Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক নারী

মিসরের আদালতের নজিরবিহীন রায় ও এক মায়ের বিজয়

ফিচার ডেস্ক
মিসরের আদালতের নজিরবিহীন রায় ও এক মায়ের বিজয়
ছবি: সংগৃহীত

কায়রোর অদূরে নীল নদের বদ্বীপ এলাকার এক ছোট্ট ঘর। সেখানে এখন নতুন শিক্ষাবর্ষের আবাহন। বাতাসে ভাসছে নতুন বইয়ের গন্ধ। কিন্তু সাত বছরের মেয়ের মা আমাল আবদেল হামিদ, এক অদ্ভুত দোলাচলে দিন গুনছিলেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এক ঘোর অন্ধকার রাত্রির শেষে প্রথমবারের মতো তাঁর চোখে ফুটে ওঠে ভোরের আলো।

আইনের বেড়াজালে এক পরিচয়হীন শৈশব

আমালের মেয়ে এত দিন স্কুলে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসে বসত, পড়ত। কিন্তু কোনো পরীক্ষায় বসতে পারত না। কারণ, রাষ্ট্রীয় খাতায় তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তার ছিল না কোনো জন্মনিবন্ধন সনদ, ছিল না রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার। মিসরের কঠোর ব্যক্তিগত মর্যাদা আইন অনুযায়ী বিবাহবহির্ভূতভাবে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু তার বাবার পরিচয় পেতে পারে না। আর বাবার পরিচয় না থাকলে জন্মসনদ পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব। মেয়েটির একমাত্র অপরাধ ছিল, সে জন্মেছিল এক নারকীয় অপরাধের গর্ভে। ২০১৮ সালে আমাল নিজেও একজন উঠতি বয়সের স্কুলছাত্রী ছিলেন। তখন তাঁরই এক সহপাঠী তাঁকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করেন। আমাল গর্ভবতী হন। চার বছর পর আদালত সেই ধর্ষককে অপরাধী সাব্যস্ত করে সাজা দিলেও আইনের মারপ্যাঁচে শিশুটির পিতৃপরিচয় অধরাই থেকে যায়। কারণ, দেশটির প্রচলিত আইন শুধু বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই সন্তানের পিতৃত্ব মেনে নিত।

ট্যাবু ভেঙে এক মায়ের দুঃসাহসিক লড়াই

সন্তানের অধিকার ফিরিয়ে দিতে একাই এক অসম যুদ্ধে নেমেছিলেন ২৭ বছর বয়সী আমাল। যে সমাজে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নিয়ে কথা বলাটাও এক চরম সামাজিক অপরাধ, সেখানে আমাল বেছে নিয়েছিলেন প্রতিবাদের কঠিন পথ। টেলিভিশনের পর্দা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানে তিনি সোচ্চার হন। সে সময় অনেকে কটূক্তি করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কেন নিজের জীবনের এই ট্র্যাজেডি সবার সামনে আনছ?’ আমাল শুধু একটি কথাই ভেবেছেন, নীরব থাকলে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। আদালতের দরজায় দরজায় ফাইল জমে ধুলো পড়ে থাকবে, কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যাবে। আমালের এই দুঃসাহসিক লড়াই শেষ পর্যন্ত মিসরের সমাজ ও বিচারব্যবস্থার চাকা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য করে।

আল-আজহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

টেলিভিশন ও মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটি আসে ঐতিহাসিক আল-আজহার থেকে। কায়রোর এই ঐতিহ্যবাহী ইসলামি গবেষণা কেন্দ্র ও শীর্ষ আলেমদের পর্ষদ গত ফেব্রুয়ারিতে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। আল-আজহার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আমালের মেয়ের এই বিশেষ কেসটিতে ডিএনএ পরীক্ষা এবং ধর্ষকের সাজাপ্রাপ্তিকেই পিতৃত্ব প্রমাণের বৈধ ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা যাবে।

আদালতের নজিরবিহীন রায় এবং একটি নতুন ভোর

আল-আজহারের এই সিদ্ধান্ত আদালতের দুয়ার খুলে দেয়। মিসরের আপিল আদালত ডিএনএ প্রমাণের ভিত্তিতে ওই ধর্ষককেই শিশুটির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দেন। মিসরের আইনি ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো রায়, যেখানে ডিএনএ টেস্টের ভিত্তিতে বিবাহবহির্ভূত ও ধর্ষণের শিকার সন্তানের পিতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এই একটি রায় শুধু আমালের মেয়ের জীবন বদলে দেয়নি, এটি মিসরের হাজারো পরিচয়হীন শিশুর জন্য আশার আলো জ্বালিয়েছে। আমালের আইনজীবী আল-সৈয়দ বদরা এবং নারী অধিকারকর্মীরা আশা করছেন, এই রায়ের ওপর ভিত্তি করে মিসরের পার্লামেন্টে ঝুলে থাকা পারিবারিক আইন সংশোধন করা সহজ হবে।

আট বছরের এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে আমাল এখন তাঁর মেয়েকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। এবার হয়তো সে আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে নাম লেখাবে, পরীক্ষা দেবে, আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই নিজের পরিচয়ে বড় হয়ে উঠবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন মায়ের সাহসী কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত জয় করে এনেছে একটি নিষ্পাপ শিশুর মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার।

সূত্র: রয়টার্স

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত