বাংলাদেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরে শিশুর ওপর সহিংস আচরণ, নির্যাতন, এককথায় শিশুনিধন প্রক্রিয়া চলছে। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার বড় শিকার ঘুরেফিরে হয় শিশুরা। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার ভুক্তভোগীও শিশুরা। এর কারণ হিসেবে কারও কারও অভিমত—বাংলাদেশে শিশুদের কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংগঠন নেই, সেই কারণে তারা বেশি দুর্বল থাকছে; যেহেতু তারা আন্দোলন, অবরোধ করতে পারে না, সচিবালয়ের গেটে সমাবেশ করার কৌশল বোঝে না। তবে একবার তারা জ্বলে উঠেছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে পুরো বাংলাদেশ অবরুদ্ধ করে দেয় সহপাঠীরা। সেই দিন শিশুদের অভিব্যক্তি কঠোর নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে ও পক্ষে দৃশ্যমান হয়েছিল। এবং সেটাই বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের ন্যায়ের পক্ষে ন্যায্য দাবিতে প্রথম আন্দোলন। বড়রা তাদের কাছে নিজেদের ভুলত্রুটি অনুভব করতে পারে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের পচনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি কর্তৃক শিশু-কিশোরদের এই সহজ, সরল ও ন্যায়সংগত আন্দোলন ছিনতাই হয়ে যায়।
যাহোক, বাংলাদেশে শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় সবচেয়ে বেশি অবস্থান করে। বলতে দ্বিধা নেই যে কোনো রাজনৈতিক সরকার শিশুর নিরাপত্তার জন্য তেমন কোনো শক্ত ও কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি। তেমন সদিচ্ছার নমুনাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অধিকার প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা। সব সরকারের আমলেই দেখা যায় যে শিশুদের নিয়ে যত পরিকল্পনা তার অধিকাংশই অনুষ্ঠাননির্ভর। উন্নয়ন নয়, আয়োজনই বেশি। বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠান পালনে শিশুদের অংশগ্রহণ হয় অলংকারস্বরূপ। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া শিশুদের নিয়ে ভাবনাচিন্তার কোনো অবকাশ নেই কোথাও। নিরাপত্তা যে একজন শিশুর সবচেয়ে বড় ইস্যু ও অধিকার, এমন অনুধাবন ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি সেই অর্থে। ফলে শিশুরা নির্যাতিত হয়েছে বিনা বাধায়।
মিরপুরে আট বছর বয়সী শিশুর ধর্ষণের শিকার হওয়া ও ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাটির কৌশলটা একটু ভিন্ন, কিন্তু পাশবিকতার ধরন একই। বাসার সঙ্গে লাগানো আরেকটি বাসায় তাকে ধর্ষণের পর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। মাথা ও হাত ছাড়া দেহ খাটের নিচে ও খণ্ডিত মাথা ওয়াশরুমের বালতিতে রাখা হয়। বহু বছর ধরে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুরা হলেও দিন দিন তার পাশবিকতার সীমা অতিক্রম করছে। ধরনটাও ভয়ানক হচ্ছে। অপরাধপ্রবণতার বীভৎস অবস্থা সাধারণ মানুষকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। শিশুর প্রতি, বিশেষ করে কন্যাশিশুর প্রতি এই লাগামহীন বর্বরোচিত পাশবিক আচরণ দিন দিন অতীতের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে শুধু বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য। যখন আড়াই বছরের কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তখন আমরা রাষ্ট্রকে সেই অর্থে ব্যাকুল হতে দেখিনি। কন্যাশিশুর যোনিপথ কেটে ধর্ষণ করাটাও যেন এই সমাজের একটি সহজাত আচরণে পরিণত হয়েছে। শিশু ধর্ষণের শিকার হলে দু-চারটি প্রতিবাদ, ধর্ষককে বিচারের আওতায় আনার সরকারের আশ্বাস, তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়া আর কী মেলে? মাগুরার আট বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে আওয়াজ তুলেছিল, তাতে মনে হয়েছিল বিচারপ্রক্রিয়ার সংস্কারের মনোভাব থেকে এবার আর ধর্ষকের রেহাই নেই। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্যতম পাশবিকতার বোধ হয় এখানেই সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু কই? ধর্ষককে কীভাবে রাখা হয়েছে, শাস্তিইবা কতটুকু হলো? মিরপুরের ঘটনাটির পর মাগুরার শিশুটিকে নিয়ে প্রশ্ন জাগলেও কর্তৃপক্ষ তেমন উত্তর দিতে পারেনি।
শুধু কি কন্যাশিশুই ধর্ষণের শিকার ও হত্যার শিকার হচ্ছে? মোটেও না। ছেলেশিশুও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে, তাদেরও হত্যা করা হচ্ছে। মিরপুরের ঘটনার পরপরই বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় এক শিশুর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, শিশুর পায়ুপথে জখমের চিহ্ন রয়েছে। শিশুটিকে বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ায় মাদ্রাসার আরেক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন ঘটনাও এই প্রথম নয়। মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের শিক্ষক কর্তৃক বলাৎকারের অভিযোগ অসংখ্যবার মিডিয়ায় এসেছে। অভিভাবকেরা অভিযোগও করেছেন। কিন্তু অভিযোগের পরিণতি অভিযোগ হয়েই থেকেছে, কিছুই হয়নি। যেসব ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি-গোষ্ঠী আছে, কখনোই তাদের এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যেতে দেখা যায়নি। কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হলে তাদের কাউকে দু-চারটি কথা বলতে দেখা গেলেও ছেলেশিশু বলাৎকারের শিকার হলে সেই সম্পর্কে কোনো আওয়াজ উঠতে দেখা যায় না। এই বৈপরীত্য আচরণ কিন্তু রহস্যময়। বলাৎকারের ঘটনাগুলো যেহেতু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসাতেই বেশি হয়, সেহেতু শিশুর নিরাপত্তার জন্য সব মাদ্রাসায় পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ জরুরি। ধর্ম মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিত উদ্যোগে কাজটি সম্পন্ন করতে পারে। তবে এর আগে জানতে ও বুঝতে হবে, আদতে রাষ্ট্র এই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় কি না।
সাধারণত দেখা গেছে, বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অবস্থা যাদের কিছুটা দুর্বল, সেই সব পরিবারের অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি। তাঁরা মনে করেন, মূলধারার শিক্ষা কার্যক্রমে সন্তানকে লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই। আবার আরেকটা শ্রেণি আছে, যারা আর্থিকভাবে সবল কিন্তু ধর্মীয় চেতনায় সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা নিতে মাদ্রাসায় পাঠায়। তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে নিরাপদ বোধ করে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে, সেটা কেউ কি জানে? জানা জরুরি। সব মাদ্রাসার পরিদর্শন রিপোর্ট সততার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে রাষ্ট্রকে—যদি এই রাষ্ট্র একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ আগামীর প্রত্যাশা করে।
এটা না বললেই নয় যে, এ দেশের শিশুরা অধিকার নয়, বরং বিবেচনায় সুবিধা ভোগ করে। শহরে যত পথশিশু আছে, ততটা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের গল্প আছে। যে গল্পগুলো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার এক-একটি গল্প বা দিক। এসব গল্প বা কাহিনি লিপিবদ্ধ করলে সমাজের সমস্যার মূল কারণ জানা সম্ভব। আর কারণ জানা গেলে সমাধানও পাওয়া সম্ভব। প্রশ্ন, কাজটা কে করবে? কার সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে? মিরপুরের নৃশংস ঘটনায় যখন প্রকাশ্যে ধর্ষকের ফাঁসির দাবি উঠেছিল, তখন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে শোনা গেল, আধুনিক যুগে বসবাস করে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা কী করে নেওয়া সম্ভব! প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ার দাবিকে তিনি জনগণের আবেগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। একজন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর উপলব্ধি এমনটাই হলে শিশুদের নিরাপত্তা কবে, কখন আর কোথায় মিলবে? এটা কি তিনি অস্বীকার করতে পারবেন যে মিরপুরের শিশুটিকে যেভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে, সেটা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়নি?
নিরাপত্তার বিষয়টি যদি কোনো কারণে সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায় কোনো ধরনের অপরিপক্ব উপলব্ধিতে, তাহলে কিন্তু জনগণ নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবে। আইন হাতে তুলে নেবে, নিজেরাই বিচারকাজ সম্পন্ন করবে। তখন কিন্তু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে দেশকে অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। এককথায়, প্রতিটি ধর্ষণের, প্রতিটি বলাৎকারের, প্রতিটি হত্যার কঠিন শাস্তি তথা ফাঁসি কার্যকর হওয়া জরুরি। এই সরকার তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে সক্ষম হলে, ইতিহাস তাকে স্মরণে রাখবে।

ভর্তুকি সমন্বয়, লোকসান কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম একলাফে ১৫ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে আজকের পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
দেশে এখন একটি ভয়ংকর প্রবণতা ক্রমেই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কোনো ব্যক্তি চুরির অভিযোগে ধরা পড়ছেন, কাউকে ডাকাত বলে সন্দেহ করা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করেছেন কিংবা কোনো তুচ্ছ বাগ্বিতণ্ডায় কেউ জড়িয়ে পড়ছেন—ব্যস, একদল উত্তেজিত...
১ ঘণ্টা আগে
সেই যে ২০২২ সালে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তার আর অবসান হচ্ছে না। রাশিয়া একসময় ভেবেছিল, তাদের সশস্ত্র আক্রমণ ইউক্রেনকে কুপোকাত করবে খুব দ্রুত। কিন্তু সে রকম ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা করে এসেছে।
১ দিন আগে
এমনিতেই দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই সুস্থ ধারার কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেগুলো প্রদর্শনের জন্য পর্দার অভাব হয়। এমন পরিস্থিতিতে যখন পরিবার নিয়ে দেখার মতো একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেটি সংস্কৃতির গোড়ায় কুড়াল মারার মতো একটি কাণ্ড নয় কি? উদ্বিগ্ন করা...
১ দিন আগে