ডা. যামিনী সেন

বিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। চিকিৎসাবিজ্ঞান তখনো ছিল পুরোপুরি পুরুষশাসিত। ইউরোপের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দরজা নারীদের জন্য ছিল বন্ধ। সেই সময়ে ঔপনিবেশিক ভারতের অবিভক্ত বাংলার এক নারী চিকিৎসক ভাঙলেন ব্রিটিশদের দুর্ভেদ্য প্রাচীর!
১৫৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব গ্লাসগোর দরজা তখনো নারীদের জন্য অবরুদ্ধ। তবে ১৯১২ সালে প্রথম নারী হিসেবে রয়্যাল কলেজের ফেলো নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন সেই বাঙালি নারী। নাম তাঁর যামিনী সেন। নাম শুনে প্রথমেই মনে হবে, কোথায় যেন শুনেছি! যামিনী নাকি কামিনী মনে করতে পারছেন না তো। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এই যামিনী সেন হলেন কবি কামিনী রায়ের ছোট বোন। তবে দিদির পরিচয়ে নয়, যামিনী সেন পুরো বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রিটিশদের দুর্গ জয় করে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন এক পথপ্রদর্শক হওয়া সত্ত্বেও একটা সময় ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর নাম।
নেপালের রাজপ্রাসাদ থেকে ব্রিটেনের পরীক্ষা হল কিংবা ঔপনিবেশিক ভারতের মহামারিকবলিত শহর—সবখানেই ছিল যামিনী সেনের পদচারণ। সম্প্রতি দীপ্তা রায় চক্রবর্তী ‘ডাক্তারিন যামিনী সেন’ নামে তাঁর জীবনী লিখেছেন। দীপ্তা যামিনী সেনের নাতনি। প্রসঙ্গত, উত্তর ভারতের বেশ কিছু ভাষায় নারী চিকিৎসকদের ‘ডাক্তারিন’ বলা হয়।
যামিনী সেনের লেখা চিঠিপত্র, ডায়েরি, সংক্ষিপ্ত একটি জার্নাল, ‘মহিলা পরিষদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধ এবং তাঁর বড় বোন কামিনী সেনের (বিয়ের পর রায়) লেখা একটি সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্যের ওপর ভিত্তি করে জীবনীগ্রন্থটি লিখিত হয়েছে। বইটি অবিভক্ত বাংলার এক প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত এবং পরিবর্তনের সংকল্পে দৃঢ়চেতা নারীকে ইতিহাসের পাতায় তাঁর যোগ্য আসন ফিরিয়ে দিয়েছে।
১৮৭১ সালে অবিভক্ত বাংলার বরিশালে জন্মেছিলেন যামিনী সেন। বাবা চণ্ডীচরণ সেন ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী, বিচারক, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি আর দিদি কামিনী সেন ছিলেন অন্যতম।
কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ১৮৯৭ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন।
স্নাতক পাসের পরপরই যামিনী সেন নেপালের রাজপরিবারের গৃহচিকিৎসক এবং কাঠমান্ডুর জেনানা হাসপাতালের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। এ চাকরি তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। প্রায় এক দশক ধরে তিনি সেখানে সুনামের সঙ্গে কাজ করেন। প্রথাগত ও রক্ষণশীল পরিবেশের মধ্যেও আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি চালু করে তিনি নেপালের রাজা পৃথ্বী বীর বিক্রম শাহের আস্থা অর্জন করেন।

অবশ্য নেপালে কাটানো তাঁর সময়গুলো খুব একটা ভালো ছিল না। রাজপ্রাসাদে অস্থিরতা এবং অভ্যুত্থানের গুজবের মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনি নেপাল ছাড়তে বাধ্য হন। যে রাজা তাঁকে খোদাই করা একটি রাজকীয় সোনার ঘড়ি উপহার দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন, ধারণা করা হয় বিষপ্রয়োগে সেই রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল। যামিনীর নেপাল পর্ব এখানেই শেষ হয়ে যায়।
১৯১১ সালে যামিনী লেডি ডাফরিন ফান্ডের সহায়তায় ব্রিটেনে যান। ডাবলিনে চিকিৎসার লাইসেন্স নেওয়ার পর তিনি লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি গ্লাসগোতে ফেলোশিপ পরীক্ষায় বসার সিদ্ধান্ত নেন।
রয়্যাল কলেজ তখন সবে নারীদের জন্য পরীক্ষার দরজা খুলেছে। ১৯১২ সালে তিনি সেই পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং ১৫৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম নারী ফেলো হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
তবে কলেজের নথিতে উল্লেখ রয়েছে, যামিনী সেন ‘কোনো দাপ্তরিক পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি’। এর অর্থ হলো, একজন নারী ফেলো হিসেবে তাঁর সুযোগ-সুবিধা পুরুষদের তুলনায় সীমিত ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় নারী ফেলো ছিলেন মার্গারেট হগ গ্রান্ট। যামিনী সেনের ১১ বছর পর তিনি ফেলো হয়েছিলেন।
চিকিৎসা জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়াতে ১৯১২ সালে বার্লিনে যান যামিনী সেন। ওই সময়ে ক্রান্তীয় রোগ বা ট্রপিক্যাল ডিজিজ নিয়ে গবেষণায় ইউরোপ ছিল সবার চেয়ে এগিয়ে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের মূল চালিকাশক্তি। রয়্যাল কলেজের আর্কাইভে যামিনী সেনের একটি উক্তি সংরক্ষিত আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের বোনেদের প্রতি আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে।’
পরবর্তী সময়ে ভারতে ফিরে তিনি উইমেনস মেডিকেল সার্ভিসে যোগ দেন এবং আগ্রা, শিমলা ও পুরির মতো শহরগুলোতে কাজ শুরু করেন। আগ্রায় যখন ব্রিটিশ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা চলছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যামিনী সেনকে নিয়ে আসা হয়। একজন ভারতীয় নারী চিকিৎসক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় নারীরা তাঁর কাছে আসতেন এবং তাঁকে বিশ্বাস করতেন। রোগীরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘শাড়িওয়ালি ডাক্তারিন সাহেব’।
শিমলা ও পুরিতে মহামারির সময় যখন ব্রিটিশ চিকিৎসকেরা হাত গুটিয়ে থাকতেন, তখনো চিকিৎসা দিতেন যামিনী সেন। সে সময় প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণের কারণে অনেক নারী মারা যেতেন। যামিনী সেন এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করেন।
পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রেও যামিনী সেন নীরব আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি হাসপাতালে কাজের সুবিধার্থে পিন দিয়ে আটকানো শাড়ি এবং লেস কলারযুক্ত ফুল-হাতা ব্লাউজ পরতেন। এটি ছিল প্রচলিত চাদর বা ওড়না স্টাইলের ভারতীয় শাড়ি পরার ধরনে একটি বড় পরিবর্তন, যা ওই সময় বসার ঘরের চেয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ডে কাজের জন্য অনেক বেশি উপযোগী ছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে যামিনী সেনকে অনেক ঝড়-ঝাপটা পোহাতে হয়েছে। নেপালে থাকাকালীন তিনি ভুটু নামের এক কন্যাসন্তান দত্তক নেন। ভুটুর মা তার প্রসবকালে মারা গিয়েছিলেন। তখনকার রক্ষণশীল সমাজে দত্তক কন্যার মা হিসেবে পারিবারিক কর্তব্য সমানভাবে সামলেছেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতায় ভুটু মারা গেলে যামিনী ভীষণ মানসিক আঘাত পান।
যামিনী সেনের জীবনীকার দীপ্তা রায় চক্রবর্তী বলেন, ‘তিনি ছিলেন একাধারে উচ্চাভিলাষী, মানবিক এবং সংগ্রামী নারী। ঔপনিবেশিক ভারতে বর্ণবৈষম্য এবং ব্রিটেনে লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয়েও চিকিৎসাসেবাকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ধরে রেখেছিলেন।’ তাঁর মাত্র দুটি সাদা-কালো ছবি পাওয়া যায়। ছবি দুটি গ্লাসগো কলেজের আর্কাইভে জমা দেওয়া হয়েছে। ১৯৩২ সালে যামিনী সেন মারা যান।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গড়ে ওঠার ইতিহাস কেবল ইউরোপীয় উপাখ্যান নয়, কিংবা এটি কেবলই পুরুষের গল্প নয়। এই ইতিহাসের অংশ ছিলেন পিন দিয়ে আটকানো শাড়ি পরা, রাজপ্রাসাদের ওয়ার্ড কিংবা মহামারির ফ্রন্টলাইনে লড়াই করা এক দৃঢ়চেতা বাঙালি নারীও, যিনি কখনো পিছু হটেননি—তাঁর নাম ডা. যামিনী সেন।
বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

মাগুরার নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল আট বছরের এক শিশু। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ, সকালবেলা। বোনের শয়নকক্ষেই নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার শিকার হয় শিশুটি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে।
২ ঘণ্টা আগে
১৮৯৪ সালের ২৫ জুন। বোস্টনের দুই ধনী ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে এক অদ্ভুত বাজি ধরলেন—কোনো নারী একা সাইকেলে চড়ে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবে না। সে সময়কার রক্ষণশীল ভিক্টোরিয়ান সমাজের এই চ্যালেঞ্জ লুফে নেন ২৪ বছর বয়সী গৃহবধূ এবং তিন সন্তানের মা অ্যানি কোহেন কপচভস্কি।
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু করে, তার আগে পশ্চিমা মিডিয়ায় সে দেশটির বিরুদ্ধে নানা কথা শোনা যায়। এর মাধ্যমে তারা মূলত দেশটিতে হামলা বা অভিযানের যৌক্তিকতা তৈরি করে।
১৪ দিন আগে
আমি একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় তিন বছর। সম্প্রতি একটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কখনো ছবি আবার কখনো মেসেজের স্ক্রিনশট ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইতিমধ্যে আমার কাছ থেকে টাকাপয়সাও হাতিয়ে নিয়েছে নম্বরটির ব্যবহারকারী।
১৪ দিন আগে