Ajker Patrika

অশ্রু আর হাসিতে বিদায়ী ভাষণে কী বললেন মেসি

ক্রীড়া ডেস্ক    
আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ২৫
অশ্রু আর হাসিতে বিদায়ী ভাষণে কী বললেন মেসি
বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছেন লিওনেল মেসি। ছবি: এএফপি

লিওনেল মেসি যখন মাইক্রোফোন হাতে কিছু একটা বলে উঠলেন, তখন পুরো মনুমেন্তাল করতালিতে ফেটে পড়ল। মুখে হাসি থাকলেও বিদায় বেলায় যে একটা কষ্ট কাজ করছে, সেটা কি আর বলতে! চোখ দিয়ে ঝরেছে দু এক ফোঁটা অশ্রু। আবেগ সামলে উপস্থিত সবার সামনে দিলেন ভাষণ।

মেসি যখন বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন কোচ লিওনেল স্কালোনিসহ স্টেডিয়ামের দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, এনসো ফের্নান্দেসরাও একচিত্তে শুনছিলেন মেসির বাণী। সতীর্থদের কারও কারও চোখ বেয়ে পানি পড়তেও দেখা গেছে। ভাষণ শেষে স্টেডিয়ামে ফোটানো হলো আতশবাজি। ফুটবলাররাও তাঁকে ঘিরে নাচতে শুরু করলেন। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া মেসির বিদায়ী ভাষণ হুবহু বাংলায় অনুবাদ থাকল এখানে:

‘ফিরে না আসাটা খুবই কষ্টদায়ক হবে। আমি শপথ করে বলতে পারি, জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন খেলোয়াড়ের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর একটি।

আজ কিছু বলা খুব কঠিন। মনের মধ্যে এত আবেগ কাজ করছে। প্রথমেই আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি—যেমনটা আমার বিদায়ী চিঠিতেও বলেছিলাম। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। আমরা যত কঠিন পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হয়েছি না কেন, সবচেয়ে খারাপ সময়েও কখনো লড়াই করা থামাইনি। নিজের সর্বস্ব দিতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করিনি।

আর ফিরে না আসাটা আমার জন্য ভীষণ কষ্টের হবে। সত্যি বলছি, আমি সারাজীবন ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা—একজন মানুষের জীবনে ঘটে যেতে পারে এমন সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর একটি।

আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই, কিন্তু আমার মনে হয়, এটাই সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য অনেক বেশি কঠিন ছিল। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা খুব কাছাকাছি গিয়েছিলাম, আর সত্যি বলতে, অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি। আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি শারীরিক ও মানসিক—দুই দিক থেকেই আমাদের জন্য ভীষণ ক্লান্তিকর ছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে টিকে ছিলাম।

আমরা সবসময়ের মতো লড়াই করেছি—এই জার্সির জন্য, আর যেসব সতীর্থের সঙ্গে আমি এটি ভাগ করে নিয়েছি, তাদের সবার সঙ্গে। আমার পাশে থাকা প্রতিটি সতীর্থ যে এই জার্সির জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, তার জন্য আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার, কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, ফাইনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, আমরা যে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় খেলেছি তার সবকিছুর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন।

তাদের সঙ্গে মাঠে ও মাঠের বাইরে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল অপরিসীম সম্মানের। আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলাম। কারণ, আমি জানতাম, আমার পাশে এমন যোদ্ধারা রয়েছে যারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়বে।

এখানে খেলা আমি ভীষণ মিস করব। আমি সৌভাগ্যবান যে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছি। আর সব সময় মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। জীবনের প্রত্যেক অভিজ্ঞতার জন্য কৃতজ্ঞ।

আমি কৃতজ্ঞ যে এত বছর ধরে, আমি যেখানেই গিয়েছি, স্টেডিয়াম সবসময় পরিপূর্ণ ছিল—ম্যাচ বিশ্বকাপের হোক বা কোপা আমেরিকার। তারা সব জায়গায় ছিল, আমাদের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমরা জানি, এটা কতটা কঠিন। আর আমরা সব সময় অনুভব করেছি, যেখানেই খেলি না কেন, আমরা যেন নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি। আমরা সত্যিই সেটা অনুভব করেছি।

আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি আমি এখানে অনুভব করেছি। বিশ্বকাপ জয়ের পর যখন আমরা আবার খেলার মাঠে ফিরেছিলাম। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলব না। দিনটি ছিল অসাধারণ সুন্দর। আজও আমি সেই দিনের ভিডিও দেখি আর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। সেই দিনটি চিরকাল আমার ইতিহাসে, তাদের ইতিহাসে এবং আমার পরিবারের ইতিহাসে লেখা থাকবে। দিনটি ছিল অসাধারণ। আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।

আর আজ আবার এখানে ফিরে এসে আমি নিশ্চিতভাবেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি অনুভব করছি। কারণ, আজ সেই দিন, যেদিন আমি জাতীয় দল এবং তোমাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। জাতীয় দলের জার্সি পরে খেলা ভীষণ মিস করব। কিন্তু এখন থেকে আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকব—ওই পাশে, তোমাদের সবার সঙ্গে, এই ছেলেদের এবং সামনে যা কিছু আসবে, সেটার প্রতি সমর্থন জানাব। আমরা সব সময় একসঙ্গে থাকব।

আমরা যখন একত্রিত হই এবং ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো দলের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি এবং যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারি। অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে সেটা।


নিশ্চয়ই কঠিন সময় আসবে। কারণ, এই সময়ে আমরা যা অর্জন করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। আর সেই কঠিন সময়গুলোতে আমাদের আগের চেয়েও বেশি তাদের পাশে থাকতে হবে।

আমি তাদের সবসময় যেমন বলি, আমাদের শেষ আলোচনাতেও যেমন বলেছিলাম—বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলতে হবে। কারণ এমন মানুষ আছে যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ হতে দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না।

কঠিন সময়, খারাপ সময়—এসব সময়েই আসলে বোঝা যায়, একটা দল কতটা শক্তিশালী। যখন একটি দলের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য থাকে না, তখন কোনো কিছু অর্জন করাই খুব কঠিন।

আর আমি তোমাদের বলছি, আমরা ছিলাম একটি অসাধারণ দল। আর এ কারণেই আমরা এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।


সত্যি বলতে, আমি আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না।


আমি শুধু তোমাদের বলতে চাই—আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি। আমি তোমাদের ভীষণ মিস করব। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন।


আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত। আর আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত