Ajker Patrika

কেপ ভার্দের ক্ষুধা মেটানো গোল ও এক বাবার উপহার

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
কেপ ভার্দের ক্ষুধা মেটানো গোল ও এক বাবার উপহার
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের প্রথম গোলদাতা কেভিন পিনা। ছবি: এএফপি

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচের বয়স ২১ মিনিট। উরুগুয়ের বক্সের বাইরে প্রায় ২৫ গজ দূরে ফ্রি-কিক পেল কেপ ভার্দে। ফ্রি কিক নিতে এলেন ২৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার কেভিন পিনা। তাঁর নেওয়া নিচু শটটি উরুগুয়ের দুই ডিফেন্ডারের হাঁটুর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বলের এই আচমকা নিচু গতি ও দিক পরিবর্তনে ফার্নান্দো মুসলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েও কিছু করতে পারলেন। কেপ ভার্দে পেয়ে গেল বিশ্বকাপে তাদের প্রথম গোল। সেই বিশ্বকাপেই নিজের নামটা চিরতরে খোদাই করে নিলেন পিনা।

এই পিনাকে নিয়ে আজকের যে উন্মাদনা, কয়েক বছর আগেও তাঁর জীবনটা ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা। কেপ ভার্দের রাজধানী প্রাইয়াতে জন্ম নেওয়া এই তরুণের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন থমকে গিয়েছিল খুব অল্প বয়সেই, যখন তাঁর পরিবার আমেরিকায় পাড়ি জমায়। পিনা নিজেও ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের গল্প বুঝি ওখানেই শেষ। কিন্তু গলির ফুটবল ম্যাচ থেকেও যে রাজপুত্র উঠে আসতে পারে, পিনা তার প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রকটনের এক রাস্তায় ‘স্ট্রিট ফুটবল’ খেলার সময় তাঁকে আবিষ্কার করেন কেপ ভার্দে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক কার্লোস কালো মোরাইস। পিনার ভেতরের বারুদ চিনে নিতে ভুল করেননি তিনি।

তবে ফেরার পথটা সহজ ছিল না। পর্তুগালের নামী ক্লাব বেনফিকায় ট্রায়াল দিয়েও ব্যর্থ হতে হয়েছিল তাঁকে। বেনফিকা কর্তৃপক্ষ তো লিখিতভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল—এই ছেলে দলে নেওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো নয়। সেই অযোগ্যতার গল্প মনে করে কালো মোরাইস হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘বেনফিকার দেওয়া সেই চিঠিটি এখনো আমার কাছে আছে, যেখানে লেখা ছিল সে দলে নেওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো নয়।’

উপেক্ষিত হওয়ার সেই ক্ষতকে পিনা পরিণত করেছিলেন শক্তিতে। পর্তুগালের নিচু সারির ক্লাবে খেলে২০২২ সালে যোগ দেন রাশিয়ার জায়ান্ট এফসি ক্রাসনোদারে। আগ্রাসীভাবে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আর নিখুঁত কৌশল তাঁকে লিগের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়ে ওঠেন। আর এখন তিনি কেপ ভার্দের মাঝমাঠের মূল ইঞ্জিন।

উরুগুয়ের বিপক্ষে ওই জাদুকরী গোলের পর মাঠে দেখা গিয়েছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য। গোল উদযাপনের ঠিক আগে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলেন পিনা। ম্যাচ শেষে সেই রহস্যের জট খুলে তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত আনন্দের একটি মুহূর্ত। আমি যখন এক-দুই সেকেন্ডের জন্য থেমেছিলাম, তার কারণ ছিল আমি দেখতে চাচ্ছিলাম আমার মেয়ে কোথায় আছে, যেন গোলটি তাকে উৎসর্গ করতে পারি। দেশের জন্য লড়াই করতে পেরে আমি খুবই খুশি এবং গর্বিত।’

স্পেনকে গোলশূন্য রুখে দেওয়া আর উরুগুয়ের সাথে ২-২ গোলের ড্র—কেপ ভার্দে এখন চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ‘জায়ান্ট কিলার’। বিশ্বজুড়ে এই পারফরম্যান্স বড় ‘চমক’ মনে হলেও পিনাদের আত্মবিশ্বাস কিন্তু আকাশছোঁয়া। বিশ্বকে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে পিনা বলেন, ‘আমাদের কাছে এটি কোনো চমক নয়, কারণ আমরা কঠোর পরিশ্রম করি এবং সবসময় মনোযোগী থাকি। আমরা আরও বেশি কিছু অর্জন করতে চাই। বিশ্বের কাছে এটি একটি চমক হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে নয়।’

আমেরিকার গলি থেকে বেনফিকার প্রত্যাখ্যানের চিঠি— সব বাধা টপকে কেভিন পিনা আজ বিশ্ব ফুটবলের এক অনন্য রূপকথা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত