Ajker Patrika

মুখোশের আড়ালে মানুষ

মুখোশ পরে থাকা যায়, কিন্তু সারাক্ষণ মুখোশ হয়ে থাকা যায় না। মানুষকে চেনার সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা বক্তৃতা নয়, স্বার্থের সংঘাত। যখন নিজের লাভ আর নীতির মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, তখনই মুখোশ একটু কাঁপে। তখন বোঝা যায়, এত দিনের সততা সত্যিই সততা ছিল, নাকি পরিস্থিতির অনুকূল একটি সুন্দর পোশাক।

চিররঞ্জন সরকার
মুখোশের আড়ালে মানুষ

আমাদের সমাজে মুখোশ এখন আর লুকানোর জিনিস নয়, দেখানোর জিনিস। কে কেমন মানুষ, সেটি জানার চেয়ে কে কেমন মানুষ সেজেছেন, সেটিই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবজীবনে মন খারাপ, ফেসবুকে হাসি; পকেটে টাকা নেই, কিন্তু রেস্তোরাঁয় ছবি; সংসারে আগুন, স্ট্যাটাসে ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ অনেক ভালো রেখেছেন’। মনে হয়, আমাদের জীবনে সুখ কমেনি, শুধু তার ক্যামেরা-অ্যাঙ্গেল বদলেছে।

আগে মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ঠিক করত। এখন আয়নার চেয়ে মোবাইল ক্যামেরার গুরুত্ব বেশি। কারণ, আয়না সত্য দেখায়, ক্যামেরা চাইলে গল্প বানিয়ে দেয়। ফিল্টার দিয়ে চেহারা বদলানো যায়, ক্যাপশন দিয়ে চরিত্রও। কেউ দান করলেন, সঙ্গে সঙ্গে ছবি। গরিবের হাতে টাকা দেওয়ার চেয়ে ক্যামেরার সামনে দেওয়াটাই যেন বেশি জরুরি। মানবিকতা এখন অনেক সময় কাজ নয়, কনটেন্ট। সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে কেউ কেউ নিশ্চিত হন, ফ্রেমে হাতটা ঠিকমতো এসেছে কি না।

মুখোশ অবশ্য নতুন নয়। রাজদরবারে ছিল, জমিদারবাড়িতে ছিল, অফিসে ছিল, পাড়ার আড্ডাতেও ছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে গণতান্ত্রিক করেছে। এখন মুখোশের অধিকার সবার। কেউ সফলতার মুখোশ পরেন, কেউ সুখের, কেউ জ্ঞানের, কেউ দেশপ্রেমের, কেউ ধর্মভীরুতার। সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখোশটির নাম সম্ভবত ‘আমি খুব ব্যস্ত’। মানুষটি সারা দিন কিছু না করেও এত ব্যস্ত যে নিজের অলসতার খবর দেওয়ার সময়ও তার নেই।

অফিসেও মুখোশের চাহিদা কম নয়। বস বললেন, ‘এই সিদ্ধান্তটা কেমন?’ কর্মী বললেন, ‘স্যার, অসাধারণ!’ বস বেরিয়ে যেতেই সেই অসাধারণ সিদ্ধান্তের পোস্টমর্টেম শুরু। পাঁচ মিনিট আগে যে সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী, পাঁচ মিনিট পর সেটিই হয়ে যায় অফিস ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। আমাদের কর্মসংস্কৃতিতে সত্য বলার চেয়ে সঠিক ব্যক্তির সামনে সঠিক মুখভঙ্গি করা অনেক সময় বেশি নিরাপদ।

ক্ষমতার করিডরে মুখোশের কারখানা আরও উন্নত। সেখানে নীতি আছে, আদর্শ আছে, বিবেকও আছে, তবে সবকিছুরই ব্যবহার সময়ভেদে। ক্ষমতা কাছে থাকলে নীতি দৃঢ়, ক্ষমতা দূরে গেলে নীতি আরও দৃঢ়, আর ক্ষমতা বদলে গেলে আগের নীতির মালিককে খুঁজে পাওয়া কঠিন। গতকাল যিনি নীতির পাহাড় ছিলেন, আজ তিনি বাস্তবতার নদীতে সাঁতার কাটছেন। রাজনীতির ভাষায় একে বলা যায় ‘পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া’; সাধারণ ভাষায় মানুষ একে কী বলে, সেটি না বলাই ভালো।

আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে আবার ‘মানুষ কী বলবে’ নামের এক অদৃশ্য আদালত আছে। এই আদালতের বিচারক, আইনজীবী, সাক্ষী সবাই প্রতিবেশী। ছেলে কী পড়বে, মেয়ে কাকে বিয়ে করবে, চাকরি ছাড়বে কি না, বাড়ি কিনবে কি না, এমনকি কখন ঘুমাবে, তারও সামাজিক অনুমোদন দরকার। নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা প্রায়ই ভাবি, আত্মীয়স্বজনের সম্মেলনে এর কী প্রতিক্রিয়া হবে। নিজের সুখকে বাদ দিয়ে অন্যের মন্তব্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই অসাধারণ ক্ষমতার নামই হয়তো সভ্যতা।

সমস্যা হলো, মুখোশ পরে থাকা যায়, কিন্তু সারাক্ষণ মুখোশ হয়ে থাকা যায় না। মানুষকে চেনার সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা বক্তৃতা নয়, স্বার্থের সংঘাত। যখন নিজের লাভ আর নীতির মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, তখনই মুখোশ একটু কাঁপে। তখন বোঝা যায়, এত দিনের সততা সত্যিই সততা ছিল, নাকি পরিস্থিতির অনুকূল একটি সুন্দর পোশাক।

কেউ সাধারণ সময়ে অত্যন্ত বিনয়ী। কিন্তু তাঁর সুবিধায় একটু হাত পড়তেই বিনয়ের জায়গায় বজ্রপাত। কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন, তারপর পরিচিত কাউকে ফোন করে বলেন, ‘ভাই, নিয়মটা একটু দেখেন।’ কেউ স্বচ্ছতার কথা বলেন, কিন্তু নিজের হিসাবের খাতা দেখাতে বললে হঠাৎ স্বচ্ছতা এতটাই স্বচ্ছ হয়ে যায় যে কিছুই দেখা যায় না।

ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবন যত বড়ই হোক, সিলমোহর যত ভারীই হোক, ওয়েবসাইটে নীতিবাক্য যত সুন্দরই লেখা থাকুক, কাজের মধ্যে তার প্রতিফলন না থাকলে সবই সাজসজ্জা। দেয়ালে ‘সততা আমাদের অঙ্গীকার’ লিখে রাখলেই সততা প্রতিষ্ঠিত হয় না। যেমন জিমের দেয়ালে ‘ফিটনেস ইজ লাইফ’ লিখে রাখলে পেট কমে না, তেমনি নীতিমালার বই ছাপালেই প্রতিষ্ঠান নীতিবান হয় না।

মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন—বাংলাদেশে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের নাম শুনলে মনে হয়, রাষ্ট্রের বিবেক বুঝি আলাদা আলাদা দপ্তরে যত্ন করে সংরক্ষণ করা আছে। কিন্তু সেই বিবেক কতটা জাগ্রত, আর কতটা ক্ষমতার ইশারায় চোখ বুজে থাকে, তা একমাত্র মহান স্রষ্টাই জানেন!

আমাদের দেশে আইন যতটা স্বাধীনতার কথা বলে, বাস্তবতা অনেক সময় ততটাই পরাধীনতার মহড়া দেয়। কাগজে প্রতিষ্ঠান স্বাধীন, বিধিতে কর্মকর্তা স্বাধীন, এমনকি অফিসের চেয়ার-টেবিলও কারও অনুমতির অপেক্ষা না করে নিজ নিজ জায়গায় দিব্যি অবস্থান করে। কিন্তু ক্ষমতাবানদের স্বার্থে আঘাত লাগার মুহূর্তে সেই স্বাধীনতার হাঁটু কাঁপে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা। নিয়োগদাতা কে, তা দিয়ে কাউকে চূড়ান্তভাবে বিচার করা যায় না; আবার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে ঝেড়ে ফেলাও নিরপেক্ষতার কোনো মহৌষধ নয়। বিচার করতে হবে তাঁর সিদ্ধান্তে, আইনের প্রতি আনুগত্যে, ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতায় এবং ভুল হলে জবাবদিহির মানসিকতায়। কারণ, নিয়োগপত্র কাউকে পদে বসায়, কিন্তু মেরুদণ্ড সরবরাহ করে না; পদমর্যাদা পরিচয়পত্র দেয়, চরিত্রের সনদ নয়। আর স্বাধীনতার সাইনবোর্ড যত বড়ই হোক, ভেতরে যদি পরাধীনতার দোকান চলে, তবে সেটি প্রতিষ্ঠান নয়—ক্ষমতার শোরুম মাত্র!

আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমরা চরিত্রের চেয়ে পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দিই। বড় গাড়ি দেখলে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ, বড় পদ দেখলে মানুষ যোগ্য, বড় ভবন দেখলে প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য। সিলমোহর দেখলে প্রশ্ন থেমে যায়। যেন সিলমোহর নিজেই সত্যের জাতীয় পরিচয়পত্র। অথচ ক্ষমতা চরিত্রের প্রমাণ নয়, পদও প্রজ্ঞার সার্টিফিকেট নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অভিনয়কে আরও সহজ করেছে। আগে একজন মানুষকে ভালো সাজতে হলে পাড়ায় কয়েক বছর কাজ করতে হতো। এখন ভালো মানুষ হতে কয়েকটি ছবি, তিনটি আবেগী ক্যাপশন এবং একটি সুন্দর প্রোফাইল ফ্রেমই যথেষ্ট। দেশপ্রেমের পোস্ট দিতে সময় লাগে ১০ সেকেন্ড, কিন্তু দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে লাগে অনেক বেশি। তাই পোস্টের সংখ্যা বাড়ছে, দায়িত্বের পরিমাণ নিয়ে অবশ্য বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

মুখোশের সবচেয়ে হাস্যকর দিক হলো, আমরা অন্যের মুখোশ খুব সহজে দেখতে পাই, নিজেরটা দেখতে পাই না। যে ব্যক্তি অন্যের ভণ্ডামি নিয়ে দুই ঘণ্টা বক্তৃতা দেন, তাঁর নিজের সুবিধাবাদ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, ‘আপনি বিষয়টি ভুল বুঝছেন।’ অন্যের নীতিভ্রষ্টতা দুর্নীতি, নিজেরটি বাস্তবতা। অন্যের আপস চরিত্রহীনতা, নিজের আপস কৌশল। অন্যের নীরবতা কাপুরুষতা, নিজের নীরবতা পরিস্থিতি বোঝার পরিপক্বতা। একই কাজ, শুধু মুখোশ বদলালেই নৈতিকতার সংজ্ঞাও বদলে যায়।

‘দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়’ কথাটির মধ্যে তাই গভীর সামাজিক ব্যঙ্গ আছে। একটি ভণ্ড পরিবেশে সৎমানুষ বোকা মনে হতে পারেন। প্রশ্ন করা মানুষ ঝামেলাবাজ, প্রতিবাদী মানুষ অযোগ্য, নীতিবান মানুষ অতি সরল। আর যে সবাইকে খুশি রাখতে পারে, সে হয়ে ওঠে ‘চমৎকার মানুষ’। অর্থাৎ চরিত্রের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, আপনি কারও অসুবিধার কারণ হচ্ছেন কি না।

তবু মুখোশের বাজার চিরস্থায়ী নয়। সময়, সংকট, ক্ষমতা এবং স্বার্থের সংঘাত শেষ পর্যন্ত মানুষকে প্রকাশ করে। তখন বক্তৃতা চুপ করে যায়, ক্যামেরা নামিয়ে রাখা হয়, আর সিদ্ধান্ত কথা বলে। তখন বোঝা যায় কে সত্যিই নীতিবান, আর কে নীতির পোশাক ভাড়া নিয়েছিলেন।

আমাদের দরকার নিখুঁত মানুষ নয়, প্রকৃত মানুষ। ভুল করলে যে বলবে, ‘আমি ভুল করেছি।’ দুর্বল হলে যে দুর্বলতা স্বীকার করবে। অন্যায় করলে যে ক্ষমতার আড়ালে না গিয়ে দায় নেবে। একইভাবে প্রতিষ্ঠানও এমন হতে হবে, যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, ভিন্নমত শত্রুতা নয় এবং জবাবদিহি অপমান নয়।

কারণ, মুখোশ যত দামি হোক, ঘামলে তার মেকআপ একসময় গলে যায়। তখন আসল মুখ বেরিয়ে পড়ে। তাই মানুষকে পদ দিয়ে নয়, প্রচার দিয়ে নয়, পোশাক দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে চিনতে শেখাই ভালো। মুখোশের বাজারে ক্রেতা যত দিন থাকবে, বিক্রেতাও থাকবে। আর আমরা যদি সত্যিই মুখ দেখতে চাই, তাহলে প্রথম কাজটি খুব কঠিন: আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখোশটিও চিনতে হবে। তারপর হয়তো বোঝা যাবে, এত দিন আমরা মানুষ দেখিনি, শুধু মানুষের অভিনয় দেখেছি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত