Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক সিডও দিবস

সনদ অনুমোদনে বাংলাদেশ প্রস্তুত হবে কবে

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
সনদ অনুমোদনে বাংলাদেশ প্রস্তুত হবে কবে
প্রতীকী ছবি

নারী অধিকারের অন্যতম মৌলিক সনদ বলা হয় সিইডিএডব্লিউ বা সিডওকে। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৯টি দেশ জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে স্বাক্ষর বা সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ এখন পর্যন্ত এই সনদের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন দেয়নি। সেই সব দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশও। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করলেও আজ পর্যন্ত অনুচ্ছেদ ২ এবং ১৬(১)(গ)—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ধারায় নিজদের ‘সংরক্ষণ’ বহাল রেখেছে। এর ফলে দেশের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা অনেকটাই পশ্চাৎমুখী হয়ে আটকে রয়েছে বলে মনে করছেন নারী অধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

সিডও সনদে বাধা ও বাংলাদেশের অবস্থান

সিডও সনদের অনুচ্ছেদ ২ মূলত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপে রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার নিশ্চিত করে। আর অনুচ্ছেদ ১৬(১)(গ) বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যমান ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথার কারণে দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি কার্যকর করা হয়নি। পারিবারিক আইন, উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সম-অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় সিডও সনদের মূল উদ্দেশ্যই বাংলাদেশে ব্যাহত হচ্ছে।

বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতার

আন্তর্জাতিক সিডও দিবস সামনে রেখে নারীর প্রতি বৈষম্য ও বর্তমান নীতিগত বাধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সমস্যাটি কৌশলগত নারী আন্দোলনের নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতার। নারী-পুরুষের সম্পত্তিতে সম-অধিকার নিশ্চিত হলে নারীর নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হলে নারীর ব্যক্তিগত জায়গায়ও অধিকার সংরক্ষিত হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘কৌশলগতভাবে আমরা পিছিয়ে নেই। এটা বাস্তবতা যে সামাজিক মানসিকতা, সামাজিক পটভূমি, সামাজিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক কমিটমেন্ট—এই জায়গাগুলোতে নারীর অধিকার রক্ষার বিষয়টি শতভাগ অনুকূলে না থাকায় এই অবস্থা হচ্ছে।’

পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন ও দেশীয় আইনের সংস্কার

এই দুই অনুচ্ছেদ পূর্ণাঙ্গভাবে মানতে কি আইন সংশোধনই জরুরি? এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইফফাত আরা গিয়াস বলেন, অনুচ্ছেদ ১৬(১)(গ) পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে নিতে হলে শুধু একটি আইন সংশোধন করলে চলবে না। বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান লৈঙ্গিকভিত্তিক বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। তালাকের অধিকার, বৈবাহিক সম্পত্তিতে নারীর সমতা এবং সন্তানের অভিভাবকত্বে পিতা-মাতার সমান আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে এ জন্য ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত আইন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে, বিষয়টি এমন নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মীয় কাঠামো বজায় রেখেও লৈঙ্গিকসমতা-সংগত বিধিবদ্ধ সংস্কার করতে পারে। তিনি আরও জানান, সরাসরি অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬(১)(গ) প্রত্যাহার করলেই যে রাতারাতি উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন হয়ে যাবে, তা নয়। কারণ, উত্তরাধিকারের বিষয়গুলো সিডওর ১৬(১)(h) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অনুচ্ছেদ ২-এর পূর্ণ রূপায়ণ রাষ্ট্রকে নারীর অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলবে।

জাতিসংঘ সিডও কমিটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আর্টিকেল ২ ও ১৬-তে বাংলাদেশ যে সংরক্ষণ বজায় রেখেছে, তা সিডও সনদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়, ধর্মভিত্তিক পারিবারিক কাঠামোর কারণে সিডও সনদের পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব নয়। অথচ তিউনিসিয়া, মরক্কো ও তুরস্কের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলো তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইনের সংস্কার ঘটিয়ে লৈঙ্গিকসমতা নিশ্চিতকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০৪ সালে মরক্কো তাদের পারিবারিক আইন বা মুদাওয়ানা সংশোধন করে নারী ও পুরুষকে পরিবারের সমান দায়িত্ব দেয়, নারীদের তালাকের অধিকার সহজ করে এবং বহুবিবাহ প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ১৯৫৬ সালের পারিবারিক আইন সংস্কারের পর তিউনিসিয়া ২০১৭ সালে অমুসলিম পুরুষদের সঙ্গে মুসলিম নারীদের বিয়ের আইনি বাধা দূর করে এবং সিডও সনদের সব ধরনের রিজার্ভেশন প্রত্যাহার করে নেয়।

ফলে নারী অধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞসহ অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সিডও সনদ অনুমোদনে বাংলাদেশ প্রস্তুত হবে কবে?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত