Ajker Patrika

গৃহিণী থেকে ফ্রিল্যান্সার সালমা সুলতানা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
গৃহিণী থেকে ফ্রিল্যান্সার সালমা সুলতানা

সংসার, সন্তান আর ঘরের নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের একটি পরিচয় তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা সুলতানা। হাতে থাকা কিছু টাকা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগানো যায়—এমন ভাবনা থেকেই শুরু। ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ করতে গিয়ে একসময় জানতে পারেন, কোনো একটি দক্ষতা শেখার পেছনে বিনিয়োগ করলে সেই দক্ষতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। কথাটি মনে ধরে যায় তাঁর। সিদ্ধান্ত নেন, একটি কাজ শিখবেন। এরপর ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে শুরু করেন।

আজ সালমার তিনজন স্থায়ী বিদেশি ক্লায়েন্ট। তাঁদের দুজন যুক্তরাষ্ট্রের এবং একজন নেদারল্যান্ডসের। স্থানীয়ভাবেও কিছু কাজ করেন। এখন নিজের উপার্জিত অর্থ কাজে লাগাচ্ছেন সংসারে। তবে এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা সহজ ছিল না।

ফ্রিল্যান্সিং শেখার সময় সালমার দুই সন্তান খুব ছোট ছিল। একজনের বয়স তিন বছরের একটু বেশি, অন্যজনের মাত্র তিন মাসের মতো। তাই তাঁর মনে ভয় ছিল—সংসার ও দুই সন্তান সামলে তিনি আদৌ পারবেন কি না। সন্তানেরা ঘুমালে বা কিছুটা ব্যস্ত থাকলে নিজের কাজের জন্য সময় বের করতেন তিনি। কোনো দিন সন্তান অসুস্থ হলে কিংবা সংসারে বাড়তি কাজ থাকলে কাজ করা সম্ভব হতো না।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে একটি প্রতিষ্ঠানে কোর্স করতে ভর্তি হয়েছিলেন সালমা। কিন্তু সেখানে আশানুরূপভাবে শেখা বা এগিয়ে যাওয়া হয়নি। পরে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বিখ্যাত ফ্রিল্যান্সার লিজার একটি নিউজ দেখে তাঁর কোর্স সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর সেই কোর্সে ভর্তি হন। লিজার গাইডলাইন ও সাপোর্ট সিস্টেম কাজ শেখার পাশাপাশি ক্লায়েন্টের কাজ নেওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেয়।

শেখার একটি পর্যায় শেষ করার পর বায়ার খুঁজতে শুরু করেন সালমা। মাত্র দুই মাসের মধ্যে প্রথম কাজ পান। যুক্তরাষ্ট্রের এক ক্লায়েন্ট তাঁকে ১৫০ ডলারের একটি কাজ দেন। প্রথম উপার্জন তাঁর জন্য ছিল বিশেষ আনন্দের। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে প্রথমে পরিবারের সবাইকে উপহার দেন তিনি।

সালমা মূলত ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র—সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে কাজ করেন। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টুইটার ও পিন্টারেস্ট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি এসইও নিয়েও কাজ করেন।

সালমা জানিয়েছেন, গৃহিণী হওয়া মানেই নিজের কোনো দক্ষতা নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়। সংসার ও সন্তান সামলানোও বড় দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নিজের আগ্রহে নতুন কোনো কোনো বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একজন মা যদি দিনে মাত্র দু-তিন ঘণ্টা সময় পান, সেই সময়টুকু নিয়মিত কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। শুরুতে আয় কম হলেও ধৈর্য ও নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

নতুনদের জন্য তাঁর পরামর্শ হলো, একসঙ্গে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা না করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ অর্জন করতে হবে ভালোভাবে। পাশাপাশি সুন্দর প্রোফাইল ও পোর্টফোলিও তৈরি, নিয়মিত প্রস্তাব পাঠানো, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বোঝা এবং সময়মতো ভালো কাজ জমা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের দক্ষতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি ছোট টিম তৈরি করতে চান সালমা। অন্য নারীদের কাজ শেখানো এবং কাজের সুযোগ করে দেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

নিজে আয় শুরু করার পর তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আত্মবিশ্বাসে। নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের উপার্জন থেকে কিছু করতে পারার অনুভূতি তাঁকে আত্মনির্ভর করেছে। কাজের পথে ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা সংসারের চাপে কাজ করতে না পারার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কিন্তু সেসব তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে।

সালমার গল্প তাই শুধু একজন নারীর ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হওয়ার গল্প নয়; এটি সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করার গল্প। সালমা মনে করেন, শুরুটা ছোট হলেও আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য ও নিয়মিত চেষ্টা থাকলে একজন নারী ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ও আত্মনির্ভরতা তৈরি করতে পারেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত