রুহিনা তাসকিন

গত বছর আমরা রোজ ঘুমাতে যাওয়ার আগে ‘স্কোর’ দেখতাম। কানাডায় যখন দিন শেষ, তখন বাংলাদেশে প্রতিদিনকার করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রকাশ করা হতো। আজ কত? কালকের চেয়ে বেশি, না কম?
আমরা তখন ভূতের মতো লকডাউন পার করছি টরন্টোতে, যা শুরু হয়েছে গত বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকেই। মানুষজনের দেখা নেই, শপিং মল, রেস্তোরাঁ—সব বন্ধ। রোজকার বাজারের সব জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না। অনলাইন ডেলিভারির স্লট পাওয়ার জন্য পাঁচ-ছয় দিনের অপেক্ষা।
টয়লেট পেপার পাওয়া যাচ্ছিল না, ব্যাপারটা সত্যিই। কিছু কিছু খবর আছে না, সব রকম ফ্যাক্ট-চেক পার হয়ে সোর্সসহ প্রকাশিত হওয়ার পরও মনে হয় ফেক নিউজ? টয়লেট পেপারের দুষ্প্রাপ্যতার ব্যাপারটাও সে রকম বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু দেখলাম, আমাজনে নেই-ই। খুঁজে পেতে চীনের এক সেলারের কাছে অর্ডার করলাম টয়লেট পেপারের মতো কিছু একটা। ডেলিভারি ডেট প্রায় এক মাস পরে।
আমি কানাডায় এসেছিলাম গত বছরের মার্চে। আমার স্বামী আগে থেকেই এখানে থাকতেন। এসে দেখি বাসায় কফি নেই। আগেও বেড়াতে এসেছি কানাডায়। বাড়িতে কফির ব্যবস্থা রাখতে হবে, মনে হয়নি সে সময়। আমি একাই তো কফি খাই। স্টারবাকস থাকতে বাসায় কেন কফি লাগবে? আমাকে জানানো হলো, কফি অর্ডার করা হয়েছে, তিন-চার দিন পর আসবে। নির্দিষ্ট দিনে কফি হাতে পেয়ে দেখি সেটা ইনস্ট্যান্ট নয়, গ্রাউন্ড বিন। কফিমেকার ছাড়া বানানো যাবে না। কী করি, চা–পাতার মতো সেদ্ধ করে বানিয়ে ফেললাম কিছু একটা। বাসায় ছাঁকনি নেই। একটাই ওড়না এনেছিলাম, সেটার রং সাদা। এই যুদ্ধ জয় করে কফির মগে যখন চুমুক দিলাম, সেবার প্রথম আমার করোনাসংক্রান্ত ‘মেন্টাল ব্রেকডাউন’ হলো। হাস্যকর, তুচ্ছ একটা ব্যাপার। কিন্তু আমি পুরো বিকেলটা কেঁদেছিলাম।
এপ্রিলের শুরুতে আমার বন্ধু ফারজানা আর রাজীব বাসায় দিয়ে গেল বিশাল এক প্যাকেট টয়লেট পেপার আর নাশতার জন্য কর্নফ্লেক্স। তার কিছুদিন পরই অবশ্য অনলাইনে কেনাকাটা সহজ হয়ে গেল। চীন থেকে টয়লেট পেপারও একসময় পৌঁছে গেল। আশ্চর্য রকমের খসখসে আর ঘিয়ে তার রং। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে আমার বাবা হয়ে গেলেন স্কোরের অংশ। পায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধরা পড়ল কোভিড। নেগেটিভ হওয়ার আগে চিকিৎসা শুরু করা যাবে না। বাবা নেগেটিভ হলেন, অপারেশনের তারিখও পড়ল।
কিন্তু তাঁর চিকিৎসক এবার কোভিড পজিটিভ।
আমি আসতে পারতাম দেশে। সেটা আমার আর আমার পরিবারের জন্য শুধু ঝুঁকিই বাড়াত। কিন্তু আসা উচিত ছিল। বাবা যদি না ফিরতেন বাড়িতে?
তখন ফেসবুক দেখে মনে হয়েছিল, ঢাকা উৎসবের শহর। বিয়ে হচ্ছে, জন্মদিন হচ্ছে, মাস্ক ছাড়া সবাই ঘোরাঘুরি করছে, সেসব ছবি পোস্ট করছে ডিসক্লেইমারসহ—শুধু ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলেছি।
কানাডায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসেছিল টিকার প্রথম চালান। অবাক হয়ে দেখলাম, বড়দিনের ছুটিতে সব বন্ধ! অন্টারিও প্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা টিকা দেওয়া বন্ধ করে ছুটি কাটাতে গেলেন। সে জন্য রীতিমতো গালিও খেতে হয়েছে তাঁদের। বাংলাদেশ হলে কী হতো? টিকার চালান এসে বসে আছে আর ডাক্তার-নার্স ছুটিতে—এটা কি সম্ভব বাংলাদেশে!
কবে আমরা টিকা পাব, সেই আলাপই তুলিনি কেউ। চল্লিশের নিচে যাঁরা, তাঁরা নেই কোনো তালিকায়। অন্টারিও প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ টিকা না নিলে কিংবা না পেলে লকডাউন উঠবে না। এদিকে টিকা দেওয়া হচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। এক হিসাবে দেখলাম, বয়স বিবেচনায় আমাদের সেপ্টেম্বরের আগে পাওয়ার কথা নয়।
তবু জুন শেষ হওয়ার আগেই আমি ফুললি ভ্যাকসিনেটেড। নিবন্ধন লাগেনি। ওয়াক ইন ক্লিনিকে সরাসরি গিয়ে নিয়েছি টিকা। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার দিন লাইন পড়েছে লম্বা। আমরা গিয়েছিলাম বেশ দেরিতে। শখানেক মানুষ বিশাল পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে। ভলান্টিয়াররা সাহায্য করছেন। লাইন খুব সুন্দর এগোচ্ছে।
এর মধ্যে নামল বৃষ্টি। ছাতা নেই সঙ্গে। লাইন ছেড়েও যাচ্ছে না কেউ। সবাই মিলেই ভিজছি। এখানে কি আমার থাকার কথা?
এই লাইনটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধরতে পারতাম না, কিংবা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে? ‘ভাই, জায়গা রাইখেন’ বলে দৌড় দিয়ে ছাউনির খোঁজে যেতাম। ছত্রভঙ্গ লাইন দেখে ‘দেশের কী অবস্থা’ ধরনের ঝাল ঝাড়তাম। পাশ থেকে কেউ বৃষ্টির গান ধরত, গলা মেলাতাম সবাই। সারা দিন পার করে টিকা নিয়ে চটপটি আর চা খেয়ে বাড়ি ফিরতাম।
এমন হতে পারত না?
লেখক: কানাডাপ্রবাসী সাংবাদিক

গত বছর আমরা রোজ ঘুমাতে যাওয়ার আগে ‘স্কোর’ দেখতাম। কানাডায় যখন দিন শেষ, তখন বাংলাদেশে প্রতিদিনকার করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রকাশ করা হতো। আজ কত? কালকের চেয়ে বেশি, না কম?
আমরা তখন ভূতের মতো লকডাউন পার করছি টরন্টোতে, যা শুরু হয়েছে গত বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকেই। মানুষজনের দেখা নেই, শপিং মল, রেস্তোরাঁ—সব বন্ধ। রোজকার বাজারের সব জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না। অনলাইন ডেলিভারির স্লট পাওয়ার জন্য পাঁচ-ছয় দিনের অপেক্ষা।
টয়লেট পেপার পাওয়া যাচ্ছিল না, ব্যাপারটা সত্যিই। কিছু কিছু খবর আছে না, সব রকম ফ্যাক্ট-চেক পার হয়ে সোর্সসহ প্রকাশিত হওয়ার পরও মনে হয় ফেক নিউজ? টয়লেট পেপারের দুষ্প্রাপ্যতার ব্যাপারটাও সে রকম বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু দেখলাম, আমাজনে নেই-ই। খুঁজে পেতে চীনের এক সেলারের কাছে অর্ডার করলাম টয়লেট পেপারের মতো কিছু একটা। ডেলিভারি ডেট প্রায় এক মাস পরে।
আমি কানাডায় এসেছিলাম গত বছরের মার্চে। আমার স্বামী আগে থেকেই এখানে থাকতেন। এসে দেখি বাসায় কফি নেই। আগেও বেড়াতে এসেছি কানাডায়। বাড়িতে কফির ব্যবস্থা রাখতে হবে, মনে হয়নি সে সময়। আমি একাই তো কফি খাই। স্টারবাকস থাকতে বাসায় কেন কফি লাগবে? আমাকে জানানো হলো, কফি অর্ডার করা হয়েছে, তিন-চার দিন পর আসবে। নির্দিষ্ট দিনে কফি হাতে পেয়ে দেখি সেটা ইনস্ট্যান্ট নয়, গ্রাউন্ড বিন। কফিমেকার ছাড়া বানানো যাবে না। কী করি, চা–পাতার মতো সেদ্ধ করে বানিয়ে ফেললাম কিছু একটা। বাসায় ছাঁকনি নেই। একটাই ওড়না এনেছিলাম, সেটার রং সাদা। এই যুদ্ধ জয় করে কফির মগে যখন চুমুক দিলাম, সেবার প্রথম আমার করোনাসংক্রান্ত ‘মেন্টাল ব্রেকডাউন’ হলো। হাস্যকর, তুচ্ছ একটা ব্যাপার। কিন্তু আমি পুরো বিকেলটা কেঁদেছিলাম।
এপ্রিলের শুরুতে আমার বন্ধু ফারজানা আর রাজীব বাসায় দিয়ে গেল বিশাল এক প্যাকেট টয়লেট পেপার আর নাশতার জন্য কর্নফ্লেক্স। তার কিছুদিন পরই অবশ্য অনলাইনে কেনাকাটা সহজ হয়ে গেল। চীন থেকে টয়লেট পেপারও একসময় পৌঁছে গেল। আশ্চর্য রকমের খসখসে আর ঘিয়ে তার রং। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে আমার বাবা হয়ে গেলেন স্কোরের অংশ। পায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধরা পড়ল কোভিড। নেগেটিভ হওয়ার আগে চিকিৎসা শুরু করা যাবে না। বাবা নেগেটিভ হলেন, অপারেশনের তারিখও পড়ল।
কিন্তু তাঁর চিকিৎসক এবার কোভিড পজিটিভ।
আমি আসতে পারতাম দেশে। সেটা আমার আর আমার পরিবারের জন্য শুধু ঝুঁকিই বাড়াত। কিন্তু আসা উচিত ছিল। বাবা যদি না ফিরতেন বাড়িতে?
তখন ফেসবুক দেখে মনে হয়েছিল, ঢাকা উৎসবের শহর। বিয়ে হচ্ছে, জন্মদিন হচ্ছে, মাস্ক ছাড়া সবাই ঘোরাঘুরি করছে, সেসব ছবি পোস্ট করছে ডিসক্লেইমারসহ—শুধু ছবি তোলার জন্য মাস্ক খুলেছি।
কানাডায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসেছিল টিকার প্রথম চালান। অবাক হয়ে দেখলাম, বড়দিনের ছুটিতে সব বন্ধ! অন্টারিও প্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা টিকা দেওয়া বন্ধ করে ছুটি কাটাতে গেলেন। সে জন্য রীতিমতো গালিও খেতে হয়েছে তাঁদের। বাংলাদেশ হলে কী হতো? টিকার চালান এসে বসে আছে আর ডাক্তার-নার্স ছুটিতে—এটা কি সম্ভব বাংলাদেশে!
কবে আমরা টিকা পাব, সেই আলাপই তুলিনি কেউ। চল্লিশের নিচে যাঁরা, তাঁরা নেই কোনো তালিকায়। অন্টারিও প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ টিকা না নিলে কিংবা না পেলে লকডাউন উঠবে না। এদিকে টিকা দেওয়া হচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। এক হিসাবে দেখলাম, বয়স বিবেচনায় আমাদের সেপ্টেম্বরের আগে পাওয়ার কথা নয়।
তবু জুন শেষ হওয়ার আগেই আমি ফুললি ভ্যাকসিনেটেড। নিবন্ধন লাগেনি। ওয়াক ইন ক্লিনিকে সরাসরি গিয়ে নিয়েছি টিকা। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার দিন লাইন পড়েছে লম্বা। আমরা গিয়েছিলাম বেশ দেরিতে। শখানেক মানুষ বিশাল পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে। ভলান্টিয়াররা সাহায্য করছেন। লাইন খুব সুন্দর এগোচ্ছে।
এর মধ্যে নামল বৃষ্টি। ছাতা নেই সঙ্গে। লাইন ছেড়েও যাচ্ছে না কেউ। সবাই মিলেই ভিজছি। এখানে কি আমার থাকার কথা?
এই লাইনটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধরতে পারতাম না, কিংবা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে? ‘ভাই, জায়গা রাইখেন’ বলে দৌড় দিয়ে ছাউনির খোঁজে যেতাম। ছত্রভঙ্গ লাইন দেখে ‘দেশের কী অবস্থা’ ধরনের ঝাল ঝাড়তাম। পাশ থেকে কেউ বৃষ্টির গান ধরত, গলা মেলাতাম সবাই। সারা দিন পার করে টিকা নিয়ে চটপটি আর চা খেয়ে বাড়ি ফিরতাম।
এমন হতে পারত না?
লেখক: কানাডাপ্রবাসী সাংবাদিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার প্রমাণ করলেন, তাঁর রাজনীতি স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না, অর্থাৎ মুখে যা বলেন, করেন তার বিপরীত। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, ‘বিদেশি যুদ্ধে জড়াব না’, ‘মাগা মানেই যুদ্ধবিরোধী অবস্থান’— এত দিনের এসব গালভরা প্রতিশ্রুতি আর শান্তির স্লোগান এক মুহূর্তে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন তিনি।
৫ ঘণ্টা আগে
বহুল চর্চিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার ও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তারা কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল। এসব পরিবর্তনের কিছু প্রশংসিত হয়েছে, কিছু হয়েছে সমালোচিত।
৫ ঘণ্টা আগে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের জন্য কোনো হল নেই, যদিও ছাত্রীদের জন্য একটি হল রয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেসে থেকে পড়াশোনা করতে হয়।
৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে। এটি কোনো একক খাত বা সাময়িক ধাক্কার ফল নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতি যেন একযোগে বহু দিক থেকে চাপে পড়েছে।
৫ ঘণ্টা আগে