
ভারতের যে রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি, সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ। আর তাই এই রাজ্যের যেকোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনই বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সীমান্ত সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে কলকাতার রাজনৈতিক ঢেউ সহজেই ঢাকার কূটনীতি, সীমান্ত বাণিজ্য, পানিবণ্টন এমনকি জনমত পর্যন্ত এসে লাগে। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। প্রভাব ফেলবে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতিতে এবং আলোচনার অগ্রাধিকারে।
প্রথম প্রভাব পড়ে সীমান্ত রাজনীতিতে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এমন একটি রাজ্য, যেখানে বাংলাদেশ ইস্যু ভোটের প্রচারে প্রায়ই বড় বিষয় হয়ে ওঠে। অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, সংখ্যালঘু রাজনীতি—এসব শব্দ নির্বাচনী মঞ্চে যত বেশি উচ্চারিত হয়, ততই বাংলাদেশের নাম ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এর ফলে ঢাকার জন্য কূটনৈতিক পরিবেশ কখনো সহজ হয়, কখনো জটিল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে যদি এমন শক্তি বাড়ে যারা কঠোর নিরাপত্তাভিত্তিক অবস্থান নেয়, তাহলে বাংলাদেশবিরোধী জনমত শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিপরীতে বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী জনমত শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর যদি আঞ্চলিক সহযোগিতামুখী রাজনৈতিক সুর জোর পায়, তাহলে আলোচনা তুলনামূলক নরম হতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে বাংলাদেশসংলগ্ন অঞ্চল বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড ও আসামে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ একটি বড় ইস্যু। ঝাড়খন্ড ও বিহারে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে সাময়িকভাবে। আপিল করার সুযোগ থাকলেও ৯ এপ্রিল প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের আগে এই বিশালসংখ্যক মানুষের আবেদন নিষ্পত্তি করার কোনো সুযোগ নেই। আশঙ্কার বিষয় হলো—এই বাদ পড়া ভোটারদের অনেককেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হয়েছে। আরেকটি বিপজ্জনক বিষয় হলো—যেসব মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাদের একটা বড় অংশই মুসলমান এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও এ-সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য এখনো বিশ্লেষণ করে উঠতে পারেননি গবেষকেরা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই সমস্যা সরাসরি জড়িত—এক. সীমান্ত হত্যা এবং দুই. তিস্তার পানিবণ্টন। বাংলাদেশের বহুদিনের প্রত্যাশা, তিস্তা চুক্তি এগিয়ে যাক। কিন্তু এই প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সরকার যদি চুক্তিতে আপত্তি তোলে বা কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় না বাড়ে, তাহলে অগ্রগতি আবার থেমে যেতে পারে। এর আগে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নিজ রাজ্যের পানি সংকটের অজুহাত দেখিয়ে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের তিস্তা চুক্তি আটকে দিয়েছিলেন। অবশ্য মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে প্রধান বিরোধী পক্ষ ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় এলেও যে বিষয়টি মিটে যাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে যে দল বা জোট ক্ষমতায় আসে, তারা তিস্তা নিয়ে কতটা নমনীয়, সেটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।
বাংলাদেশ-ভারত স্থল বাণিজ্যের বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে। পেট্রাপোল-বেনাপোল, শুল্ক প্রক্রিয়া, পণ্য পরিবহন, সীমান্ত অবকাঠামো—এসবের গতি-প্রকৃতি পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নির্বাচনের সময় বা পরে যদি সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ে, তাহলে রপ্তানি-আমদানি দেরি হয়, খরচ বাড়ে এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য, ছোট-মাঝারি আমদানিকারক, আর ট্রান্সপোর্ট-নির্ভর ব্যবসার ওপর চাপ পড়ে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর প্রশাসনিক অস্থিরতা যত বেশি হবে, বাংলাদেশের সীমান্ত অর্থনীতিও তত বেশি নড়বড়ে হতে পারে।
এই নির্বাচনের সঙ্গে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভাষ্যও জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশকে ঘিরে যে ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়, তা শুধু রাজ্য রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং অনেক সময় দুই দেশের সম্পর্কের আবহ বদলে দেয়। বিশেষ করে অনুপ্রবেশ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং পরিচয়বাদী রাজনীতির ভাষা ভারতীয় সমাজে বাংলাদেশের নাগরিকদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। বিগত কয়েক বছর এটাই হয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, বাংলাদেশের আশপাশের রাজ্যগুলোতে যেখানে মুসলমান রয়েছে, সেখানেই তাদের হরেদরে ‘বাংলাদেশি’ বলে তকমা দেওয়ার উদাহরণ বিশাল। এর প্রভাব পড়ে কূটনীতির শীর্ষ স্তরেও। কারণ, জনমত যত কঠোর হয়, নীতিনির্ধারকদের জন্য নমনীয়তা তত কমে। তাই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসলে শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী বা একটি দল বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; এটি অনেক সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জনসামাজিক আবহও নির্ধারণ করে।
তবে এই প্রভাবকে একরৈখিকভাবে দেখা ঠিক হবে না। পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিল্লিতেই হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং সীমান্তসংলগ্ন বাস্তবতার কারণে রাজ্যের ভূমিকা উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষ করে তিস্তা, সীমান্ত বাণিজ্য এবং অভিবাসন প্রশ্নে রাজ্য রাজনীতি অনেক সময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে ধীর করে দেয় বা তার ভাষা বদলে দেয়। তাই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বাংলাদেশের কাছে কেবল একটি ‘সরকার পরিবর্তন’ নয়, বরং কোন ধরনের বাস্তবতা সামনে আসতে চলেছে, তার একটি আগাম ইঙ্গিত।
আরেকটি কারণে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সবেমাত্র বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এর পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পারদ নিচের দিকে নামতে নামতে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। সেই জায়গা থেকে দুই দেশই এখন সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষই ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যদি নির্বাচনের কারণে কোনো ধরনের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ তৈরি হয়, সেটা বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে অবশ্যই নতুন করে প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাংলাদেশি হত্যা করার বিষয়টি নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রস্তুতি। একদিকে কূটনৈতিক পর্যায়ে তিস্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আর বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়ে ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখতে হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যায়ে আবেগের জায়গা থেকে নয়, বাস্তব স্বার্থের জায়গা থেকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল পড়তে হবে। কারণ, সেখানে যে ভাষা ও অবস্থান জোর পায়, তা বাংলাদেশে কখনো উদ্বেগ তৈরি করবে, কখনো আলোচনার সুযোগ খুলে দেবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য পরোক্ষ কিন্তু গভীর গুরুত্বের ঘটনা। এর প্রভাব দেখা যাবে নদীর পানিপ্রবাহে, সীমান্ত পারাপারে, বাণিজ্যের গতিতে, আর দুই দেশের সম্পর্কের সুরে। তাই এটিকে শুধু ভারতের রাজ্য নির্বাচন হিসেবে দেখা ভুল হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বাংলাদেশকেও ছুঁয়ে যায়—কখনো নীরবে, কখনো সরাসরি। আর সে কারণেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি নজরে রাখার মতো একটি নির্বাচন।
লেখক: সাংবাদিক

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী অস্ত্র দিয়ে হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি ও পাথর দিয়ে।’ তিনি এই মন্তব্য কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা লেখায় করেননি। জনশ্রুতি আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা দেখে সাংবাদিক ও লেখক লোরেন আইসনারে...
২ ঘণ্টা আগে
মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ হাজার বছরের বেশি প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানের দফারফা করার খায়েশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সেনাবাহিনীকে ইরান আক্রমণের নির্দেশ দেন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাহীন যুদ্ধটা তিনি শুরু করেছিলেন মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭৫ নিষ্পাপ শিশুর রক্ত হাতে-গায়ে মেখে।
২ ঘণ্টা আগে
ভেঙে গেল বিসিবি কমিটি। তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বোর্ড ভেঙে যাওয়ায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড সভাপতিত্বেরও ইতি ঘটল। নতুন অ্যাডহক কমিটির ওপর এখন দায়িত্ব পড়েছে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তৈরি করার।
২ ঘণ্টা আগে
অধিকাংশ মানুষের কাছে ‘উন্নয়ন’ বলতে বোঝায় পরিবর্তনের পরিমাণগত পরিমাপ; যেমন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। এ-জাতীয় পরিমাপের তিনটি সীমাবদ্ধতা থাকে— এক, উন্নয়নের ধ্যানধারণা অনেক ব্যাপ্ত এবং গভীর। এর যেকোনো পরিমাপ এই ধারণার পুরোটা যথার্থ এবং সামগ্রিকভাবে ধরতে পারে না। এমন পরিমাপ পুরো ধারণার একটি নির্দেশকমাত্র,
১ দিন আগে