Ajker Patrika

আর্কটিক ভূরাজনীতিতে গ্রিনল্যান্ড

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
আর্কটিক ভূরাজনীতিতে গ্রিনল্যান্ড
গ্রিনল্যান্ডের ফুটবল মাঠ। তুষারপাতের কারণে বছরে ৮ থেকে ১০ মাস বরফে ঢাকা থাকে। তাই বেশির ভাগ সময় ইনডোরে অনুশীলন করতে হয় দেশটির ফুটবলারদের। ছবি: ইএসপিএন

ভেনেজুয়েলার সম্প্রতিকালের রাজনৈতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানে একটি বিস্তৃত রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। এই হস্তক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক সংকটে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং তা বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির এক গভীর পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ক্রমবর্ধমানভাবে এমন এক বিশ্বব্যবস্থার ধারণা সামনে আনছে, যেখানে ভূখণ্ড, প্রভাবক্ষেত্র ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিপাত এখন এমন সব ভৌগোলিক অঞ্চলের দিকে, যেগুলো অতীতে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক বলে বিবেচিত হলেও বর্তমান বৈশ্বিক রূপান্তরে ক্রমেই কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং নিরাপত্তা হুমকির বহুমাত্রিক বিস্তারের ফলে এসব অঞ্চল নতুন করে শক্তি প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। আর্কটিক অঞ্চল—বিশেষত গ্রিনল্যান্ড—এই পুনর্গঠিত ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো কূটনৈতিক মন্তব্য বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আর্কটিক ভূরাজনীতিতে উদীয়মান শক্তি প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা স্থাপত্যের পুনর্গঠন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ভূখণ্ড নৌপথ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক ও প্রযুক্তিগত মোতায়েনের ক্ষেত্রে ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও জটিল করে তুলেছে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও আগ্রহ। আর্কটিক অঞ্চলে অবকাঠামো বিনিয়োগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কৌশলগত সহযোগিতার আড়ালে এই দুই শক্তির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন নিরাপত্তা ও প্রভাবগত প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে দেওয়া বিভিন্ন মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও সেগুলো দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অতিশয়োক্তি কিংবা অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক ভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ, প্রতীকী সফর, নীতিগত বিবৃতি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি কাঠামোগত উপাদানে পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পুনঃঅবস্থান ক্রমেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ; বিশেষ করে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌম অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেও একই সঙ্গে তারা এই পরিবর্তিত বাস্তবতাও উপলব্ধি করছে, আর্কটিক অঞ্চল দ্রুত আন্তর্জাতিক শক্তি প্রতিযোগিতার একটি কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিতে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বরফের স্থায়ী আবরণ সরে যাওয়ায় নতুন সামুদ্রিক নৌপথ উন্মোচিত হচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুযোগ বাড়ছে। এ ছাড়া সামরিক উপস্থিতি বিস্তারের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যে ‘শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা’র প্রতি যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা বিদ্যমান উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নীতিগত কাঠামোর সঙ্গে একটি মৌলিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরাপত্তা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত এবং ভূখণ্ডগত অবস্থানকে শক্তি প্রয়োগের বৈধ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শুধু নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক সংকেত।

ঐতিহাসিকভাবে গ্রিনল্যান্ড আটলান্টিক নিরাপত্তাকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি যেমন সামুদ্রিক যোগাযোগ ও কনভয় সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তেমনি সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এটি ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কব্যবস্থা, আর্কটিক নজরদারি সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য কৌশলগত অবস্থানে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান সামরিক উপস্থিতি ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, যা সমষ্টিগতভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।

এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ সত্যিই নিরাপত্তা হয়, তবে বিদ্যমান মিত্রতা কাঠামো ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মধ্যেই সেই লক্ষ্য অর্জন কি সম্ভব? ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর নিরাপত্তাবলয়ের অন্তর্ভুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে সার্বভৌমত্ব ইস্যুতে প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি কূটনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং মিত্রদের মধ্যে আস্থার ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।

একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষত অপরিশোধিত তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজ—ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। আর তাই চীন ও রাশিয়ার আগ্রহ এই প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে আন্তর্জাতিক অনুশীলনে এসব সম্পদের আহরণ এবং ব্যবস্থাপনায় অংশীদারমূলক ও বহুপক্ষীয় কাঠামোকে অধিকতর বৈধ এবং টেকসই পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কিংবা একতরফা প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত সেই আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলগত মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে প্রভাব বিস্তার, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নির্মাণ একসূত্রে গাঁথা। এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভাষা ও বহুপক্ষীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া, কানাডার সতর্ক অবস্থান এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ সম্মিলিতভাবে নির্দেশ করছে, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নটি শুধু একটি দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং এটি আর্কটিক অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য, মিত্রতা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে এক গভীর ও বহুদূরপ্রসারী পরীক্ষার সূচনা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে প্রধান শক্তিগুলোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে আঞ্চলিক ইস্যুগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সেগুলো বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় গতিপথের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এমন বাস্তবতায় কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে যেকোনো একতরফা কিংবা শক্তিনির্ভর পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাই নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কাজেই, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—শক্তির পুনরুত্থানের এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্রসমূহ কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে কতটা দায়িত্বশীল কূটনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারে, তার ওপর। আর্কটিক অঞ্চল, বিশেষত গ্রিনল্যান্ড, এই মুহূর্তে সেই পরীক্ষার অন্যতম প্রধান মঞ্চ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত