
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে যাচ্ছি, অন্যদিকে সেই সাফল্যের পেছনে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে অধিক ফলনের আশায় জমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির স্বাভাবিক শক্তিকে ক্ষয় করেছে। এই বাস্তবতায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে জৈব সার, বিশেষ করে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। শুধু একটি বিকল্প সার হিসেবেই নয়, বরং টেকসই কৃষির ভিত্তি হিসেবে জৈব সারের প্রয়োজনীয়তা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
কেঁচো সার কারখানার মূল কর্মী কেঁচো। প্রকৃতির লাঙলখ্যাত মানুষের উপকারী ক্ষুদ্র এ প্রাণীটি মূলত জৈব পদার্থ খাওয়ার পর যে মল ত্যাগ করে, সেটিই কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট। কেঁচো সারে অন্যান্য জৈব সারের তুলনায় প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ পুষ্টিমান বেশি থাকে। একটি আদর্শ ভার্মি কম্পোস্টে শতকরা ১.৫৭ ভাগ নাইট্রোজেন, ১.২৬ ভাগ ফসফরাস, ২.৬০ ভাগ পটাশ, ০.৭৪ ভাগ সালফার, ০.৬৬ ভাগ ম্যাগনেশিয়াম, ০.০৬ ভাগ বোরন, ১৮ ভাগ জৈব কার্বন, ১৫ থেকে ২৫ ভাগ পানি ও সামান্য পরিমাণ হরমোন থাকে। কেঁচো সার মাটির পানি ধারণ করার ক্ষমতা এবং বায়ু চলাচল বৃদ্ধি করে। ফলে মাটির উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যেখানে আদর্শভাবে মাটিতে কমপক্ষে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকা প্রয়োজন, সেখানে অনেক এলাকায় তা নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে। এর পেছনে রয়েছে নিবিড় চাষাবাদ, একই জমিতে বারবার উচ্চফলনশীল জাতের ফসল চাষ এবং মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার। ফলাফল হিসেবে মাটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে, পানি ধরে রাখতে পারছে না এবং সামান্য জলবায়ু বৈরীতেই ফলন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গত এক দশকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিজ্ঞতা জৈব সারের পক্ষে কথা বলছে। অনেক কৃষক দেখেছেন, নিয়মিত কেঁচো সার ব্যবহারে জমির গঠন নরম হয়, সেচের পানি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারে এবং ফসলে তুলনামূলকভাবে রোগবালাই কমে যায়। সবজি, ফল ও ধান সব ক্ষেত্রেই ফলন বাড়ার পাশাপাশি স্বাদ ও সংরক্ষণক্ষমতা উন্নত হচ্ছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো অর্থনীতি। রাসায়নিক সারের দাম ক্রমেই বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রেই তা আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে জৈব সার স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যায়। গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য সবকিছুই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে কৃষক নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত সার বিক্রি করে বাড়তি আয়ের পথও তৈরি করতে পারছেন।
জৈব সার ব্যবহারের ফলে দীর্ঘ মেয়াদে জমির উৎপাদনক্ষমতা স্থিতিশীল থাকে। রাসায়নিক সারের মতো বারবার মাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। এতে উৎপাদন খরচ কমে, ঝুঁকি কমে এবং কৃষকের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। এ কারণেই জৈব সারের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা ও লবণাক্ততার বিস্তার কৃষিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন কৃষিব্যবস্থা, যা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারে।
জৈব সার ব্যবহারে মাটি জলবায়ু সহনশীল হয়ে ওঠে। জৈব পদার্থ মাটিতে কার্বন ধরে রাখে, যা একদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে, অন্যদিকে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। খরার সময় এ ধরনের জমি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার অতিবৃষ্টির সময়ও পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হয়, ফলে ফসলের ক্ষতি কমে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
একসময় কেঁচো সার তৈরি ছিল ঘরের আঙিনায় সীমিত একটি উদ্যোগ। নারীরা রিং বসিয়ে বা ছোট গর্তে কেঁচো সার তৈরি করতেন, নিজের জমিতে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যোগ বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
দেশ এখন কৃষিবৈচিত্র্যে বেশ সমৃদ্ধ। মাঠভর্তি নানান ফল-ফসল। শীতের সবজি, আখ, পানের বরজ, পেয়ারা বা কুলের বাগান, আবার মাঠের কোথাও হলুদে হলুদে সয়লাব গাঁদা ফুলে। অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে চাষ হচ্ছে ধান। সবজি, ফুল, ফল—বাড়ির আঙিনা থেকে নেমে এসেছে কৃষির মাঠে। সব ফল-ফসলই চাষ হচ্ছে এখানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। কৃষক ভিন্ন ভিন্ন জাতের ফল-ফসল চাষের মধ্য দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন নিজস্ব অর্থনীতি। কখন কোন ফসল চাষ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি নিতে শিখেছেন বুঝে-শুনে।
কৃষক জানেন মাটিই তাঁর জীবিকার উৎস। মাটি থেকেই উৎপাদিত হয় সোনার ফসল। তাই সচেতন হচ্ছেন মাটির যত্নে। রাসায়নিক সার প্রয়োগ কমিয়ে জৈব সার ব্যবহারেও বেশ উদ্যোগী হয়ে উঠছেন তাঁরা। কেঁচো সারের বাণিজ্যিক উৎপাদন ইতিমধ্যে সারা দেশে সাড়া জাগিয়েছে। কেঁচো সারের বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিষয়টি এক যুগ আগেও সাধারণ কৃষক তথা গ্রামীণ জনসাধারণের কাছে ছিল অনেকটাই অজানা।
মনে পড়ছে, সেই আশির দশকে ‘মাটি ও মানুষ’ করার সময় থেকে জৈব সারের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কৃষককে অবিরত বলে এসেছি এবং পরে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রথম থেকেই এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণা চালিয়ে এসেছি। আমি চেষ্টা করেছি উৎপাদনমাত্রা ঠিক রেখেই কৃষককে জৈব কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে। ‘গ্রো-গ্রিন’ নামের একটি কার্যক্রম আমরা হাতে নিয়েছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। যাঁরা জৈব কৃষির চর্চা করেন, তাঁদের সাফল্য আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি অন্যদের কাছে। ঘরে ঘরে শুরু হয়েছিল কেঁচো সার তৈরি। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, মানিকগঞ্জের শিবালয়, নরসিংদীর বেলাব, রায়পুরাসহ বিভিন্ন উপজেলায় গ্রামীণ নারীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে কেঁচো সার উৎপাদন কার্যক্রম, সেই সব চিত্রও আমি তুলে ধরে কৃষকদের অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছি।
আর এখন সারা দেশেই কম-বেশি উৎপাদন হচ্ছে কেঁচো সার। গ্রামে গ্রামে নারীরা এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা বিষমুক্ত ফসল ফলাচ্ছেন। এতে মিটছে তাঁদের পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা। আর অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে আসছে বাড়তি আয়। যে কারণে কোনো কোনো গ্রামের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই কেঁচো সার। ঝিনাইদহের মহেশ্বরচাঁদা গ্রামের কথা বলা যেতে পারে। মহেশ্বরচাঁদা গ্রাম থেকে জৈব সার যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে সেখানকার নারীদের উৎপাদিত জৈব সার। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের প্রায় প্রত্যেক নারীই জৈব সার উৎপাদনে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, গোয়ালঘর বা পরিত্যক্ত জায়গা—সব জায়গায় মাটির চাড়ি বসিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে কেঁচো সার। এতে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান, একই সঙ্গে গ্রামবাসী ফিরে পাচ্ছে জমির উর্বরতা, মিলছে বিশুদ্ধ ফসল আর কমছে উৎপাদন খরচ।
এখন সব জেলাতেই কমবেশি জৈব সার উৎপাদন চলছে। বেড়েছে জৈব সারের ব্যবহারও। সারা পৃথিবীতেই অরগানিক কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। অরগানিক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের জার্মানি ও ফ্রান্সে। আমি যতদূর জানি, বর্তমানে সার্টিফায়েড অরগানিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১৬৪টি দেশে। ফলে অরগানিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখন আমাদের উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশের কথাও ভাবতে হবে। ভাবতে হবে মাটির কথাও।
আমার প্রায়ই মনে পড়ে রামনিবাস আগরওয়ালের একটি কথা। ২০১০ সালে নীলফামারীর অন্নপূর্ণা জৈব সার কারখানার স্বত্বাধিকারী রামনিবাস আগরওয়াল এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন, ‘মাটি হচ্ছে মা। মাটি বলছে, তুমি আমাকে ১০ কেজি বীজ দিলা, ১ মণ সার দিলা, তোমাকে বিনিময়ে কী দিলাম! ৫০ মণ ধান দিলাম, ৫০ মণ নাড়া দিলাম। তুমি কি কখনো চিন্তা করে দেখেছ এটা কোথা থেকে এল? আমার শরীরের গচ্ছিত সম্পদ থেকে তোমাকে দিয়েছি। তুমি এক কাজ করো, ধানটা তুমি নাও, নাড়াটা আমাকে দাও। তুমি তো আমার সন্তান, তোমাকে বাঁচানো আমার কর্তব্য। চিন্তা করছি আমি মরে গেলে তোমার কী হবে! কাজেই তুমি তোমার স্বার্থে আমাকে বাঁচিয়ে রাখো।’—কথাটা আমার মনে গেঁথে আছে।
শুধু দেশেই নয়, জৈব কৃষি চর্চায় কেঁচো সারের ব্যবহার দেখেছি নেদারল্যান্ডসের আইকলকাম্পেও। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষকের আঙিনার রিং থেকে কেঁচো সার উৎপাদন ধীরে ধীরে চলে আসছে কারখানার আকারে। এটা সত্যি আশাজাগানিয়া। মাটিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ালে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা বাড়বে। বাড়বে ফসলের উৎপাদন। জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই কৃষির জন্য জৈব কৃষি চর্চার বিকল্প নেই। তাই এ ক্ষেত্রে সবাইকেই সচেতন হতে হবে।
লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি—বাংলাদেশের জনজীবনে এই দুটি শব্দ বহু বছর ধরেই একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার আসে, সরকার যায়; মন্ত্রিসভা বদলায়, নীতির ভাষা বদলায়; কিন্তু মহাসড়কের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায় না। বরং অনেক সময় পরিস্থিতি আরও জটিল ও দুঃসহ হয়ে ওঠে।
২ ঘণ্টা আগে
আমাদের দেশে রোগীর সংখ্যার বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা যে অপ্রতুল, তা কোনো গবেষণা না করলেও বোঝা যায়। কীভাবে? খুব সহজ। শুধু হাসপাতালগুলোর ‘ওয়েটিং জোন’ অর্থাৎ যেখানে রোগীরা সেবা পেতে অপেক্ষা করেন, সেখানকার চিত্র দেখলেই হয়।
২ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই বিজয়ী দলের নেতা ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বহু বছর এ দেশের বিজয়ী ও পরাজিত দলগুলোর নেতাদের বলতে গেলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকার পর...
১ দিন আগে
জাপানের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের সম্পর্ক শতবর্ষাধিক। ১৮৭৮ সালে জাপানের মিকাদো তথা মেইজি সম্রাট মুৎসুহিতো এবং কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সংগীতজ্ঞ, সংগীতের ইতিহাসবিদ রাজা শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মধ্যে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বিনিময়ের ঘটনাই জাপান-বাংলার...
১ দিন আগে