Ajker Patrika

ইরান পরিস্থিতি: নারীত্বের জয়গান যেখানে বিদ্ধ বুলেট আর শৃঙ্খলে

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
ইরান পরিস্থিতি: নারীত্বের জয়গান যেখানে বিদ্ধ বুলেট আর শৃঙ্খলে

ইরানের ধূলিধূসরিত রাজপথ আজ শুধু প্রতিবাদের সাক্ষী নয়। বর্তমান আন্দোলনের জের ধরে একে মানুষের রক্তেভেজা ইতিহাসের দলিলও বলা চলে। ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের ইস্পাহান, গোরগান এবং তেহরানের রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছে স্লোগানে। এই আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাচ্ছেন নারীরা।

এই সংগ্রামের সামনের সারিতে থাকা নামগুলোর মধ্যে ভেদাভেদ নেই। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন আন্দোলনে। আর্নিকা দাববাঘ নামের মাত্র ১৫ বছরের এক কিশোরীর জীবন এখানে থেমে গেছে বুলেটের আঘাতে। তার জীবনের স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই গোরগান শহরে সরকারি বাহিনীর বুলেটে শেষ হয়ে গেছে। গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিনা চিকিৎসায় নিভে যায় এই কিশোরীর প্রাণ। একই দিনে গোরগানে প্রাণ হারান ২১ বছরের তরুণী মবিনা বেহেশতি। এদিকে ইস্পাহানে ২৩ বছরের সাহবা রশতিয়ানকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর নিথর দেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ঘটনার পাঁচ দিন পর।

তেহরানের সাদেকিয়াহ এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালীন দুই সন্তানের জননী নাসিম পুরাকায়েই সরাসরি গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর স্বামী সেই মৃতদেহ নিয়ে এক ঘণ্টার বেশি সময় রাস্তায় দৌড়েছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, যেন কর্তৃপক্ষ লাশটি তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে না পারে।

একইভাবে তেহরানে প্রাণ হারান বোজনোর্ড থেকে আসা ২৭ বছরের তরুণী নাজলি জানপারওয়ার।

কেন অগ্নিগর্ভ ইরান

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে মুদ্রা অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু হয়েছিল। এই ধর্মঘটই একপর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। মুদ্রাস্ফীতি ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া, মুদ্রার মান তলানিতে ঠেকে যাওয়া এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সেই অর্থনৈতিক লড়াই দ্রুতই অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারির মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে গণবিক্ষোভ। মানুষ শুধু রুটি-রুজির কথা বলছে না, তারা বলছে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা।

আন্দোলনের অকুতোভয় নারীরা

ইরানে নারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু বর্তমান আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা বিস্ময়কর। মাশহাদ থেকে শাহরেকর্ড—প্রতিটি শহরে তরুণীরা এখন জলকামানের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধু হিজাব আইনের প্রতিবাদ করছেন না; বরং কয়েক দশকের ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের মূলে আঘাত করছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের চিত্র খুব ভয়াবহ। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জাঞ্জান কেন্দ্রীয় কারাগারে তৈয়্যেবে হেকমত নামের এক নারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তিনি এ বছরের প্রথম মৃত্যুদণ্ডের শিকার। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল স্বামী হত্যার। অথচ ইরানের বহু নারীই পারিবারিক সহিংসতা এবং বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের শিকার হয়ে আত্মরক্ষার্থে এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে ইরানে অন্তত ৩২৮ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২ হাজার ২০১ জনে দাঁড়িয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আর অদ্ভুত সব নির্যাতন

ইরানি প্রশাসন এখন শুধু বুলেটে সন্তুষ্ট নয়। তারা নারীদের ইচ্ছাশক্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে ব্যবহার করছে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। তেহরানের আজাদ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আহু দরিয়ায়ি হিজাব নিয়ে হেনস্তার প্রতিবাদে জনসমক্ষে পোশাক খুলে প্রতিবাদ করেছিলেন। বিশ্বব্যাপী এই সাহসিকতা প্রশংসিত হলেও ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ আখ্যা দিয়ে জোর করে মানসিক হাসপাতালে পাঠায়। আরও ভয়াবহ হলো তেহরানের অ্যান্টি-আনভেইলিং ক্লিনিক কিংবা হিজাববিরোধী ক্লিনিক। এখানে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানানো নারীদের ‘চিকিৎসা’ দেওয়ার নামে মানসিক নির্যাতন করা হয়।

১৬ বছরের আফগান কিশোরী আরজু খাভারি হিজাব নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত মানসিক হেনস্তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এই সূত্র ধরে আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে স্কুলগুলোতেও। ২০২৩ সালে ইরানের ১৫টি শহরের প্রায় ৮০০ জন স্কুলছাত্রীকে বিষপ্রয়োগের শিকার হতে হয়েছিল। রহস্যজনক এই বিষক্রিয়ায় ছাত্রীরা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্‌রোগের সমস্যায় ভুগেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘সামান্য বিষ’ বলা হলেও অপরাধীদের কখনোই চিহ্নিত করা হয়নি। অনেকে মনে করেন, মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করার জন্য এই কাজ করা হয়েছিল।

অদম্য সাহস এবং আগামীর স্বপ্ন

এত রক্তচক্ষু আর ইন্টারনেটের ব্ল্যাকআউট সত্ত্বেও ইরানি নারীরা পিছু হটছেন না। তেহরানের রাস্তায় নারীরা এখন বাইক নিয়ে বের হচ্ছেন। রাইডিং ক্লাবে বাইক চালাচ্ছেন, যদিও তাঁদের লাইসেন্স দেওয়া হয় না সরকারিভাবে। কেউ হিজাব ছাড়াই ম্যারাথন দৌড়াচ্ছেন। সারিরা করিমির মতো শিক্ষার্থীরা গ্রেপ্তার হয়ে ফিরে এসেই আবার ডাক দিচ্ছেন ঐক্যের। ইরানি নারীবাদীদের দাবি স্পষ্ট। তাঁরা শুধু হিজাব থেকে মুক্তি চান না, তাঁরা চান একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ। যেখানে মানুষের অস্তিত্বের গুরুত্ব থাকবে বুলেট বা ফাঁসিকাষ্ঠের ঊর্ধ্বে। ইরানের রাজপথে এখন যে হাহাকার আর চিৎকার শোনা যাচ্ছে, সেটি শুধু যন্ত্রণার নয়। এই আওয়াজ একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষায় থাকা স্বাধীন মানুষের গর্জন।

সূত্র: ইউরো নিউজ ডটকম, উইমেন্স ভয়েজেস নাউ, মিস ম্যাগাজিন, হেনগাও অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, ডব্লিউএনসিআরআই ডট ওআরজি, মানারা ম্যাগাজিন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মিরপুরে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত কয়েকজন

বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি নেতাদের নিয়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে প্রধান উপদেষ্টা

এফ বা এম ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ১৫ হাজার ডলার বন্ড লাগবে না: মার্কিন দূতাবাস

মাত্র দেড় বছর আগে র‍্যাবে যোগদান করেছিলেন বিজিবি সদস্য মোতালেব

রাস্তায় সাইকেল থামিয়ে মুদিদোকানিকে কুপিয়ে হত্যার পর ‘হামলাকারী’ নিহত গণপিটুনিতে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত