রাইসুল সৌরভ

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসনুর রহমানের সরকারি আবাসের আঙিনায় একটি মা কুকুর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আটটি ছানার জন্ম দেয়। সেই ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে হত্যা করেছেন হাসনুরের স্ত্রী। পরে পুকুর থেকে মৃত ছানাগুলো উদ্ধার করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ঘটনাটি সারা দেশের ও প্রবাসী বিবেকবান নাগরিকের মনে আলোড়ন তুলেছে। পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার তৎপরতায় ২ ডিসেম্বর রাতে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উদ্যোগী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন। যার ফলে ওই কর্মকর্তার অভিযুক্ত স্ত্রীকে পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এখন প্রশ্ন হলো, দেশে ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন নামের একটি আইনের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকতেও প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমছে না কেন? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১৯ সালের আইনের আগে এ ভূখণ্ডে ‘দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০’ নামের ভিন্ন একটি আইন প্রচলিত ছিল; যা সংস্কার করে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যে কথা নতুন আইনের প্রস্তাবনায়ও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের আইনটি এর আগের শত বছরের প্রাচীন ১৯২০ সালের আইনের তুলনায় প্রগতিশীল হলেও এই আইনের মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ত্রুটি রয়ে গেছে। আর তাই সংগত কারণেই এই আইনটিও দেশে আদৌ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালন এবং সর্বোপরি দেশের প্রাণিকুলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না।
আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ব্যতীত, কোনো আদালত এই আইনের অধীনে সম্পন্ন কোনো অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারেন না (ধারা: ১৮)। অর্থাৎ, আইনানুযায়ী সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে এই আইনে মামলা দায়ের বা প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। আইনে কর্তৃপক্ষ বলতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ওই অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জনকে বোঝানো হয়েছে (ধারা: ২ (৪))। সুতরাং, ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ কেউ সরাসরি এই আইনে প্রতিকার চাইতে মামলা দায়ের করতে পারবে না; বড়জোর সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করতে পারবে। বরং মামলা দায়ের করতে হলে তাকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দ্বারস্থ হতে হবে এবং এসব ক্ষেত্রে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অযথা কালক্ষেপণ ও নানাবিধ হয়রানি হতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন না তুললে বা ভিডিও না থাকলে বা দায়িত্বশীল কেউ উদ্যোগ না নিলে সাধারণত এসব ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ কাউকে নিতে দেখা যায় না। ফলে প্রাণিকল্যাণ প্রকৃতার্থে আইনের পুস্তকেই সীমাবদ্ধ আছে, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। আর সে কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণিকল্যাণ আইনকে পাশ কাটিয়ে দণ্ডবিধির অধীনে নাগরিকেরা মামলা করতে বাধ্য হন।
দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি প্রাণি হত্যা করে বা ক্ষতি করে এবং যেকোনো প্রাণীর মূল্য যদি ৫০ টাকা বা তার বেশি হয় তাহলে ওই ব্যক্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপর দিকে প্রাণিকল্যাণ আইনের ১৬ ধারা মতে অপরাধের ধরন ও মাত্রানুসারে এমনকি কেউ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে অপরাধী ও সহায়তাকারীকে অনধিক ৬ (ছয়) মাস থেকে অনধিক ২ (দুই) বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ (দশ) হাজার টাকা থেকে অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য। তবে দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারার অধীনে কৃত অপরাধ আমলযোগ্য অর্থাৎ পুলিশ অভিযুক্তকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবে, তবে দণ্ডবিধি অনুসারেও অপরাধটি জামিনযোগ্য অপরাধ। সুতরাং, অভিযুক্তকে জামিন না দিয়ে জেলে প্রেরণ করা হলো কেন, সেটি স্পষ্ট নয়।
কিন্তু দণ্ডবিধির অধীনে মামলা করার জটিলতা হলো প্রাণীটি কারও মালিকানাধীন না হলে মূল্য নির্ণয় করা যায় না, অর্থাৎ মালিকবিহীন রাস্তার কুকুর বা বিড়ালের মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অপর দিকে, প্রাণিকল্যাণ আইনে মালিকানাধীন (পোষা) ও বিহীন উভয় প্রাণী হত্যা অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। উপরন্তু, ২০১৯ সালের এই আইনে উল্লিখিত কোনো কারণ ছাড়া মালিকানাবিহীন কোনো প্রাণীও নিধন বা অপসারণ বা স্থানান্তর করা যায় না।
এ কথা সত্য যে আগের তুলনায় প্রাণিকল্যাণের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। যার দরুন প্রায়ই দল বেঁধে বা এককভাবে প্রাণী হত্যা বা নিধনের খবর পাওয়া যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব নিধনে নেতৃত্ব দেয়। যদিও ২০২০ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে ঢাকার সিটি করপোরেশন কুকুর নিধন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। তবে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি, ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মধ্যে কুকুর নিয়ে একধরনের আতঙ্ক বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে বাজেট, প্রশিক্ষণ, উদ্যোগ, সমন্বয় প্রভৃতির অভাব রয়েছে।
আবার সারা পৃথিবীতে যখন প্রচলিত আবদ্ধ স্থানে চিড়িয়াখানার মাধ্যমে প্রাণী প্রদর্শন ক্রমান্বয়ে সীমিত করে আনা হচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। বরং জাতীয় চিড়িয়াখানা মিরপুরে নতুন প্রাণী আমদানি করার খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। এরই মধ্যে জানা গেল গত ৫ ডিসেম্বর চিড়িয়াখানার একটি সিংহী খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার খবর। যদিও এ ঘটনা কোনো দুঃসংবাদ বয়ে আনেনি, তবে সিংহীটির জীর্ণদশা প্রাণিপ্রেমীদের ব্যথিত করেছে।
এর মধ্যে একটি ভালো খবরও জানা যায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বন্য হাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সরকারি ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বন বিভাগের বাঁশখালীর জলদি রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেছেন হাতি স্থানীয়দের অতিথি। তাই মেহমান এসে ফসল খেয়ে ফেললেও হাতির কোনো ক্ষতি যেন স্থানীয়রা না করেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ফসলের ক্ষতিপূরণ দেবে। তাই এখন থেকে কেউ যেন আর কোনো হাতির ক্ষতি না করে। অনুষ্ঠানে ১১ জন ক্ষতিগ্রস্তকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। পরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আইন ও বিধিমালা সম্পর্কিত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যা নিঃসন্দেহে বন বিভাগের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দেশে প্রাণী সুরক্ষায় এ ধরনের আরও উদ্যোগ প্রত্যাশিত।
আরও একটি ভালো খবর, নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মঞ্চে এখন থেকে ফার (প্রাণীর পশমে তৈরি উপকরণ) ব্যবহার নিষিদ্ধ। যদিও এই নিয়ম ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তবে এর ফলে আশা করা হচ্ছে যে এখন থেকে এই সিদ্ধান্ত মার্কিন ডিজাইনারদের প্রাণিকুল সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করবে। এর আগে লন্ডন ফ্যাশন উইক ২০১৮ সাল থেকে ফার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন মন্ত্রিসভা, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভিন্ন দপ্তরের বাংলা নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদন করে অধিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের নিমিত্তে পশুর পরিবর্তে প্রাণী প্রবর্তন করে এবং ২০১৯ সালে দেশে প্রাণিকল্যাণ আইন প্রণয়ন হলেও কিছু মানুষের মধ্য থেকে পাশবিকতা এখনো দূর করা যায়নি। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে বিদ্যমান প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও এটি এখনো বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্পষ্টতই অক্ষম ও অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রের এখন সে দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে। আইনকে কেবল কাগুজে নিয়মকানুনে আবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে দেশে সব প্রাণীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, দেশের নাগরিকদের নৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের একটি নিয়ামক হলো নিষ্পাপ, অবলা ও অসহায় প্রাণীর প্রতি তার সদয় এবং মানবিক আচরণ। সুতরাং, প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিতে আশু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেমন—বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, যথাযথ প্রয়োগ, বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের উদ্ধার এবং পুনর্বাসন, প্রচলিত চিড়িয়াখানার ধারণায় পরিবর্তন, মালিকবিহীন প্রাণীদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল, অর্থ বরাদ্দ, সচেতনতা, প্রচারণা, উদ্যোগ ও প্রাণীর প্রতি দয়া ও প্রয়োজনীয়তাবিষয়ক শিক্ষা মানুষের মনে প্রাণী প্রেম জাগাতে সহায়ক হবে এবং এ ধরনের পাশবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।
লেখক: ডক্টরাল গবেষক, গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসনুর রহমানের সরকারি আবাসের আঙিনায় একটি মা কুকুর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আটটি ছানার জন্ম দেয়। সেই ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে হত্যা করেছেন হাসনুরের স্ত্রী। পরে পুকুর থেকে মৃত ছানাগুলো উদ্ধার করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ঘটনাটি সারা দেশের ও প্রবাসী বিবেকবান নাগরিকের মনে আলোড়ন তুলেছে। পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার তৎপরতায় ২ ডিসেম্বর রাতে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উদ্যোগী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন। যার ফলে ওই কর্মকর্তার অভিযুক্ত স্ত্রীকে পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এখন প্রশ্ন হলো, দেশে ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন নামের একটি আইনের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকতেও প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমছে না কেন? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১৯ সালের আইনের আগে এ ভূখণ্ডে ‘দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০’ নামের ভিন্ন একটি আইন প্রচলিত ছিল; যা সংস্কার করে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যে কথা নতুন আইনের প্রস্তাবনায়ও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের আইনটি এর আগের শত বছরের প্রাচীন ১৯২০ সালের আইনের তুলনায় প্রগতিশীল হলেও এই আইনের মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ত্রুটি রয়ে গেছে। আর তাই সংগত কারণেই এই আইনটিও দেশে আদৌ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালন এবং সর্বোপরি দেশের প্রাণিকুলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না।
আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ব্যতীত, কোনো আদালত এই আইনের অধীনে সম্পন্ন কোনো অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারেন না (ধারা: ১৮)। অর্থাৎ, আইনানুযায়ী সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে এই আইনে মামলা দায়ের বা প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। আইনে কর্তৃপক্ষ বলতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ওই অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জনকে বোঝানো হয়েছে (ধারা: ২ (৪))। সুতরাং, ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ কেউ সরাসরি এই আইনে প্রতিকার চাইতে মামলা দায়ের করতে পারবে না; বড়জোর সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করতে পারবে। বরং মামলা দায়ের করতে হলে তাকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দ্বারস্থ হতে হবে এবং এসব ক্ষেত্রে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অযথা কালক্ষেপণ ও নানাবিধ হয়রানি হতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন না তুললে বা ভিডিও না থাকলে বা দায়িত্বশীল কেউ উদ্যোগ না নিলে সাধারণত এসব ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ কাউকে নিতে দেখা যায় না। ফলে প্রাণিকল্যাণ প্রকৃতার্থে আইনের পুস্তকেই সীমাবদ্ধ আছে, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। আর সে কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণিকল্যাণ আইনকে পাশ কাটিয়ে দণ্ডবিধির অধীনে নাগরিকেরা মামলা করতে বাধ্য হন।
দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি প্রাণি হত্যা করে বা ক্ষতি করে এবং যেকোনো প্রাণীর মূল্য যদি ৫০ টাকা বা তার বেশি হয় তাহলে ওই ব্যক্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপর দিকে প্রাণিকল্যাণ আইনের ১৬ ধারা মতে অপরাধের ধরন ও মাত্রানুসারে এমনকি কেউ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে অপরাধী ও সহায়তাকারীকে অনধিক ৬ (ছয়) মাস থেকে অনধিক ২ (দুই) বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ (দশ) হাজার টাকা থেকে অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য। তবে দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারার অধীনে কৃত অপরাধ আমলযোগ্য অর্থাৎ পুলিশ অভিযুক্তকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবে, তবে দণ্ডবিধি অনুসারেও অপরাধটি জামিনযোগ্য অপরাধ। সুতরাং, অভিযুক্তকে জামিন না দিয়ে জেলে প্রেরণ করা হলো কেন, সেটি স্পষ্ট নয়।
কিন্তু দণ্ডবিধির অধীনে মামলা করার জটিলতা হলো প্রাণীটি কারও মালিকানাধীন না হলে মূল্য নির্ণয় করা যায় না, অর্থাৎ মালিকবিহীন রাস্তার কুকুর বা বিড়ালের মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অপর দিকে, প্রাণিকল্যাণ আইনে মালিকানাধীন (পোষা) ও বিহীন উভয় প্রাণী হত্যা অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। উপরন্তু, ২০১৯ সালের এই আইনে উল্লিখিত কোনো কারণ ছাড়া মালিকানাবিহীন কোনো প্রাণীও নিধন বা অপসারণ বা স্থানান্তর করা যায় না।
এ কথা সত্য যে আগের তুলনায় প্রাণিকল্যাণের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। যার দরুন প্রায়ই দল বেঁধে বা এককভাবে প্রাণী হত্যা বা নিধনের খবর পাওয়া যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব নিধনে নেতৃত্ব দেয়। যদিও ২০২০ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে ঢাকার সিটি করপোরেশন কুকুর নিধন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। তবে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি, ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মধ্যে কুকুর নিয়ে একধরনের আতঙ্ক বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে বাজেট, প্রশিক্ষণ, উদ্যোগ, সমন্বয় প্রভৃতির অভাব রয়েছে।
আবার সারা পৃথিবীতে যখন প্রচলিত আবদ্ধ স্থানে চিড়িয়াখানার মাধ্যমে প্রাণী প্রদর্শন ক্রমান্বয়ে সীমিত করে আনা হচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। বরং জাতীয় চিড়িয়াখানা মিরপুরে নতুন প্রাণী আমদানি করার খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। এরই মধ্যে জানা গেল গত ৫ ডিসেম্বর চিড়িয়াখানার একটি সিংহী খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার খবর। যদিও এ ঘটনা কোনো দুঃসংবাদ বয়ে আনেনি, তবে সিংহীটির জীর্ণদশা প্রাণিপ্রেমীদের ব্যথিত করেছে।
এর মধ্যে একটি ভালো খবরও জানা যায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বন্য হাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সরকারি ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বন বিভাগের বাঁশখালীর জলদি রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেছেন হাতি স্থানীয়দের অতিথি। তাই মেহমান এসে ফসল খেয়ে ফেললেও হাতির কোনো ক্ষতি যেন স্থানীয়রা না করেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ফসলের ক্ষতিপূরণ দেবে। তাই এখন থেকে কেউ যেন আর কোনো হাতির ক্ষতি না করে। অনুষ্ঠানে ১১ জন ক্ষতিগ্রস্তকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। পরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আইন ও বিধিমালা সম্পর্কিত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যা নিঃসন্দেহে বন বিভাগের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দেশে প্রাণী সুরক্ষায় এ ধরনের আরও উদ্যোগ প্রত্যাশিত।
আরও একটি ভালো খবর, নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মঞ্চে এখন থেকে ফার (প্রাণীর পশমে তৈরি উপকরণ) ব্যবহার নিষিদ্ধ। যদিও এই নিয়ম ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তবে এর ফলে আশা করা হচ্ছে যে এখন থেকে এই সিদ্ধান্ত মার্কিন ডিজাইনারদের প্রাণিকুল সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করবে। এর আগে লন্ডন ফ্যাশন উইক ২০১৮ সাল থেকে ফার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন মন্ত্রিসভা, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভিন্ন দপ্তরের বাংলা নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদন করে অধিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের নিমিত্তে পশুর পরিবর্তে প্রাণী প্রবর্তন করে এবং ২০১৯ সালে দেশে প্রাণিকল্যাণ আইন প্রণয়ন হলেও কিছু মানুষের মধ্য থেকে পাশবিকতা এখনো দূর করা যায়নি। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে বিদ্যমান প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও এটি এখনো বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্পষ্টতই অক্ষম ও অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রের এখন সে দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে। আইনকে কেবল কাগুজে নিয়মকানুনে আবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে দেশে সব প্রাণীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, দেশের নাগরিকদের নৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের একটি নিয়ামক হলো নিষ্পাপ, অবলা ও অসহায় প্রাণীর প্রতি তার সদয় এবং মানবিক আচরণ। সুতরাং, প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিতে আশু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেমন—বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, যথাযথ প্রয়োগ, বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের উদ্ধার এবং পুনর্বাসন, প্রচলিত চিড়িয়াখানার ধারণায় পরিবর্তন, মালিকবিহীন প্রাণীদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল, অর্থ বরাদ্দ, সচেতনতা, প্রচারণা, উদ্যোগ ও প্রাণীর প্রতি দয়া ও প্রয়োজনীয়তাবিষয়ক শিক্ষা মানুষের মনে প্রাণী প্রেম জাগাতে সহায়ক হবে এবং এ ধরনের পাশবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।
লেখক: ডক্টরাল গবেষক, গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড

ভেনেজুয়েলা এখন কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। খ্রিষ্টীয় নববর্ষের আমেজ না কাটতেই মার্কিন আক্রমণে ভেনেজুয়েলা আক্রান্ত হলো, দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহধর্মিণী বন্দী অবস্থায় দেশত্যাগে বাধ্য হলেন।
৩ মিনিট আগে
তুহিন খান একজন লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের ব্যাপারে তিনি বিরোধিতা করেছেন।
১ দিন আগে
খ্রিষ্টীয় বছরের প্রথম দিনে স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায় নতুন বই। সারা দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর বিনা মূল্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত বই বিতরণ করে।
১ দিন আগে
নানা অস্থিরতার মধ্যেও দেশজুড়ে বইছে ভোটের হাওয়া। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচন কিছুটা ব্যতিক্রমী। দেশের ইতিহাসে এটিই হবে প্রথম নির্বাচন, যেখানে ভোটাররা এক ব্যালটে তাঁদের পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন...
১ দিন আগে