ্গিত দেয়।
ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের নির্মম শিকার শিশুরা
মহিলা পরিষদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার শিকার হচ্ছে কম বয়সী কন্যাশিশুরা। সমাজের একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষের শিকারে পরিণত হচ্ছে তারা। উদাহরণস্বরূপ, শুধু জুন মাসেই মোট ১০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। তাদের মধ্যে ৭২ জনই ছিল কন্যাশিশু। এর মধ্যে ৫২টি সাধারণ ধর্ষণ, ১২টি দলবদ্ধ ধর্ষণসহ ৭ জন কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। একইভাবে জুলাই মাসে ৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হন, তাদের মধ্যে ৪৫ জন কন্যাশিশু।
হত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও সাইবার সাইক্লোন
শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের চিত্রও কম ভয়ের নয়। জুলাই মাসে ৫০ জন (৩৯ নারী ও ১১ কন্যা) এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৫২ জন (৩৯ নারী ও ১৩ কন্যা) নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি মাসে রহস্যজনক মৃত্যু এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনা নারীর মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাকে প্রকট করে তুলেছে। অন্যদিকে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণী ও শিশুরা প্রতিনিয়ত সাইবার সহিংসতা এবং উত্ত্যক্তকরণের শিকার হচ্ছে। যেমন জুন মাসেই ২৯ জন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনই কন্যাশিশু। পাশাপাশি কন্যাশিশুদের বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও সেপ্টেম্বর মাসেই একটি বাল্যবিবাহ সম্পন্ন এবং সাতটি বাল্যবিবাহের চেষ্টার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
কেন এই অবক্ষয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অপরাধীরা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পাশাপাশি পারিবারিক অসচ্ছলতা এবং সাইবার অপরাধের অবাধ বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঘরে কিংবা বাইরে নারীর এই চরম নিরাপত্তাহীনতা শুধু একক কোনো পরিবারের সংকট নয়, এটি পুরো জাতির জন্য এক লজ্জাজনক ও অস্বস্তিকর সত্য। আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সর্বস্তরে মানসিকতার পরিবর্তন না আনলে থামানো যাবে না এই নীরব আর্তনাদ। প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়, নিরাপদ ছাদের নিচেও কি নারীরা নিরাপদ?










