Ajker Patrika

খেলাধুলায় পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য কারণ কি শুধুই প্রচার নাকি বিবর্তন

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা
খেলাধুলায় পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য কারণ কি শুধুই প্রচার নাকি বিবর্তন

১১ জুন পর্দা উঠছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। বৈশ্বিক এই উন্মাদনা ঘিরে চারদিকে যখন তুমুল আলোচনা, তখন একটি সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্ন সামনে চলে আসে—কেন আমাদের অবচেতনে ‘বিশ্বকাপ’ বলতেই শুধু পুরুষদের টুর্নামেন্ট ভেসে ওঠে? অথচ ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল থেকে শুরু করে প্রায় সব খেলাতেই নারীদেরও নিজস্ব বিশ্বকাপ এবং পেশাদার লিগ রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, খোদ নারী ক্রীড়াপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় অনেক সময় কোনো নারী অ্যাথলেটের নাম থাকে না। যুগ যুগ ধরে পুরুষদের খেলাধুলা যে পরিমাণ দর্শক, টেলিভিশন রেটিং এবং স্পনসরশিপ পেয়ে আসছে, নারীদের খেলা তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারছে না। বিশ্বজুড়ে প্রতিভার কোনো কমতি না থাকা সত্ত্বেও কেন এই ব্যবধান? ক্রীড়া বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং বিবর্তনবাদীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, গণমাধ্যমের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানুষের আদিম মনস্তত্ত্ব।

পুরুষদের খেলাধুলার জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দশকের পর দশক ধরে পাওয়া একচেটিয়া মিডিয়া কাভারেজ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) বার্ষিক চ্যাম্পিয়নশিপ সুপার বোল ১৯৬৭ সাল থেকে মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলের প্রাইম-টাইমে প্রচারিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, উইমেন্স ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএনবিএ) ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০০ সাল পর্যন্ত তাদের ফাইনাল ম্যাচগুলো দ্বিতীয় সারির কেবল চ্যানেলে সম্প্রচার করা হতো!

২০০০ সালের দিকে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের বাস্কেটবলের (এনবিএ) প্রায় প্রতিটি ম্যাচ টিভিতে দেখানো হতো। অন্যদিকে, নারীদের বাস্কেটবলের (ডব্লিউএনবিএ) মাত্র ২৫ শতাংশ ম্যাচ প্রচারের সুযোগ পেত। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রচারের অভাব একটি নেতিবাচক ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি করেছে। আর সেটির প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, পড়েছে পুরো বিশ্বে।

নারীদের ফুটবল বিশ্বকাপ কত সালে শুরু হয়েছিল বা পরবর্তী নারী বিশ্বকাপ ফুটবল কবে? অনেকে হয়তো উত্তর দিতে পারবেন না। কিন্তু পুরুষ দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ের নাম, অধিনায়কের নাম ঠিকই বলতে পারবেন। এর কারণ কী?

দর্শকদের একটি বড় অংশের ধারণা, পুরুষদের খেলা বেশি আকর্ষক। কারণ, এতে শারীরিক শক্তি, গতি এবং মুখোমুখি সংঘর্ষের তীব্রতা বেশি থাকে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনোদনের আসল উৎস শারীরিক শক্তি নয়, বরং ‘প্রতিযোগিতা’।

কানেটিকাট সান বা নিউইয়র্ক লিবার্টির মতো নারীদের বাস্কেটবল দলগুলোর ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুবই কম থাকে। অর্থাৎ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খেলার ফলাফল নিয়ে তীব্র উত্তেজনা বজায় থাকে। দ্য মরগান স্কুলের জুনিয়র অ্যাথলেট এমা টিউনার বলেন, ‘পুরুষ ও নারীদের খেলা আলাদা কারণে উপভোগ্য। আপনি যদি শুধু শারীরিক শক্তি দেখতে চান, তবে পুরুষদের খেলা দেখুন। আর যদি নিখুঁত কৌশল এবং দলীয় বোঝাপড়া কিংবা টিমওয়ার্ক দেখতে চান, তাহলে নারীদের খেলা দেখুন। তবে এ ধরনের তুলনা না করে আমাদের উচিত দুটিকেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে নারী-পুরুষ উভয়ের খেলা উপভোগ করা।’

মরগ্যান স্কুলের ‘মরগ্যান প-প্রিন্টে’র তথ্যমতে, ২০০০ সালের পর থেকে নারীদের খেলায় দর্শক কিছুটা বাড়লেও এখনো বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পুরুষদের পেশাদার খেলাগুলো নিয়মিত দেখেন। আর নারীদের খেলা দেখেন মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ।

তবে জনপ্রিয়তার এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে শুধু সামাজিক বৈষম্য বা প্রচারের অভাবই দায়ী নয়। বিজ্ঞান এবং মানব সভ্যতার আদিম বিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। ‘ইভল্যুশনারি বিহেভিয়ারাল সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মিশিগানের গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী রবার্ট ডিনার একটি তথ্য তুলে ধরেছেন।

বিশ্বের ৫০টি ভিন্ন সংস্কৃতির ওপর পরিচালিত ২০১৩ ও ২০১৪ সালের দুটি জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষেরা নারীদের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক খেলায় চার গুণ বেশি অংশ নেয় এবং খেলা দেখতে পছন্দ করে। সমাজবিজ্ঞানীরা আগে দাবি করতেন, নারীরা ঘরের কাজে বেশি ব্যস্ত থাকায় সময় পান না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, অবসর সময় দুজনেরই প্রায় সমান। তবে নারীরা সেই সময়ে খেলাধুলার চেয়ে যোগব্যায়াম বা শরীরচর্চাকে বেশি প্রাধান্য দেন। এমনকি শৈশবের ‘পিক-আপ গেম’ বা শিশুরা নিজেরা মিলে যে খেলার আয়োজন করে, সেখানেও মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অংশগ্রহণের অনুপাত বেশি (১০:১)।

বিবর্তনবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আচরণের ব্যাখ্যা দেয় ‘স্পেক্টেটর লেক’ তত্ত্ব। প্রকৃতিতে পাখি বা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষ প্রাণীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে নিজেদের শারীরিক সক্ষমতা বা শক্তির লড়াই প্রদর্শন করে, আর নারী ও অন্য পুরুষেরা তা বসে দেখে। নারী পাখিরা তা দেখে সেরা জিনধারী সঙ্গী নির্বাচন করে, আর অন্য পুরুষেরা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তি মেপে নেয়।

মানুষের ক্ষেত্রেও খেলাধুলা এই ‘লেক’-এর মতো কাজ করে। আদিম যুগে পুরুষদের শিকার করা, পাথর ছুড়ে মারা, দৌড়ানো বা কোনো কিছু দখলের যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছিল, আধুনিক খেলাধুলা আসলে সেই যুদ্ধবিদ্যারই একটি পরিশীলিত রূপ। পুরুষদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা পুরুষ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে একধরনের আগ্রাসী প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়।

ম্যারাথন দৌড়ের মতো অপ্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, পুরুষেরা নারীদের চেয়ে তিন গুণ বেশি গতিতে দৌড় শেষ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, যেখানে নারীরা অনেক বেশি হিসাব কষে ও স্থিতিশীল গতিতে দৌড় সম্পূর্ণ করে।

সামাজিক বাধা, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাব এবং বিবর্তনগত মনস্তত্ত্ব—সব মিলিয়েই পুরুষদের খেলাধুলার এই একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, পরিবেশ ও সুযোগের সমতা আনা হলে নারীদের খেলায়ও দর্শক আনা সম্ভব। ১৯৭২ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে হাইস্কুলে নারী অ্যাথলেট ছিল মাত্র ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। বাংলাদেশেও একসময় নারী অ্যাথলেট ছিল হাতে গোনা। এখন সেটা বাড়ছে।

এর অর্থ হলো, সুযোগ পেলে সব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। তবে কোটি বছরের বিবর্তনের মনস্তত্ত্ব এবং দশকের পর দশক ধরে তৈরি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারের অভাব রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র: দ্য মরগ্যান স্কুল, ক্লিনটন ও দ্য টাইম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত