Ajker Patrika

সংসদ সদস্যদের কাজটা কী

সংসদ সদস্যদের কাজটা কী

সংসদ নিয়ে চর্চা-আলোচনা করা রাজনীতির ব্যাপার। আমি নারী বলে তাই লেখাটির শিরোনাম দেখে কেউ কেউ আবার তেড়ে আসতে পারেন এই ভেবে যে—কঠিন একটা বিষয় নিয়ে কেন লিখছি। অনেকের ধারণা, রাজনীতির মতো জটিল বিষয় নিয়ে নারীদের মাথা ঘামানো ঠিক না, তারা এটা বোঝে না। যেমনটা বোঝে না ইউটিলিটি বিলের জট পাকানো অঙ্ক কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু আসলেই কি তাই?

না, তা নয়। চোখের সামনে ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। কোন পেশায় নারীদের অবদান নেই, বলুন তো? আপনি পুরুষ হয়ে আপনার ঘরের নারীকে যখন ‘ব্যাংক’ সম্পর্কিত কিছু বোঝে না বলে কটাক্ষ করেন, সেই আপনিই কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে একজন নারী কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে পারেন। কিংবা বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল দিতে গিয়েও একই ঘটনা ঘটতে পারে আপনার সঙ্গে। নারী কোনো বিষয়ে বোঝে নাকি বোঝে না, ব্যাপার আসলে সেটা নয়। নারীরা সুযোগ পায় না—এটাই হচ্ছে মূল কথা।

পুরো পৃথিবীটাই যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে পরিচালিত হয়, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সেখানে যেসব নারী একটু সুযোগ পান নিজের বুদ্ধিমত্তাকে মেলে ধরার, তারা নিশ্চয়ই সফল হন। আপনার ঘরের নারীটি শুধু সুযোগের অভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, নিজের মেধাকে বিকশিত করতে পারে না।

এত কথা অবতারণা করার কারণে ফিরে যাওয়া যাক। সদ্যই হাঁটা শুরু করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। এখানে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন সাতজন। সংরক্ষিত আসনে আরও ৫০ জন আসবেন সামনে। সংসদের মোট আসনের প্রায় ১৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করবেন তাঁরা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পরিচালনায় নারীরা এটুকু সুযোগ পেয়েছেন! নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থিতা দেওয়া নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়ে গেছে, এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

যাই হোক, যাঁরা এই সংসদের নারী সদস্য, তাঁরা নিশ্চয়ই সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁরা নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের কটাক্ষ করে কেউ কোনো মন্তব্য করলে সেটা কি পুরো নারী জাতিকেই কটাক্ষ করা হয় না? যেমনটা করেছেন আরেক পুরুষ সংসদ সদস্য। সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে এক সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা সংসদে পাশে বসা নারী সদস্যদের নিয়ে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে তাঁকে উপহাস করে বলতে দেখা গেছে, ‘আমার ডানে-বামে এমন ভুঁড়িওয়ালা লোক পেয়েছি, যেহেতু এগুলো সিরিয়াল করা থাকে আগে থেকে, কে কোথায় বসবে আমরা জানিও না। আল্লাহর ইশারা ভেতরে গিয়ে দেখি, আমার ডানে-বামে ভুঁড়িওয়ালা। এমন বড় বড় ভুঁড়ি, আমার মনে হয় ভুঁড়ি ছিঁড়লে ভেতর থেকে ব্রিজ-কালভার্ট বের হবে। মহিলারা ওদের দেখলে লজ্জা পাবে। রুমিন ফারহানা আপা আছে, মন্ত্রী পটলের মেয়ে আছে, ফারজানা শারমীন।...ম্যাডামরা যদি এদের পেটের দিকে তাকায়, ভাববে ছেলেমেয়ে হয় আমাদের আর পেট হয় হুজুরের পাশে দুইজনের।’

তিনি আগেও নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন। আর এবার তো শুধু নারীদেরই নয়, তাঁর আশপাশে বসা পুরুষ সংসদ সদস্যদেরও ব্যঙ্গ করলেন। নারী বা পুরুষ, যে কাউকেই তো বডি শেমিং করা আপত্তিকর কাজ। আর তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে কী করে এমন একটি কাজ করতে পারেন, এই প্রশ্নটাও গুরুতর।

এ ব্যাপারে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে উপস্থিত হয়েই তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্পিকারের কাছে বিচার চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিচ্ছে, প্রতিবাদ করছে।

প্রশ্ন হলো, রুমিন ফারহানাকে কেন সংসদে স্পিকারের কাছে এই আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য বিচার চাইতে হলো? কতটা অপমানিত বোধ করলে একজন নারী সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক সভায় বিচার চাইতে পারেন? তিনি নিজেই কি কখনো ভেবেছিলেন যে সংসদ তাঁকে মর্যাদার আসন দিয়েছে, সেই সংসদেরই আরেক সদস্য তাঁকে বা তাঁদের নিয়ে অরুচিকর মন্তব্য করবেন? আর এভাবে তাঁকে বিচার চাইতে হবে?

যিনি ইসলামিক বক্তা, তিনি কি জানেন না ইসলাম ধর্মে নারীদের কতটুকু মর্যাদা দেওয়া হয়েছে? নাকি তিনি ভেবে নিয়েছেন, এভাবেই নারীদের ‘সম্মান’ দিতে হয়? তাঁকে তাঁর দল বা দলের বাইরে সবাই সতর্ক করলেও তিনি বারবার একই ‘ভুল’ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময় নানা জনকে নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যগুলো বিব্রত করছে সবাইকে। তবু তিনি বেছে বেছে কথা বলতে পারছেন না। অন্যরা তাঁকে নিয়ে শঙ্কায় থাকতে পারেন যে, তিনি হয়তো কোনো দিন সংসদেও এমন কোনো মন্তব্য করে বসবেন, যা তাঁর রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। আপাতত নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা তিনি কীভাবে সুন্দর করে সামনে এগিয়ে নেবেন, সেটা একান্তই তাঁর মাথাব্যথা—জনগণের নয়।

কে কেমন দেখতে, এটা গবেষণা করতে নিশ্চয়ই সংসদে এর সদস্যরা যান না। তাঁরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতেই যান। যাঁরা কোনো দিনও সংসদে পা মাড়াননি, তাঁরাও এ কথা বোঝেন। এটুকু সহজ রাজনীতি বুঝতে নারী বা পুরুষ হতে হয় না, মানুষ হলেই যথেষ্ট।

লেখক: সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

ভূপাতিত বিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি

ইরানে হামলায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ২০০০টি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে আনছে যুক্তরাষ্ট্র, একটার দাম ১৫ লাখ ডলার

নতুন অফিস সূচির প্রজ্ঞাপন জারি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত