Ajker Patrika
ক্ষুদ্র ব্যবসার বৈশ্বিক চিত্র

অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান ও অবস্থান

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা
অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান ও অবস্থান

বিশ্ব অর্থনীতিতে বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিরোনামে জায়গা করে নেয় বরাবরই। তবে দেশগুলোর অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখে মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বা এসএমই খাত। বিশ্বব্যাংকের মতে, বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবসার প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকৃতির। এগুলো মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি জোগায়। তবে এই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শুধু ব্যবসা পরিচালনা করাই নয়, বরং লিঙ্গভিত্তিক সমতা, নীতিগত সুরক্ষা এবং নারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

আইনগত অধিকার ও নারী উদ্যোক্তার সমীকরণ

বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৬’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে মাত্র ৬৭ শতাংশ আইনি অধিকার ভোগ করেন। আইনি সুরক্ষা কার্যকর করার মতো মাত্র ৪৭ শতাংশ নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। গ্লোবাল এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মনিটর রিপোর্ট অনুসারে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা মালিকানার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের অনুপাত গড়ে ০.৬৯ এবং নারী উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক উচ্চ-সম্ভাবনাময় নতুন ব্যবসার প্রায় ৪০ শতাংশ পরিচালনা করেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ট্রেন্ড বলছে, প্রায় ২৫ শতাংশ নারী নতুন ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছেন। এ ছাড়া ৫৮ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা খাতে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা গেলে বিশ্ব জিডিপি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে নারী উদ্যোক্তা

উন্নত দেশগুলোতে ছোট ব্যবসার বিকাশ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

» যুক্তরাষ্ট্র: দেশটির ছোট ব্যবসা প্রশাসন বা এসবিএর অফিস অব অ্যাডভোকেসি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৩৬ মিলিয়নেরও বেশি ছোট ব্যবসা রয়েছে। এর মধ্যে নারীরা ১৫.৭ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবসা পরিচালনা করেন; যা মোট ফার্মের প্রায় ৪০ থেকে ৪০.৬ শতাংশ। তবে এর বড় একটি অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ সোলপ্রেনিউরশিপ হওয়ায় নারী মালিকানাধীন ফার্মগুলোর গড় বার্ষিক আয় পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ডব্লিউওএসবি ফেডারেল কন্ট্রাক্ট প্রোগ্রাম নারীদের সরকারি ক্রয়ে অন্তত ৫ শতাংশ অংশ নিশ্চিত করায় ব্যবসা সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

» কানাডা: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কানাডা একটি অত্যন্ত কাঠামোবদ্ধ দেশ। দেশটির উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ স্ট্র্যাটেজির আওতায় হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ ও অনুদান দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে এই তহবিলে অতিরিক্ত ১৭৩.৭ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে, যা নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ব্যবসার বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

» যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৯৯ শতাংশ ব্যবসা হলো এসএমই; যা দুই-তৃতীয়াংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। যুক্তরাজ্যের প্রাইভেট খাতের প্রায় ৯৯.৮ শতাংশ ব্যবসা এসএমই এবং এগুলো প্রায় ৬১ শতাংশ কর্মসংস্থান দেয়। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইনভেস্টিং ইন উইমেন কোডের ৩ শর বেশি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠান নারী নেতৃত্বাধীন কোম্পানিতে সাধারণ বাজারের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড জেন্ডার সমতায় শীর্ষস্থানে থেকে সাসটেইনেবল ও গ্লোবাল অরিয়েন্টেড স্টার্টআপ তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে।

এশিয়া ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির বৈচিত্র্যময় চিত্র

উন্নত বিশ্বের বাইরে এশিয়ার দেশগুলোতে ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরতা আকাশচুম্বী হলেও নারী উদ্যোক্তাদের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইন্দোনেশিয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা দেশটির মোট কর্মসংস্থানের ৯৭ শতাংশ এবং জিডিপির ৬১ শতাংশ অবদান রাখে। অন্যদিকে, ভারতের এমএসএমই মন্ত্রণালয় এবং সরকারি ডেটা অনুযায়ী, দেশটির নিবন্ধিত এমএসএমই খাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ বা প্রায় ৩.৬৯ কোটি ব্যবসার মালিক নারীরা। ভারতের ছোট ব্যবসাগুলো প্রায় ৬২ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করলেও আউটপুট বা উৎপাদনে তাদের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশের এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনর্বিনিয়োগ তহবিল, কম সুদের ঋণ এবং জামানতহীন অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল লিটারেসি, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সংযোগ বাড়াতে পারলে এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।

ভৌগোলিক সমীকরণ ও ভবিষ্যতের পথ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে উন্নত আইনি কাঠামো এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহজলভ্যতার কারণে নারীরা প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির স্টার্টআপে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা (যেমন কুটির শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বুটিক) মূলত গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং, যেখানে নারীরা আইনি নিরাপত্তা, জামানতবিহীন ঋণ এবং উন্নত বাজার ব্যবস্থার সুযোগ পান, সেখানেই ছোট ব্যবসা দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, দ্য বিজনেস জার্নালস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত