Ajker Patrika

২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে জামায়াতের ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১: ১৯
২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে জামায়াতের ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার
রাজধানীর হোটেল শেরাটনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এই ইশতেহার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখাকে সামনে রেখে এই ইশতেহার উপস্থাপন করা হয়। এবারের স্লোগান হচ্ছে—‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।’

আজ বুধবার রাজধানীর হোটেল শেরাটনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এই ইশতেহার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলটির নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। একই সঙ্গে বহু রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতে অংশ নেন।

মোট ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারটি তৈরি করা হয়েছে। ইশতেহারের প্রথম ভাগে একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা সংস্কার, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং উন্নত আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যুব প্রযুক্তি নেতৃত্বের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নারী ও শিশু নিরাপত্তা, সমাজকল্যাণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।

জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহার’ তৈরিতে অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চাহিদা বিবেচনা করে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে, সেগুলো হলো—‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’—এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন। বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন। যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া। নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন। প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনা মূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই এবং স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ। সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত এবং কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।

বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা। জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্যনিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বাজারশূন্যতা ও বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি করা। শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা। প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা। আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

আরও রয়েছে, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা। যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে আমি একজন আহত সৈনিক। গত কয়েক দিন ধরে দেখেছেন, আমার ওপর চতুর্দিক থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আমি কোনো অ্যান্টি-মিসাইল ইউজ করব না। বরং আমার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সাক্ষী রেখে, যাঁরা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমার চরিত্র হনন করেছেন, আমি তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। কারণ, আমার রক্ত ও মেজাজের সঙ্গে প্রতিশোধ মানায় না।’

আমরা পেছনের সেই রাজনীতি আর ধারণ করতে চাই না মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, ‘ওগুলোকে পেছনে ফেলে যুবসমাজের হাত ধরে এখন সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের যুবসমাজ অত্যন্ত পটেনশিয়াল, আমাদের চেয়ে অনেক ফ্রেশ, ইনোভেটিভ এবং প্র্যাগম্যাটিক। জুলাই বিপ্লবে তারা যেভাবে পেরেছে, ইনশা আল্লাহ আগামীর বাংলাদেশ গড়তেও তারা সেভাবেই পারবে। সেই যুবসমাজের প্রত্যাশাকে ধারণ করেই আমরা আমাদের ইশতেহার রচনা করেছি।’

ইশতেহার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা ইশতেহার রচনা করেছি মায়ের জাতিকে সম্মান দেওয়ার জন্য, শিশুদের জন্য নিরাপদ আবাসভূমি ও মেধা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য। সুস্থ জাতি গঠনের প্রয়োজনে যা যা দরকার, সেই সমস্ত সার্ভিস নিশ্চিত করার জন্য। যে কৃষকেরা আমাদের মুখে খাবার তুলে দেন, তাঁদের জীবনেও আমরা বিপ্লব আনতে চাই।’

আমরা বিশ্বের সব সভ্য দেশের সঙ্গে মানবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একবার একজন কূটনীতিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—এই দেশগুলোর সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন হবে? আমি আকাশের দিকে ইশারা করে বলেছিলাম—কালারফুল হবে, ইনশা আল্লাহ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিএনপি সরকার গঠন করলে এনসিপির অবস্থান কী হবে, যা জানালেন নাহিদ ইসলাম

নওগাঁয় হাসপাতালের সামনে পড়ে ছিল রাজস্ব কর্মকর্তার রক্তাক্ত লাশ

যেভাবে হত্যা করা হয় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফকে

অনলাইন গেমের নেশা: নিষেধ করায় গভীর রাতে ৯ তলা থেকে ঝাঁপ দিল ৩ বোন

জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের কী হবে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত