Ajker Patrika

যুদ্ধে মরছে ইউক্রেনীয়রা, সেই তথ্যে এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে প্যালান্টির

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৯: ৩২
যুদ্ধে মরছে ইউক্রেনীয়রা, সেই তথ্যে এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে প্যালান্টির

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের রীতিনীতি ও গতিপথ রাতারাতি বদলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি। প্রথাগত অস্ত্রের সক্ষমতার চেয়ে এখন যুদ্ধক্ষেত্রে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে নির্ভুল ডেটা সংগ্রহ এবং তা রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা। আর এই নতুন রণকৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিভিন্ন পশ্চিমা প্রযুক্তি জায়ান্ট। তবে ইউক্রেন সংঘাত থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর আধিপত্য নৈতিক, কূটনৈতিক ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলছে।

বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর এখন মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘প্যালান্টির’-এর মতো শক্তিশালী ডেটা অ্যানালিটিকস কোম্পানিগুলোর দিকে। এরা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংবেদনশীল সামরিক তথ্য সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকীকরণ ও এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন আধুনিক ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে পদ্ধতিগতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। ড্রোন, রাডার, ভিডিও ফিড এবং স্বয়ংক্রিয় সেন্সর থেকে প্রাপ্ত এই বিশাল তথ্য ভান্ডার ইউক্রেনীয় বাহিনীকে রাশিয়ার সামরিক কৌশল অনুমান এবং তাৎক্ষণিক জবাব দিতে সাহায্য করছে। আর এই ডিজিটাল ফ্রন্টলাইনে কিয়েভের মূল সঙ্গী হয়ে ওঠে ফ্লোরিডাভিত্তিক বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির।

চলতি বছর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্যালান্টির যৌথভাবে ‘ব্রাভ-ওয়ান ডেটারুম’ নামক একটি বিশেষায়িত সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত তথ্য ব্যবহার করে সামরিক অ্যাপ্লিকেশনের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুত করা। তবে এই ডেটা ভাগাভাগি নিয়ে ইউক্রেনের ভেতরেই ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দেশটিকে এই দুর্লভ ডেটা সংগ্রহের মাশুল দিতে হচ্ছে লাখ লাখ সেনার রক্তের বিনিময়ে। অথচ কোনো চুক্তি ছাড়াই পশ্চিমা বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্যালান্টিরের মতো কোম্পানিগুলো সরাসরি এই ডেটা নিজেদের মালিকানায় না নিলেও, এই বিরল তথ্য–উপাত্ত ব্যবহার করে তাদের এআই মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত করে তুলছে—যা বিশ্ববাজারে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সুবিধা এনে দিচ্ছে।

তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে এভাবে রাষ্ট্রের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল তথ্য চলে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। অতীতে যেকোনো যুদ্ধের প্রধান কারিগর ছিল সার্বভৌম রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিতকরণ এবং নজরদারির জন্য রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি জায়ান্ট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে স্পেস-এক্সের ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট নিয়ে। যুদ্ধ চলাকালে ইউক্রেনীয় বাহিনী যখন খেরসন পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই টেলিকম সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল স্টারলিংক বন্ধ হওয়ার কারণে। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংকটকালে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হঠকারী সিদ্ধান্ত একটি সার্বভৌম দেশের সামরিক কার্যক্রমকে এক মুহূর্তে অচল করে দিতে পারে।

একই আশঙ্কা থেকে ইউরোপের একাধিক দেশ এখন প্যালান্টিরসহ অন্যান্য মার্কিন প্রযুক্তি নির্ভরতা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফরাসি ও জার্মান সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তার তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় এবং কৌশলগত নির্ভরতা এড়াতে প্যালান্টিরের চুক্তি বাতিল ও এর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। স্পেনের কর্তৃপক্ষও তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের চুক্তি না করার নির্দেশ দিয়েছে।

তবে প্যালান্টিরের বিরুদ্ধে কেবল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগই নয়, তাদের তৈরি প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চলা ভয়াবহ গণহত্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা প্রক্রিয়াকরণের এআই প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করেছে প্যালান্টির। এই প্রযুক্তি হাজার হাজার সাধারণ ফিলিস্তিনির প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ানো সামরিক হামলায় সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্যালান্টিরের বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ‘আইসিএম’ এবং ‘ফ্যালকন’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী ও অনথিভুক্ত অভিবাসীর তথ্য সংগ্রহ ও তাঁদের গণহারে ফেরত পাঠানোর কাজ সহজ করা হয়।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার (এনএইচএ) রোগীদের সংবেদনশীল শারীরিক তথ্য প্যালান্টিরের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তির পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, প্রযুক্তি জায়ান্ট এবং জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থার এই ‘ভয়াবহ মেলবন্ধন’ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।

এদিকে প্যালান্টির দাবি করে আসছে যে, তারা কেবল গ্রাহকদের ডেটা বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে এবং নিজেরা কখনোই সেই ডেটা সংরক্ষণ বা নিজস্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে না। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং ডেটা অধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োগ সামরিক ও বেসামরিক জীবনের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সীমানাকে সহজেই লঙ্ঘন করতে পারে।

সাধারণ মানুষের বা কোনো দেশের নাগরিকদের রক্তে ও ত্যাগে অর্জিত তথ্য দিয়ে যদি একটি বেসরকারি কোম্পানি তাদের ‘যুদ্ধ যন্ত্র’ তৈরি করে, তবে সেখানে নৈতিকতার প্রশ্ন থেকে যায়। তাই আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক তথ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ প্রতিরোধে আইনি নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে, অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি গুটিকয়েক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত