Ajker Patrika

থাপ্পড়টা আসলে কার গালে পড়ল

ডা. সানজিদা শাহরিয়া
থাপ্পড়টা আসলে কার গালে পড়ল

টঙ্গীর এক বাবার থাপ্পড়ের ভিডিও ঘিরে দেশ এখন দুই ভাগ। কিন্তু এই বিতর্কে হারিয়ে যাচ্ছে মূল প্রশ্ন—মাদ্রাসায় শিশুর সুরক্ষা দেবে কে?

একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে বসা মানুষটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এই বাবার ছোট্ট মেয়েকে যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবা শুনছেন, চোয়াল শক্ত, চোখ জ্বলছে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষক সাফাই দিয়ে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে তাঁর মুখে শোনা যায় দুটি শব্দ: ‘একটা চুমু’। মুহূর্তেই ভেঙে যায় সংযমের বাঁধ। একটি থাপ্পড় পড়ে শিক্ষকের গালে; এরপর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে মারধর করেন, পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে।

গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার এই দৃশ্য এখন লাখো মানুষের মোবাইল ফোনের পর্দায়। শিশুটির বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন ‘থাপ্পড়ম্যান’ নামে। কেউ তাঁকে বীর বলছেন, কেউ বলছেন অপরাধী। অভিযুক্ত শিক্ষক এখন কারাগারে। অন্যদিকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বাবার বিরুদ্ধে ভাঙচুর, শিক্ষকদের মারধর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে পাল্টা মামলা করেছে; বাবা লুটের অভিযোগ অস্বীকার করে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের অভিযান নিয়েও এসেছে পরস্পরবিরোধী খবর। মনে রাখা দরকার, শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা বাবার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার অভিযোগ—কোনোটিই এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়।

প্রশ্ন হলো, ওই থাপ্পড় কি শুধু একজন মানুষের গালে পড়েছিল? নাকি আমাদের পুরো ব্যবস্থার গালে? মনোবিশ্লেষক শান্দোর ফেরেনৎসি (১৯৩২) শিশু নিপীড়নের প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ভাষার বিভ্রাট’-এর কথা: প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর কোমলতার ভাষাকে নিজের কামনার ভাষায় ভুল পড়েন, পরে তা আদর বলে চালিয়ে দেন। এই ঘটনায় আসলে কী ঘটেছিল, তা আদালত ঠিক করবে। কিন্তু বাবার কানে শব্দটি পৌঁছেছিল অভিযোগকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা হিসেবে। তাঁর কাছে সেটি ছিল দ্বিতীয় আঘাত: প্রথমটি, তাঁর বিশ্বাসে, মেয়ের শরীরে; দ্বিতীয়টি সত্যের ওপর।

সেই ঘরে আসলে দুজন ‘পিতা’ মুখোমুখি ছিলেন। একজন জন্মদাতা পিতা, অন্যজন সমাজের চোখে আধ্যাত্মিক পিতা, অর্থাৎ ওস্তাদ। জন্মদাতা পিতা যখন বিশ্বাস করেন যে আধ্যাত্মিক পিতা রক্ষকের আসন ছেড়ে নিপীড়কের ভূমিকায় নেমেছেন, তখন তাঁর রাগ কেবল প্রতিশোধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

স্নায়ুবিজ্ঞান সাধারণভাবে বলে, সন্তানের ওপর হুমকি টের পেলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা ও হাইপোথ্যালামাস মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক ক্রোধ জাগিয়ে তোলে। যুক্তি আর সংযমের কেন্দ্র প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স তখনো সাড়া দেওয়ার সময়ই পায় না। অ্যাড্রেনালিনের ঝড়ে হাত আগে চলে, ভাবনা আসে পরে। প্রাণী-গবেষণায় দেখা গেছে, যে অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন সন্তানের প্রতি কোমলতা জাগায়, হুমকির মুখে সেগুলোই রক্ষণাত্মক আগ্রাসনও বাড়াতে পারে। এই ব্যাখ্যা সহিংসতার অজুহাত নয়; উত্তেজনা আইনের দায় মোচন করে না। তবে বোঝা যায়, কেন ভিডিওটি দেখে অনেক দর্শক বাবার রাগের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পেরেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিচারের ওপর আস্থা যত কমে, তত বেশি মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণপিটুনি বা ‘মব জাস্টিস’ আমাদের দেশে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। হয়তো সে কারণেই শিশুটির বাবা বারবার বলেছেন, তিনি বিচার চাইতে গিয়েছিলেন, মব তৈরি করতে নয়।

সমস্যার আরেক দিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যানের ‘টোটাল ইনস্টিটিউশন’ বা সর্বগ্রাসী প্রতিষ্ঠানের ধারণা যেকোনো বদ্ধ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে, তা মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা বোর্ডিং স্কুল যা-ই হোক। যেখানে ক্রমোচ্চ কাঠামো কঠোর আর বাইরের তদারকি দুর্বল, সেখানে নির্যাতন সহজে চাপা পড়ে। দেশে-বিদেশে গির্জা, স্কুল, ক্রীড়া সংগঠনে দেখা গেছে, অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তকে আড়াল করা, ভুক্তভোগীর পরিবারকে উল্টো দোষী বানানো, ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব হাজির করা এক চেনা ছক। মনোবিজ্ঞানী জেনিফার ফ্রেইড এর নাম দিয়েছেন ‘ডারভো’ (DARVO) : অস্বীকার, পাল্টা আক্রমণ, আর ভুক্তভোগী ও অপরাধীর জায়গা উল্টে দেওয়া। টঙ্গীতে তেমন কিছু ঘটছে কি না, তা তদন্তই বলবে; পাল্টা মামলা করা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আইনি অধিকার। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দায় হলো এমন সন্দেহের সুযোগই না রাখা।

নৃবিজ্ঞানের চোখে থাপ্পড়টি শুধু আঘাত নয়, একটি প্রতীক। আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় শিক্ষক প্রায় প্রশ্নাতীত মর্যাদার মানুষ। তাঁর গালে চড় মারা মানে একটি সামাজিক ট্যাবু ভাঙা। সে কারণেই হয়তো একটি থাপ্পড় যতটা আলোড়ন তুলেছে, অনেক বড় মারধরও ততটা তোলে না। দক্ষিণ এশীয় সমাজে চড় শরীরের চেয়ে মর্যাদাকে বেশি আঘাত করে। আবার মেয়ের শরীরকে আমরা এখনো পরিবারের ‘ইজ্জত’ হিসেবে দেখি। তাই নির্যাতনের অভিযোগ শুধু শিশুর কষ্ট হিসেবে নয়, পুরো পরিবারের অপমান হিসেবে অনুভূত হয়।

এই কোলাহলে শিশুটির কণ্ঠ কোথায়? তার অভিযোগ, তার ট্রমা, ভাইরাল ভিডিওর সূত্রে নিজের গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘোরার যন্ত্রণা—এগুলো আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গেছে। পাঠকের কাছে অনুরোধ, ভিডিওটি আর ছড়াবেন না। শৈশবে যৌন নির্যাতন মস্তিষ্কের স্ট্রেস-নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) ও বিযুক্তির (ডিসোসিয়েশন) ঝুঁকি বাড়ায়। এই বিপদ শুধু মেয়েশিশুর নয়। এ মাসের শুরুতেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হিফজ বিভাগের একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠায় এক মাদ্রাসাশিক্ষক জনরোষের মুখে পড়েন।

স্পষ্ট করে বলা দরকার, পুলিশ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানালেও আদালতে তা এখনো প্রমাণিত হয়নি; মামলাটি তদন্তাধীন, অভিযুক্ত শিক্ষক আইনের চোখে এখনো নির্দোষ। আর রাগ যত ন্যায্যই হোক, নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া আইনের চোখে দণ্ডনীয়। আমরা যদি ‘থাপ্পড়ম্যান’ সংস্কৃতিকে উদ্‌যাপন করি, কাল সেই হাত নিরপরাধের গালেও পড়তে পারে।

তবে থাপ্পড়টা রোগ নয়, উপসর্গ মাত্র। আসল সমস্যা হলো, আমাদের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে তদারকির বাইরে থাকা অনেক মাদ্রাসায়, শিশু সুরক্ষার কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামো নেই। ক্যামেরা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, অভিযোগ পেয়ে কর্তৃপক্ষ কী করেছিল। ২০১৯ সালে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার ফেনীর সোনাগাজীর ছাত্রী নুসরাতের মৃত্যুর পরই সেই মাদ্রাসায় সিসিটিভি বসানো হয়েছিল। প্রতিটি ক্যামেরা কি একটি শিশুর জীবনের বিনিময়ে বসবে?

সমাধান তাই স্লোগানে নয়, সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন; মাদ্রাসায় তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হোক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কওমি বোর্ডগুলো মিলে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা দিক, না মানলে স্বীকৃতি স্থগিত হোক। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকুক প্রশিক্ষিত সুরক্ষা কর্মকর্তা ও নারী তত্ত্বাবধায়ক। অভিযোগ পেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ বা শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ জানানো বাধ্যতামূলক হোক, চেপে গেলে কর্তৃপক্ষের শাস্তি। শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ যাচাই হোক, আর শিশুদের শেখানো হোক ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য।

রাষ্ট্র যদি এখনই এই কাঠামো বাধ্যতামূলক না করে, আর ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সমাজ তা বাস্তবায়নে এগিয়ে না আসে, তাহলে ভয়ার্ত বাবা-মায়ের সামনে কেবল দুটি পথ খোলা থাকবে: হয় নিজের হাতে বিচার, নয়তো মুখ বুজে সহ্য করা। দুটির কোনোটিই শিশুকে রক্ষা করে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত