Ajker Patrika

আচরণবিধি, ইসির পক্ষপাত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আচরণবিধি ভঙ্গের চেয়েও এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। ইতিমধ্যে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিটি দলই বলছে ইসি একটি দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

অরুণ কর্মকার
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ০৪
আচরণবিধি, ইসির পক্ষপাত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
তারেক রহমান কড়াইল বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে উন্নত আবাসনব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে জনপরিসরে নির্বাচনী আবহ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সরাসরি ভোট চাইতে শুরু করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা, না চলা এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষপাত। এ ছাড়া আরও দুটি বিষয় জনসমক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এক. স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং দুই. আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। ধারণা করা যায়, খুব শিগগির এই ‍দুটি বিষয় নির্বাচনী আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অনেক অভিযোগ ইসির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমনকি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও বিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়কারী এবং প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই অভিযোগ তুলেছেন। তাতে কড়াইল বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে বর্তমান বস্তিবাসীদের উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের যে প্রতিশ্রুতি তারেক রহমান দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেই বিষয়টিকে তিনি আচরণবিধি ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গুরুত্ব ও মাত্রা অনুযায়ী অনেক অভিযোগের বিরুদ্ধে ইসি ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান আছে। যতটা জানা গেছে, সে অনুযায়ী ইসি দেশের ২৭ জেলায় অন্তত ৭৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও জরিমানা করা হয়েছে।

আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্তদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির প্রার্থীরা রয়েছেন। আছেন পাঁচজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। কোনো দল বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যায়। এ ছাড়া আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থিতা বাতিল করারও ক্ষমতা আছে নির্বাচন কমিশনের। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো দণ্ড কোনো অভিযুক্তকেই দেওয়া হয়নি। পুরো নির্বাচনী সময়ই আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়টি থাকবে। এ ব্যাপারে ইসি কত দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কেমন হয় এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিকতা দেখান, তার ওপরই নির্ভর করবে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনেক কিছু।

আচরণবিধি ভঙ্গের চেয়েও এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। ইতিমধ্যে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিটি দলই বলছে ইসি একটি দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। এনসিপি তো গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ কথাও বলে ফেলেছে যে ইসির পক্ষপাতিত্বের কারণে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। ইসি এবং মাঠ প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়াও এনসিপির অভিযোগ—ইসি ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের ছাড় দিয়েছে। ওই দুই কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছিলেন, আপিলে ইসি তাঁদের প্রার্থিতা পুনর্বহাল করেছে। এ ছাড়া সব দল সমান সুযোগ পাচ্ছে না, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই—এসব অভিযোগ তো অনেক আগে থেকেই করে আসা হচ্ছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পূর্বোক্ত সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, একটা সর্বোত্তম নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ দরকার, ইসি ও মাঠ প্রশাসনের যে নিরপেক্ষ আচরণ প্রয়োজন, আমরা সেটা মাঠে দেখছি না। নির্বাচন যদি এভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয় তার দায় সরকারের ওপরই পড়বে।

এনসিপি অবশ্য অনেক আগেই ইসি পুনর্গঠনের দাবি তুলেছিল। তবে নিবন্ধন পাওয়ার পর সেই দাবির প্রসঙ্গ দলটি আর তোলেনি। এখন আবার একই দাবি তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে পারে বলেও বলা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসির ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানকার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই নিবন্ধকারকে বলেন, প্রতিটি দলই যখন অভিযোগ করছে যে ইসি একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে, তখন তার মানে দাঁড়ায় এই যে ইসি সব দলের প্রতিই ঝুঁকে আছে। অথবা কোনো দলের প্রতিই ঝুঁকে পড়েনি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ ইসিকে আরও বেশি সচেতন থাকতে সহায়তা করছে।

এখন পর্যন্ত নির্বাচনসংক্রান্ত যেসব খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে সবচেয়ে অস্বস্তির মধ্যে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এদের মধ্যে যাঁরা অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর বিদ্রোহী প্রার্থী নন, প্রায় সর্বত্রই তাঁদেরকে সন্দেহ করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের ‘গুপ্ত’ প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু অতীতেও এদের অনেকেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার নজির আছে। তবে এই ধারণার একটা ভিত্তি থাকলেও থাকতে পারে যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে না পারায় তাদের ভোটাররা অন্য কোনো দলীয় প্রার্থীর পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রেই যে এমনটি হতে পারে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সর্বোপরি কথা হলো, যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে কোনো বাধা নেই, সেহেতু প্রার্থী হিসেবে তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা যাতে রক্ষা হয়, সে বিষয়টি রাজনৈতিক দল এবং ইসি উভয়কেই দেখতে হবে।

এরপর যাঁরা অস্বস্তিতে আছেন তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের ভোটার। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায়ও আছেন বলে কিছু কিছু খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাঁদের বলা হচ্ছে অবশ্যই ভোট দিতে যেতে এবং তাদের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। বিনিময়ে আওয়ামী লীগের ভোটার হিসেবে তাঁরা যেসব অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হতে পারেন, সেগুলো দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দলগুলো নেবে বলে তাঁদেরকে নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে প্রধান দুটি দল বিএনপি এবং জামায়াতের ভোটের ব্যবধান অনেক কমে আসার তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় অনেক আসনেই আওয়ামী লীগের ভোটের ওপর নির্ভর করছে তাদের জয়ী হওয়া না হওয়ার বিষয়টি। কিন্তু সামাজিকমাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের ভোটারদের প্রতি আগেই একটি নির্দেশনা বা আহ্বান জানানো হয়েছে যে যেহেতু ব্যালটে নৌকা মার্কা থাকবে না, সেহেতু তাঁরা যেন ভোট দিতে না যান। এ ব্যাপারে আরও নির্দেশনা আসবে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। সে যাই হোক, ভোট দিতে যাওয়া না-যাওয়া একজন নাগরিকের সাধারণ অধিকারের মধ্যেই পড়ে। তাই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে তাঁদের এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচন নিয়ে আরেকটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে গণভোটকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে সরকার যখন তাতে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচার শুরু করেছে। সরকারি নির্দেশে রিটার্নিং-সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা, পুলিশ বাহিনী, সাধারণ প্রশাসন সবাইকেই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারে অংশ নিলে তাদের আচরণবিধি ভঙ্গ হবে কি না, হলে তার প্রতিকার কী, সেটাও স্পষ্ট করা দরকার। তারা অবশ্যই গণভোটে অংশ নেওয়ার জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু তারা হ্যাঁ ভোট দেবে নাকি না ভোট, তা নির্ধারণ করে দিতে পারে বলে মনে হয় না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিশ্বে সর্বোচ্চ বেতন পেয়েও কেন পেশা ছাড়ছেন মার্কিন চিকিৎসকেরা

বাংলাদেশকে ‘শাস্তির’ হুমকি দিলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ

আজকের রাশিফল: স্ত্রীর পরামর্শে ভাগ্য খুলবে, চারপাশের মানুষ ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে

আলোচিত বলিউড অভিনেতা কামাল খান গ্রেপ্তার

সৎ নেতাকে ভোট দিতে বলায় খতিবের দিকে তেড়ে গেলেন কিছু মুসল্লি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত