মাছ চাষে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান
প্রযুক্তির ব্যবহার মাছ চাষের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন ও অন্যান্য গুণগত বৈশিষ্ট্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার আগাম লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী পানিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা, উপযুক্ত পানি ব্যবস্থাপনা এবং মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।

ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার বালিয়া গ্রাম। সেখান থেকে চোখে পড়ে দূরের গারো পাহাড়, সবুজ প্রান্তর, ফসলের মাঠ আর পুকুরের পর পুকুর। একসময় ধান-পাটই ছিল এ অঞ্চলের প্রধান কৃষিপণ্য। গত চার দশকে চিত্র বদলেছে। ধান-পাটের অনেক জমি পরিণত হয়েছে মাছ চাষের পুকুরে। ক্রমেই বাড়ছে মাছ চাষের পরিধি, যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন একটি ধারা। এ অঞ্চলে মাছ চাষের সাফল্য ধরে রেখেছেন যাঁরা, তাঁদের একজন জাহাঙ্গীর আলম।
আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। জাহাঙ্গীর আলম যুক্ত ছিলেন পারিবারিক স্যানিটারি পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে। সে সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে মাছ চাষের প্রসার ঘটছিল। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা মাছ চাষে এগিয়ে আসছিলেন। মাছচাষিরা বিভিন্ন পণ্য কিনতে তাঁর দোকানে আসতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে মাছ চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পান জাহাঙ্গীর। বুঝতে পারেন, এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একসময় ব্যবসা বদলে নিজেই নেমে পড়েন মাছ চাষে।
প্রথমে পাঁচ একর জমি লিজ নিয়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য বিক্রি করেন স্ত্রীর গয়না। ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রথম বছরেই মাছ বিক্রি করেন সাড়ে ৯ লাখ টাকার। তাঁর হিসাবে, নিট লাভ হয়েছিল সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এই সাফল্য তাঁকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। মাছ চাষই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পেশা ও মনোযোগের জায়গা। ধীরে ধীরে স্ত্রীর বিক্রি করা গয়নাগুলোও আবার গড়ে দেন।
কই ও তেলাপিয়া দিয়ে মাছ চাষ শুরু করলেও জাহাঙ্গীর অল্প দিনেই বুঝতে পারেন, প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনব্যবস্থায় নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। মাছ চাষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভালো মানের পোনা। পোনার মান ভালো না হলে মাছের বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বাইরে থেকে পোনা সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমাতে তিনি শুরু করেন পোনা উৎপাদন। গড়ে তোলেন নিজস্ব হ্যাচারি।
সাতটি পুকুর দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা। এখন তাঁর রয়েছে অর্ধশতাধিক পুকুর। মাছ চাষের পাশাপাশি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনও তাঁর ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাড়ছে উৎপাদনের পরিধি, তৈরি হচ্ছে নতুন প্রকল্প। তবে বড় খামার পরিচালনার সঙ্গে বাড়ে বিনিয়োগের পরিমাণ, পরিচালন ব্যয় এবং ঝুঁকির মাত্রাও।
জাহাঙ্গীরের কাছে সাফল্যের হিসাব শুধু নিজের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর খামারে কাজ করেন প্রায় ৩০ জন। তাঁদের পরিবারের জীবিকাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে খামারের উৎপাদন ও আয় শুধু একজন উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে না, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখে।
জাহাঙ্গীরের লাভ-লোকসানের হিসাব অন্য অনেক ব্যবসার মতো সরল নয়। তাঁর খাতায় লাভের হিসাব যেমন আছে, তেমনি আছে বড় ধরনের ক্ষতির অভিজ্ঞতাও। একবার অতিবৃষ্টিতে তাঁর পুকুরগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। এক রাতের বৃষ্টিতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার মাছ ভেসে যায় বলে জানান তিনি। দীর্ঘদিনের শ্রম, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ আয়ের প্রত্যাশা মুহূর্তেই বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
সেখান থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন জাহাঙ্গীর। আবারও স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে নতুন করে শুরু করেন। তাঁর কাছে ব্যবসা মানে শুধু লাভের হিসাব নয়, ক্ষতির পর আবার দাঁড়ানোর প্রস্তুতিও। অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, মাছ চাষে উৎপাদনের কৌশল জানার পাশাপাশি ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতাও জরুরি।
এখন অর্ধশতাধিক পুকুরের বাইরেও নতুন প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। মাছ চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণায় তাঁর আগ্রহ রয়েছে। দেশি শিং মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষের প্রসারে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক পেয়েছেন তিনি। দেশীয় মাছের প্রজনন ও চাষের কৌশল উন্নত করা সম্ভব হলে একদিকে উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তবে জাহাঙ্গীরের বর্তমান উদ্বেগ মাছের উৎপাদন বাড়ানোকে ঘিরে নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে।
তিনি যে সময়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন, তখন উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল বড় আকর্ষণ। এখন সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি হিসাব করতে হচ্ছে মাছের খাবার, পোনা, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য উপকরণের ব্যয়। উৎপাদন খরচ বাড়লে মাছ বিক্রি করে আগের মতো মুনাফা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার ওপর অতিবৃষ্টি, বন্যা, তাপমাত্রার পরিবর্তন ও পানির গুণগত মানের অবনতির মতো ঝুঁকি রয়েছে। সব মিলিয়ে মাছ চাষের অর্থনীতি এখন আগের চেয়ে জটিল।
বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সামগ্রিক চিত্র অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০২৪-২৫’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে উৎপাদিত হয়েছে ৩১ দশমিক ০৪ লাখ টন, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আহরিত হয়েছে ১৪ দশমিক ৩৬ লাখ টন এবং সামুদ্রিক উৎস থেকে এসেছে ৫ দশমিক ৬৮ লাখ টন মাছ।
অর্থাৎ, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৬১ শতাংশ এসেছে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয় থেকে। পুকুরে মাছ চাষের ব্যাপক বিস্তার যে দেশের মৎস্য উৎপাদনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এই পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ। জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ এ উৎপাদনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে মাছ চাষের বিস্তার খাদ্য সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাছ মানুষের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস। একই সঙ্গে পুকুরে মাছ চাষ, পোনা উৎপাদন, মাছের খাবার তৈরি ও সরবরাহ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফলে মাছ চাষের ক্ষতি শুধু একজন খামারির লোকসান নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার ওপরও।
কিন্তু এই অগ্রগতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন মাছ চাষের ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলছে। পরিস্থিতি ও অঞ্চলভেদে এসব পরিবর্তনের প্রভাব আলাদা হলেও পুকুরের পানি, মাছের স্বাস্থ্য, উৎপাদন চক্র ও বিনিয়োগের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার মাছ চাষের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন ও অন্যান্য গুণগত বৈশিষ্ট্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার আগাম লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী পানিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা, উপযুক্ত পানি ব্যবস্থাপনা এবং মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম বা আরএএস, বায়োফ্লক কিংবা অন্যান্য নিবিড় মাছ চাষ প্রযুক্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করলেও এগুলোর জন্য বিনিয়োগ, দক্ষতা, বিদ্যুৎ ও নিয়মিত কারিগরি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। প্রযুক্তি আধুনিক হলেই উৎপাদন লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উদ্যোক্তার জন্য কোন প্রযুক্তি উপযোগী, তার ব্যয় কত এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেটি কতটা কার্যকর থাকবে, এসব বিষয় যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জাহাঙ্গীর মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরের পাড়ে পেঁপে, কলা ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করছেন। তিনি জানান, এসব ফসল থেকে পাওয়া আয় মাছ চাষের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে উপযোগী ফসল উৎপাদন করলে একই জমি থেকে একাধিক উৎসে আয় হতে পারে।
মাছ চাষে সফল হতে শুধু পুকুর ও বিনিয়োগ থাকলেই চলে না। প্রয়োজন বাজার সম্পর্কে ধারণা, উৎপাদনব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, ভালো পোনার প্রাপ্যতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এখানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সহায়তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মাছচাষিদের কাছে সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ব্যবহারিক পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া, জলবায়ু সহনশীল পুকুর ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ, পানির গুণগত মান পরীক্ষার সুবিধা এবং মানসম্মত পোনা ও মাছের খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বড় উদ্যোক্তারা যেখানে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন, সেখানে সীমিত পুঁজি নিয়ে কাজ করা চাষিদের পক্ষে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন। তাই প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা এমনভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যাতে ছোট উদ্যোক্তারাও এর সুবিধা পান।
জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তারা দেশের মাছ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জলবায়ু সহনশীল মাছ চাষের উপযোগী কৌশল তৈরি করা গেলে উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবসার স্থায়িত্বও বাড়ানো সম্ভব।
লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই









