
যন্ত্র মানুষেরই বর্ধিত অংশ—বাক্যটি বর্তমান দুনিয়ায় এসে আক্ষরিক রূপ নিয়েছে। যন্ত্র আবিষ্কারের দার্শনিক ভিত্তি ছিল মানুষের কল্যাণ। কিন্তু, এখন আর তা নেই, যন্ত্র বহু আগেই মারণান্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু করেছে। একই পথ ধরেছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশও। এআই কেবল আর মানুষের ভালো কাজের সহায়ক নয়, যুদ্ধাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেরও হাতিয়ার।
যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর কেবল কামান-ট্যাংক, রকেট-ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে এআইয়ের বিশাল পরীক্ষাগার। আধুনিক সমরকৌশলে অ্যালগরিদম জয়-পরাজয়, লাশের মিছিলের গতিপথ নির্ধারণ করছে। ইসরায়েল, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যুদ্ধ বা হামলার জন্য এখন আর কেবল বারুদ বা ইস্পাতের তৈরি অস্ত্রে নির্ভর করছে না। তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে সাজিয়ে তুলছে ডেটা, অ্যালগরিদমের স্বয়ংক্রিয় ঘাতক দিয়ে।
শক্তিশালী দেশগুলো যেভাবে কম্পিউটার ভিশন, প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকস এবং অটোনোমাস ওয়েপন নিয়ে কাজ করছে, তা দেখলে চমকে উঠতে হয়। ইসরায়েল তাদের ‘রেড উলফ’ সিস্টেম দিয়ে ফিলিস্তিনিদের মুখাবয়ব শনাক্ত করে। বিভিন্ন চেকপয়েন্টে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে চিনে নেয় এবং ডেটাবেইসের সঙ্গে মেলায়। তারপর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইসরায়েল গাজায় ‘ল্যাভেন্ডার’ নামে এক অদ্ভুত ভয়ংকর সিস্টেম ব্যবহার করছে। এটি এমন এক এআই, যা সাধারণ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে তথাকথিত ‘সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ’দের তালিকা তৈরি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, গাজায় ইসরায়েলের ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধে’র শুরুর দিকে এই অ্যালগরিদম প্রায় ৩৭ হাজার ফিলিস্তিনিকে ‘সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
শুধু তা-ই নয়, গাজায় ‘গসপেল’ নামে আরেকটি সিস্টেম ব্যবহার করছে ইসরায়েল, যা অতি দ্রুত ভবনের পর ভবন ধ্বংসের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে দেয়। ফলে মানুষের যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কমে এসে বেড়েছে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি। এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে গাজায়। অঞ্চলটির অধিকাংশ আবাসিক ভবন ইসরায়েলি হামলায় স্রেফ নাই হয়ে গেছে।
‘হোয়্যার ইজ ড্যাডি’ নামে আরেক মারণ-এআই ব্যবহার করেছে ইসরায়েল। এটি আরও ভয়ংকর। এটি লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিকে তখন ট্র্যাকিং করে, যখন সে তার পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকে। ফলে হামলায় সেই ব্যক্তির সঙ্গে স্ত্রী-সন্তানেরাও প্রাণ হারান। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের মধ্যে নারী-শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়াই প্রমাণ করে যে এ ধরনের প্রযুক্তি কতটা প্রাণঘাতী।
এর বাইরেও ‘অটোনোমাস ওয়েপন’ হিসেবে ইসরায়েল গাজায় ব্যবহার করেছে ‘হারপি’ ড্রোন। দীর্ঘক্ষণ আকাশে উড়তে সক্ষম এই ড্রোন যখন কোনো রাডার সিগন্যাল পায়, তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখানে হামলে পড়তে পারে। মানুষের অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে পিছিয়ে নেই রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউক্রেনও। রাশিয়ার রণকৌশল এখন আর শুধু কেবল অস্ত্র আর সেনাসংখ্যায় আটকে নেই, বরং প্রতিটি সেন্সর আর সিগন্যালের ভেতর এক অশরীরী বুদ্ধিমত্তার ছায়া দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়া বর্তমানে ‘গ্লাজ/গ্রোজা’ নামে সফটওয়্যার কমপ্লেক্স ব্যবহার করছে। এটি ড্রোনের সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজকে মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত লক্ষ্যে পরিণত করতে পারে। আগে যে কাজে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত, এখন এআইয়ের বদৌলতে কয়েক মিনিটেই সেরে ফেলা যাচ্ছে।
রাশিয়ার আলোচিত এআই-চালিত অস্ত্রগুলোর একটি ল্যানসেট-৩ কামিকাজে বা অ্যাটাক ড্রোন। এটি এখন এমনভাবে তৈরি, যা ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের ভেতরেও নিজে নিজে লক্ষ্যবস্তু চিনে নিতে পারে। অর্থাৎ, মানুষ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেও, ড্রোনটির এআই চিপ ঠিকই বলে দেয় কোথায় গিয়ে হামলে পড়তে হবে।
রুশরা ‘লিয়ার-৩’-এর মতো ড্রোন সিস্টেমেও এআই যুক্ত করেছে, যা ইউক্রেনীয় বাহিনীর রেডিও সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে তাদের গতিবিধি আগেভাগেই বলে দেয়। এমনকি ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউক্রেনের সেনাপতিদের ভুয়া নির্দেশ পাঠিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও তারা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের এআই ব্যবহারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেখানে মূলত ‘টার্গেটিং’ এবং ‘লজিস্টিক’ সহায়তায় এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। প্যালান্টির ইউক্রেনকে ‘মেটা-কনস্টেলেশন’ সফটওয়্যার সরবরাহ করেছে। এটি কয়েক ডজন স্যাটেলাইট থেকে আসা ছবি, ড্রোন ফুটেজ এবং শত্রুপক্ষের রেডিও সিগন্যালকে এক জায়গায় এনে ম্যাপের ওপর দেখিয়ে দেয় রুশ সেনারা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনীয়দের নিজস্ব উদ্ভাবনের স্কাইপার্ক এমন এক অ্যালগরিদম, যা ড্রোনের ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি বিশ্লেষণ করে ট্যাংকের মডেল পর্যন্ত বলে দিতে পারে। ফলে গোলন্দাজ বাহিনী বুঝতে পারে কোন অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে।
পিছিয়ে নেই চীন-যুক্তরাষ্ট্রও। দুই দেশই ‘সোয়ার্ম টেকনোলজি’ ব্যবহারের চেষ্টা করছে যুদ্ধক্ষেত্রে। সোয়ার্ম বা ‘ঝাঁক’ প্রযুক্তি হলো প্রকৃতির কাছ থেকে ধার করা এক অমোঘ সমরকৌশল। আকাশে শত শত পাখির সুশৃঙ্খল উড্ডয়ন কিংবা সমুদ্রের নিচে একঝাঁক মাছের একসঙ্গে দিক পরিবর্তনের নীতিটিই যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন বা অন্যান্য অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে বলা হয় সোয়ার্ম টেকনোলজি।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘প্রজেক্ট মেভেন’ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এআই প্রকল্প। এটি হাজার হাজার ঘণ্টার ড্রোন ফুটেজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্ক্যান করে শত্রু-মিত্রের পার্থক্য বের করে দেয় চোখের পলকে। প্যালান্টিরের এআইপি বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মার্কিন সেনারা যুদ্ধের ময়দানে কয়েক হাজার বিকল্প রণকৌশলের মধ্যে কোনটি সেরা, তা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে নিতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেপ্লিকেটর’ প্রোগ্রামের লক্ষ্য হাজার হাজার সস্তা ও স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করা, যা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করবে।
অপরদিকে, বেইজিংয়ের ল্যাবরেটরিগুলো এখন আর শুধু সস্তা ইলেকট্রনিকস তৈরি করে না, সেখানে জন্ম নিচ্ছে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞা। চীনের বিশ্বাস, এআই খাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী দেশই আগামী পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক। তারা একে বলছে ‘ইন্টেলিজেন্টাইজেশন’ বা যুদ্ধকে পুরোপুরি বুদ্ধিমান যন্ত্রের হাতে সঁপে দেওয়া।
চীন এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যেখানে কয়েক শ বা হাজারখানেক ড্রোন একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করবে। একে বলা হচ্ছে ‘সোয়ার্ম ইন্টেলিজেন্স’—যার কথা আমরা আগেই বলেছি। চীন এরই মধ্যে এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। এই প্রযুক্তির ড্রোনগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলে। যদি একটি ড্রোন ধ্বংস হয়, তবে বাকিগুলো মুহূর্তেই নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন রণকৌশল সাজায়। কোনো মানুষের পক্ষেই এই হাজার হাজার ড্রোনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এআই-ই এখানে সেনাপতি!
শুধু আকাশ নয়, চীন সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচেও পাঠাচ্ছে এআই-চালিত সাবমেরিন। চীন মনুষ্যবিহীন এমন সব ডুবোজাহাজ তৈরি করেছে, যেগুলো মাসের পর মাস সাগরের নিচে ওত পেতে থাকতে পারে। যখনই কোনো শত্রুপক্ষের জাহাজ বা সাবমেরিন এর সেন্সরে ধরা পড়ে, এআইয়ের মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করে নিজে নিজেই আক্রমণ চালাতে পারে।
চীনের কাছে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বায়োমেট্রিক ডেটাবেইস। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে শত্রু সেনাদের শুধু শনাক্তই করে না, বরং তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা-ও আগেভাগে বলে দিতে পারে। চীন স্কাইনেট নামে একটি নজরদারি এআই সিস্টেম তৈরি করেছে। এটি তাদের দেশের ভেতর নজরদারির জন্য তৈরি হলেও এর সামরিক সংস্করণ এখন যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে নিমিষেই বলে দিতে পারে শত্রুর লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন কোথায় দুর্বল।
আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় যুদ্ধের একটি নীতি হলো ‘ডিসটিংশন’ বা পার্থক্যকরণ। অর্থাৎ, কে যোদ্ধা আর কে না—তা স্পষ্ট হতে হবে। এআই এই সীমা অস্পষ্ট করে দিয়েছে। কারণ, এআই যখন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে, তখন সে কেবল ডেটা দেখে, মানবিক আবেগ দেখে না। এআই সিস্টেমগুলো মানুষের দেওয়া পুরোনো ডেটার ভিত্তিতে কাজ করে। ইনপুট ডেটাতে কোনো নির্দিষ্ট জাতি/গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ থাকলে অ্যালগরিদম সেই গোষ্ঠীকেই শত্রু হিসেবে বেশি শনাক্ত করবে। এআই/অ্যালগরিদমের এই মারণ-রাজনীতি বা নেক্রোপলিটিকসের শেষ হওয়া উচিত। তবে সেটি তখনই শেষ হবে যখন যুদ্ধ হবে কি হবে না—সেই সিদ্ধান্ত এআই/অ্যালগরিদম নয়, মানুষ নেবে।

বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এটি কয়েকটি বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং, গবেষণা সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনিক সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন।
৪ ঘণ্টা আগে
ফাহমিদুল হক চলচ্চিত্র সমালোচক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও গল্পকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার। একসময় যুগ্মভাবে ‘যোগাযোগ’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
৭ ঘণ্টা আগে
প্রতিটি মানুষেরই মূলত দুটি সত্তা থাকে—আত্মা ও দেহ। একটি অন্যটিকে ছাড়া কিছুতেই টিকতে পারে না। আত্মা ছাড়া দেহ হলো অচল। দেহের জন্য আমরা খাই। কিন্তু আত্মার খোরাক কী? মানসিক প্রশান্তি। দেহকে দেখা যায়, আত্মাকে কেউ দেখতে পারে না। কিন্তু প্রতিক্ষণে তার অনুভব অনিবার্য।
৭ ঘণ্টা আগে
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে নতুন কিছু কথা বলার আছে। জার্মানি, ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিলের মতো বাঘা বাঘা দল কোয়ার্টার ফাইনালেই উঠতে পারল না। আর্জেন্টিনাকেও একই পর্বে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল মিসর।
৭ ঘণ্টা আগে