Ajker Patrika

ফুটবল কতটা আপন করে নিচ্ছেন মার্কিনরা

রানা আব্বাস, মায়ামি থেকে
ফুটবল কতটা আপন করে নিচ্ছেন মার্কিনরা
বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে ও ভেতরে এমন দৃশ্য খুব সাধারণ হলেও খেলাপ্রিয় সাধারণ মার্কিনদের প্রথম ভালোবাসা ফুটবল নয়। ছবি: এএফপি

মায়ামির বে-ফ্রন্ট পার্ক সৈকতের ফ্যান জোন থেকে বেরিয়ে উবারে উঠতেই চালকের সিটের পেছনের স্ক্রিনে একটা জরিপ চোখে পড়ল। প্রশ্ন করা হয়েছে, আপনি কোনটাতে ভোট দেবেন—ফুটবল নাকি সকার? চোখ বুজে ‘ফুটবলে’ টিক দেওয়া হলো।

জরিপের ফলাফলে দেখা গেল, এই গাড়িতে ওঠা ৪২ শতাংশ যাত্রী ফুটবলে ভোট দিয়েছেন, সকারে ৫৮ শতাংশ। তার মানে, মার্কিনদের কাছে চর্মগোলকটা ‘সকার’ই; সারা পৃথিবীর কাছে যেটা ফুটবল। আমেরিকাতেও ফুটবল আছে, সেটা এখানে সকারের চেয়ে জনপ্রিয়। যে খেলাটার বল ডিম্বাকৃতির, খেলোয়াড়েরা হেলমেট ও ভারী সুরক্ষা সরঞ্জাম (প্যাড) পরে খেলেন। বল হাতে নিয়ে দৌড়ানো, পাস দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের এন্ড জোনে পৌঁছে টাচডাউন করাই খেলার মূল নিয়ম। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় পেশাদার লিগ ‘ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (এনএফএল)।’

ন্যাশনাল ফুটবল লিগ, বাস্কেটবল, বেসবলের দেশে ফুটবলের (সকার) অবস্থান একটু পেছনেই। সেখানেই হচ্ছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ—বিশ্বকাপ ফুটবল। যে টুর্নামেন্টে বুঁদ পুরো পৃথিবী। অথচ আমেরিকানদের কাছে এই ফুটবলের আবেদন কিছুতেই এনএফএল, এমএলবি, এনবিএর চেয়ে বেশি নয়। ফুটবল বিশ্বকাপ চলার সময় গত এক মাসে যত মার্কিনের সঙ্গে আলাপ হলো, বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁদের কমবেশি আগ্রহ আছে বা খোঁজখবর রাখেন, নিজেদের দলকেও সমর্থন দিচ্ছেন। কিন্তু পাগলামি বা উন্মাদনাটা সেভাবে নেই।

একটা মজার ঘটনা বলি, হিউস্টনে শেষ ৩২ পর্বে ব্রাজিল-জাপানের ম্যাচ শেষে ভিআইপি এক্সিটে দাঁড়িয়ে আছি ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিদের দলটা দেখব বলে। ঘণ্টাখানেক পর তাঁরা বের হলেন—কাফু, রোমারিও, রোনালদো, বেবেতো...। তাঁদের দেখতেই যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে ভিডিও করতে শুরু করলাম, স্বেচ্ছাসেবী এক তরুণী কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন, এত গুরুত্বের সঙ্গে আপনি যাঁদের ভিডিও করলেন, ছবি তুললেন, তাঁরা কারা? মেয়েটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না! জানতে চাইলাম, আপনি বোধ হয় নিখাদ মার্কিন? লাজুক হাসিতে বললেন, ‘হ্যাঁ, আসলে সকারের (ফুটবল) খোঁজখবর খুব একটা রাখা হয় না!’ যখন বলা হলো, যাঁদের দেখলেন, তাঁরা সবাই বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। নিরাপত্তাকর্মীদের বলয় না থাকলে তাঁরা এখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়াতে পারবেন না, ভক্ত-সমর্থকদের ছবি-সেলফির হিড়িক পড়ে যাবে। মেয়েটির প্রতিক্রিয়া, ‘ওয়াও, গ্রেট!’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপের প্রতিটি ভেন্যুতে যে উপচে পড়া দর্শক, টেলিভিশন ও ডিজিটাল ভিউয়ারশিপের নতুন রেকর্ড, ফ্যান জোনে হাজারো দর্শকের ভিড়—তাঁরা কারা? বেশির ভাগ আসলে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হওয়া বা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শক। গত শনিবার বিকেলে মায়ামির বে-ফ্রন্ট ফ্যান জোনে ভিড়টা একটু বেশিই মনে হলো। এই ভিড় মূলত ছুটির দিন উপলক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস এবং দেশটির ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফিফা নানা ধরনের আয়োজন করেছে। জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে উৎসবের আবহ তৈরি করা হয়েছে। আতশবাজির ঝলক দেখা গেছে। এদিন বোস্টন ও ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের আগে লাল, সাদা ও নীল রঙের বর্ণিল আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দিনটা নানাভাবে রাঙিয়েছে ফিফা ও আয়োজকেরা।

এটা ঠিক, বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, লিওনেল মেসির মতো মহাতারকার আগমনে মার্কিন মুলুকে সকারের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। তবে সেটা যতটা না খাঁটি মার্কিনদের মধ্যে, তার চেয়ে বেশি অভিবাসীদের মধ্যে। বিশ্বকাপের মতো এই জমজমাট মহাযজ্ঞের পরও মার্কিনরা সকারকে কতটা ‘আপন’ করে নিচ্ছেন, সেই প্রশ্নের চেয়ে ফিফার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ফুলে-ফেঁপে উঠছে তাদের কোষাগার। আর মাঠের খেলায় পুরো পৃথিবীর দর্শক দেখছে একটার পর একটা ‘ব্লকবাস্টার শো’!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত