Ajker Patrika

কোথাও কোনো নিয়ম নেই...

জাহীদ রেজা নূর
কোথাও কোনো নিয়ম নেই...

শিষ্টাচার, সদাচরণ, পরমতসহিষ্ণুতা—এই ধরনের কিছু শব্দ ছিল বাংলা ভাষায়। কিন্তু বর্তমানে তা কি আর্কাইভাল ভ্যালু পেয়ে গেল? ব্যবহার না হতে হতে তারা অভিধানে স্থান করে নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে কি? নট নড়ন-চড়ন। ফলে নতুন যুগের নতুন শব্দমালার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে কপালে বিপদ এসে ভিড় করতে পারে। আর নতুন শব্দমালার কথা বললে তো চমকে উঠতে হয়। বহু আগে থেকেই ‘খ’ আর ‘চ’ দিয়ে গড়া গালাগালগুলো বুকে এসে আঘাত করত। কবে সেগুলোর জন্ম হয়েছে, তা খুঁজে বের করা কঠিন। এখন ‘শ’ আর ‘ম’ দিয়ে গালির নতুন প্রজন্ম হামাগুড়ি ছেড়ে হাঁটতে শুরু করেছে। আগে এরা বসবাস করত কোনো অঞ্চলের নিভৃত পল্লির নিভৃত জায়গায়। এখন তারা বেরিয়ে পড়েছে রাজপথে। এই গালাগাল নিয়ে পত্রপত্রিকা প্রায় নীরব থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তা এখন সবার নখদর্পণে। পড়াশোনা কিংবা রাজনীতির মাঠে এই গালিগুলো কতটা ওজন নিয়ে উপস্থিত থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নামক এক সোনার পাথরবাটির কথা কখনো কখনো শোনা যায় বটে, কিন্তু সাংবাদিকেরা কেন কোনো সংবাদ হঠাৎ করে গিলে ফেলে, কোনো সংবাদের অতিরিক্ত মূল্য দেয়, সে কথা বলতে গিয়ে কেউ বিড়ম্বনায় পড়তে চায় না। শুধু কি তাই? সুশীলেরা কোন পক্ষ নিচ্ছে, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হয়। কোনো নারী যদি সেলিব্রেটি হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সুশীলদের এক অবস্থান, কোনো নারী যদি সেলিব্রিটি না হন, তাহলে সুশীলদের অবস্থান আর এক। ‘দোসর’ আর ‘যোদ্ধা’ নিয়ে যে নাটকীয় ঘটনায় পূর্ণ হয়ে আছে দেশ, তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো কি দিশা পাওয়া যাচ্ছে? উত্তর কে দেবে?

২. দেশ কেমন আছে, সে প্রশ্নেরও সহজ উত্তর নেই। সত্যিই দেশ কোনো পরিকল্পনামাফিক চলছে কি না, তা জানার জন্য কয়েকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। রুমিন ফারহানা সংসদে মাঝে মাঝে একাই এমন সব প্রশ্ন করছেন, যেগুলোর উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চের। উত্তর দেওয়ার অধিকার জন্মায় সমস্যার সমাধানের পথ আবিষ্কার করতে পারলে। কিন্তু বিদ্যুৎ, গ্যাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—কোথাও কি কোনো সুসংবাদ আছে?

দেশে রাজনৈতিক বিভাজন এতটা প্রকট হয়ে উঠেছে যে, একপক্ষের কেউ মার খেলে অন্য পক্ষের ‘গুষ্টি’ ধরে টান দেওয়া হচ্ছে। একজন অপরাধ করলে তার পরিবারের সদস্যদের নিগৃহীত হতে হয়। এটা রাজনৈতিক সদাচারের বরখেলাপ। কেউ অন্যায় করলে বিচার হবে তার, কেন তার মা-বাবাকে, ভাইবোনকে, স্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে?

এই জায়গায় এসে আমরা নৈতিকভাবে ফেঁসে গেছি। এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই, যে দলটি প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়। দলগুলোর সম্মুখসারির নেতারা যদি শান্তির ললিতবাণী শোনান, তাহলে তা তৃণমূলের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। সবাই প্রতিশোধ-প্রতিশোধ খেলায় নেমেছে। কার কাছে কিছু প্রত্যাশা করবে জনগণ?

চাইলে পুরো লেখাটা এই প্রতিশোধ খেলার উদাহরণে ভরে দেওয়া যেত। কিন্তু তার প্রয়োজন হবে না। দেশের প্রায় প্রতিটি সচেতন মানুষের হাতেই রয়েছে মোবাইল টেলিফোন। কে কাকে কোথায় মারছে, সে কথা অজানা থাকে না।

৩. আশার কথা কি একটুও বলা যাবে না? অবশ্যই যাবে। তবে তা ভালোয়-মন্দয় মেশানো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুরুত্ব না দিলে চলবে না। খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এই মাধ্যম। কেউ যদি সেই মাধ্যমে কোনো পোস্ট দেয়, তবে তার মন্তব্যের ঘরে কী ধরনের মন্তব্য আসে, সেদিকে চোখ রাখলেও জনগণের মতিগতি বোঝা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক আলাপ। সংস্কৃতি, ক্রীড়ার চেয়েও আলোচনায় এগিয়ে আছে রাজনীতি। সবাই কথা বলছে। কথাগুলো এতটাই বৈপরীত্যে ঠাসা যে কোনটা ঠিক, কোনটা নয়, সেটা বোঝাও কঠিন। মুক্তিযুদ্ধকে কলুষিত করে যে পোস্ট দেওয়া হয়, সেগুলোর মন্তব্যের ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়, দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করা পোস্টগুলোকে ছাড় দিতে একেবারেই নারাজ। কে মুক্তিযুদ্ধের মূল নায়ক, কারা পার্শ্বনায়ক, কারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী—এই প্রসঙ্গগুলো জনগণের অজানা নয়। কিছু সময়ের জন্য মিথ্যা বয়ান তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায় বটে, কিন্তু প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবেই। আসতে বাধ্য।

ইউনূস যুগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বহু চেষ্টা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে যারা নানাভাবে ছোট করছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। বরং জাতির মধ্যে বিভেদ আনার একটা প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা ছিল বলে অনেকেই মনে করে থাকে। সেই মনে করাটার মধ্যে সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

আশার জায়গা এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানেও গালাগাল আছে, এখানেও স্থূলতা আছে, এখানেও প্রতিহিংসা আছে, কিন্তু এখানে সত্যিকার ইতিহাস তুলে ধরার প্রবণতাও রয়েছে। বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস তো আর আজকের নয়, এর শিকড় ইতিহাসের অনেক গভীরে। সেই ছায়া ছায়া গহিনে প্রবেশ করেন নেটিজেনদের অনেকে। এটা আশার জায়গা।

আবার সত্যিকার ইতিহাসকে বিকৃত ইতিহাসে পরিণত করার ক্ষেত্রেও সামাজিকমাধ্যমের জুড়ি নেই। তাই এই পথে চলতে হয় খুব দেখেশুনে। পা হড়কে যাওয়ার আশঙ্কা কিন্তু আছে।

৪. আমাদের দেশের মন্ত্রীরা যখন তাঁর মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, তখন তা খুবই বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। সবকিছুতেই ‘স্বৈরাচার’ আর ‘দোসর’দের দোষ দিলে কি মুক্তি মিলবে? ইউনূসের দেড় বছর আর এই সরকারের প্রথম ছয় মাসে তাহলে কোন কাজটা হয়েছে? এই সরকার ছয় মাসের হিসাব-নিকাশ দিতে গিয়ে এমন সব জায়গায় সাফল্য দেখিয়েছে, যেসব জায়গায় কেবলই গাঢ় অন্ধকার। সরকারের বিদ্যুৎ আর গ্যাসকাণ্ড নিয়ে মানুষ যেসব কৌতুকের জন্ম দিচ্ছে, তা থেকেও কি মন্ত্রীরা কোনো শিক্ষা নেবেন না?

পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে টেনে আনিনি। তবে, এখন একটি ঘটনার কথা বলব। বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার প্রতিবাদ করেছিলেন সিফাত আবদুল্লাহ নামের একটি ছেলে। বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ করে লাফিয়ে গাছের আগায় উঠলে যেকোনো নাগরিকই প্রতিবাদ করতে পারেন। সেখানে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যাঁরা সিফাতের কথাগুলো শুনেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই জানেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন সিফাত। এই অসভ্যতাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।

ইতিমধ্যে অনেকেই কথাটা বলেছে, কিন্তু এ ব্যাপারে সবাইকেই একটি শক্ত অবস্থান নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কি যা খুশি তা বলা যায়? একজন মানুষের পারিবারিক শিক্ষা থাকবে না? কোন ভাষায় কথা বলা যায়, কোন কথা অরুচিকর সে কথা কলেজ-পড়ুয়া একটা ছেলে জানবে না? এ ধরনের ছেলেদের সংখ্যা কত? এ ধরনের গালাগাল দিয়ে ভাষার মানচিত্র বদলে ফেলছে যারা, তারা কি এই জাতির নতুন প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করে? যদি করে থাকে, তাহলে জাতির জন্য সামনে কতটা বিপদ, সেটা কি বুঝতে পারছেন?

কিন্তু পরিহাসের শেষ এখানেই নয়। পুলিশের কাণ্ডকারখানা দেখুন। শুরুতে সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের কারণে গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও পরে পুলিশ দাবি করে, সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের গোপন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন তিনি। খেলা জমে গেল। যদি ছাত্রলীগের কার্যক্রমে যুক্ত থাকে সিফাত, তাহলে এনসিপির নেতা-কর্মীরা এই গালবাজকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়েছিল কেন? কেন এনসিপির একজন নেতা বললেন, গ্রেপ্তার সিফাত আব্দুল্লাহ এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ইনকিলাব মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী?

দুটি ব্যাপারই প্রমাণ করে, কোথাও কোনো নিয়ম নেই। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের যেভাবে হত্যা মামলায় জেলে পোরা হয়েছে, এই সিফাতকেও সেভাবেই মিথ্যে মামলা দিয়ে জেলে পোরা হলো। দুটোই বিষ, কিন্তু বিষে বিষে বিষক্ষয় কি হলো?

৫. পুরো জাতির সামনে এখন ভয়ানক একটা সময় এসেছে। জন সমর্থন আছে, এ রকম সব দলের মধ্যে ঐকমত্যের সৃষ্টি না হলে দেশ এই বিপদ থেকে বের হতে পারবে না। গালাগাল করে, কারও জন্য রাজনীতি কঠিন করে দিয়ে, পরিকল্পনাহীনভাবে দেশ চালালে জনগণ নতুন করে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে থাকবে। সেই ভাবনাটা যেন অপূরণীয় না থাকে, সে জন্যও কাজ করতে হবে সবাই মিলে। প্রতিহিংসা থেকে বেরিয়ে এসে, প্রতিশোধপ্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে মজবুত করার সুযোগ কিন্তু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র সমুন্নত না থাকলে বিপদ কোনদিক দিয়ে আসতে পারে, সে কথা নিশ্চয়ই সরকার ভুলে যায়নি।

নিয়মে নিয়ে আসা দরকার দেশটা। কিন্তু সেটা আসতে হলে কার ওপর আস্থা রাখবে দেশবাসী?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত