
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন আগে অভিযোগ করেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের বিজেপি সরকার বাংলাদেশসংলগ্ন রাজ্যটির ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যেই ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ মানুষের নাম মুছে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এই সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের ৭ কোটি ৬৬ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই তথাকথিত সংশোধনীর ফলে এখন মোট ভোটার সংখ্যা নেমে এসেছে ৬ কোটি ৭৫ লাখে। প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুসারে, এই ৯১ লাখ মানুষের ৬৩.৪ শতাংশই হিন্দু এবং ৩৪.৩ শতাংশ মুসলমান। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ও মুসলিমের হার যথাক্রমে ৭০-৭২ শতাংশ এবং ২৫-২৭ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে যদিও হিন্দু ভোটারদের নাম বেশি কাটা গেছে, কিন্তু যদি অনুপাত বিচার করা হয়, তবে মুসলিম ভোটারদের নামও কম কাটা যায়নি।
ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই সংশোধন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো ডুপ্লিকেট বা পুরোনো নামগুলো বাদ দেওয়া ও প্রকৃত ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু প্রক্রিয়াটিতে শুরু থেকেই বিতর্ক জড়িয়ে আছে। গত বছর বিহারে প্রথমবার এই এসআইআর চালুর পর থেকেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গে বিষয়টি তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজ্যটিতে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তিক্ত সংঘাত চলছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলেছেন, এই সংশোধন প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ‘পরিশুদ্ধ ভোটার তালিকা’ তৈরি, যাতে কোনো যোগ্য ভোটার বাদ না পড়ে এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত না হয়।
কিন্তু বিষয়টি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারণায় ইঙ্গিত দেন, এই তালিকা পরিশোধন মূলত তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করার জন্য। কিন্তু তৃণমূলের অভিযোগ, এই শব্দটি আসলে ‘মুসলমানদের’ বোঝাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তালিকা থেকে বহু হিন্দু ভোটারও বাদ পড়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশসংলগ্ন হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া, ভারতের এই রাজ্যটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার আবাসস্থল। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের ১৭ কোটির বেশি মুসলমানের প্রায় ১৪ শতাংশই এই রাজ্যের।
ভারতের সংসদীয় আসনের দিক থেকে শীর্ষ চারে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যটি এখনো বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ, এই রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটি রাজ্যের ২৯৪টি আসনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জিতেছিল।
তৃণমূলের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় লাখো মানুষ বিশেষ করে, মুসলিমরা ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এটি মূলত বিজেপির সুবিধার জন্য করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই অস্বীকার করেছে। তবে পরিসংখ্যানে তৃণমূলের অভিযোগের সত্যতা আছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মতুয়া জনজাতি অধ্যুষিত বাংলাদেশসংলগ্ন জেলা নদীয়ায় সবচেয়ে বেশি শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। জেলাটিতে মোট ভোটারের মধ্যে ৭৭.৮৬ শতাংশের নামই কাটা পড়েছে। ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়ার উচ্চহার লক্ষ করা গেছে অন্য জেলাগুলোতেও। যেমন মুসলিমপ্রধান হুগলির মোট ভোটারের ৭০.৩৩ শতাংশের নামই কাটা পড়েছে, পূর্ব বর্ধমানে ৫৭.৪ শতাংশ, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৫৫.০৮ শতাংশ এবং পশ্চিম বর্ধমানে ৫৩.৭২ শতাংশ ভোটারের নাম কাটা পড়েছে।
মতুয়ারা মূলত হিন্দু নমশূদ্র বা দলিত জনগোষ্ঠী। দেশভাগের সময় এই জনগোষ্ঠীর লোকজন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছেন। নাম কাটা পড়লেও বিজেপি সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতায় তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, সংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গের যে ১০টি বিধানসভা আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম কাটা গেছে, সেগুলো মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ ও মালদহে অবস্থিত। আবার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এলাকা ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৫০ হাজার ৯৮৭ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ২২৭ জন হিন্দু এবং ১২ হাজার ৮৪ জন মুসলিম। তাৎপর্যের বিষয় হলো—সর্বোচ্চ নাম কর্তন হওয়া এই ১০টি নির্বাচনী আসনের প্রতিটিই বর্তমানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই এসআইআর প্রক্রিয়াটি ভোটার তালিকা সংশোধন নয়, ‘পুনর্লিখনের’ জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মতে, লক্ষ্যভিত্তিক এই উদ্যোগের একাধিক আসনে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এর ফলে, এই নির্বাচনে বাদ পড়া ভোটাররা যেমন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না, পাশাপাশি তাঁদের যোগ্যতা নতুন করে প্রমাণ করার জন্য নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আসামে একই প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, প্রায়ই বাদ পড়া ভোটাররা নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় তোলার ক্ষেত্রে রীতিমতো হয়রানির শিকার হন।
এই নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া যে রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পরিসংখ্যান থেকেই। পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ৩৬টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৫ শতাংশের কম ব্যবধানে জয়ী। বিশ্লেষণ বলছে, এই ৩৬টির মধ্যে ১৯ থেকে ২৫টি আসন গুরুতরভাবে প্রভাবিত হতে পারে এবং মোট ৫৪ থেকে ৭০টি আসন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, এই ভোটার তালিকা সংশোধনীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় অংশের ভোটই তৃণমূলের বাক্সে যায়। আর পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, যেসব আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে সেগুলোতে মুসলিম অথবা মতুয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অবশ্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট বড় ভূমিকা রেখেছে।
সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ ও মধ্য পশ্চিমবঙ্গে নাম বাদ পড়ার কারণে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি কিছুটা সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু বিজেপি কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। বিপুলসংখ্যক হিন্দু নাম বাদ পড়া সরাসরি তাদের সম্ভাব্য ভোটব্যাংক দুর্বল হতে পারে। আবার মতুয়া সম্প্রদায় ২০১৯-এর লোকসভা ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল—তাদের নামও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাদ পড়েছে। উত্তর পশ্চিমবঙ্গের রাজবংশী ভোটারদের মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জঙ্গলমহল অঞ্চলে—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। সেখানেও নাম বাদ পড়ার ঘটনা চোখে পড়েছে। তবে এসব এলাকায় তুলনামূলক কম। ফলে, এখানে বিজেপির খুব একটা ক্ষতি হচ্ছে না। রাজ্যের শিল্পাঞ্চল খ্যাত এলাকাগুলোতে হিন্দিভাষী সম্প্রদায়ের বেশির ভাগই ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপি সমর্থক। কিন্তু তাদের অনেকের নাম ‘শিফটেড’ বা বাইরে থেকে আসা ক্যাটাগরিতে পড়ে বাদ পড়ায় তা বিজেপির ভোটব্যাংককে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন নারীরা। বিশ্লেষণ বলছে, বাদ পড়া বা যাচাইয়ের আওতায় আসা ভোটারদের মধ্যে ৬১.৮ শতাংশের বেশি বা ৬১.৯৩ লাখ নারী এতে প্রভাবিত হয়েছেন। এই বৈষম্য রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৮৮ শতাংশের বেশি জায়গায় দেখা গেছে, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই বাদ পড়াদের অর্ধেকের বেশি।
তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে বাদ পড়া বা যাচাইয়ের আওতায় থাকা ভোটারদের মধ্যে ৫২.৪ শতাংশই নারী। তফসিলি জনজাতির আসনগুলোতে এই হার ৫৩.৪ শতাংশ। এই অবস্থায়, প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য তাঁদের অন্যান্য দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নারী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে তাঁরা পুরুষদের চেয়ে বেশি হারে ভোট দিয়েছেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, এসআইআরের কারণেই ৯১ লাখের বেশি মানুষ তাদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেছে। এটি এমন এক অবস্থা তৈরি করেছে, যার ফলে একদিকে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পরিচয় হারানোর শঙ্কা রয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গের পুরো রাজনৈতিক জনমিতিকেই বদলে দিতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দুই মাসে গড়াতে চলল। এরই মধ্যে এক দফার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মধ্যে একবার আলোচনার টেবিলেও বসেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যস্থতায় ছিল পাকিস্তান। কিন্তু সে আলোচনা ফলপ্রসূ তো হয়ইনি, বরং যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করেছে।
২ ঘণ্টা আগে
আজকের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে একটা ব্যতিক্রমী সংবাদ ছাপা হয়েছে। দেশে যখন প্রচণ্ড দাবদাহ চলছে এবং জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকেরা ভালোভাবে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না, সেই সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ের মোলানী গ্রামের সোলেমান আলীর উদ্ভাবিত...
২ ঘণ্টা আগে
গান ছেড়ে দিয়ে লিখতে বসেছিলাম। লোপামুদ্রা মিত্রের গান। আমার প্রিয় শিল্পী। লিখতে লিখতে টের পাই, পরিচিত গানগুলো শিল্পী গেয়ে ফেলেছেন। এই যেমন ‘মালতী বালিকা বিদ্যালয়’ কিংবা ‘সাঁকো’ অথবা ‘দুবোনের গল্প’। শুনতে থাকি, তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন ‘যে যায়, সে যায়’ কিংবা ‘তর্কে মাতো, তর্কে মাতো’ অথবা ‘এ ঘর যখন ছোট্ট
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ আর শুধু স্বচ্ছ নীল নয়, সেখানে গর্জে উঠছে আধুনিক যুদ্ধবিমান; নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ন্যানো সেকেন্ডে ছুটে চলে, আর নিঃশব্দে আকাশে ভেসে থাকা নজরদারি ড্রোন সুযোগ বুঝে প্রাণঘাতী আঘাত হানে। স্যাটেলাইট, রাডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিপিএস—এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে
১ দিন আগে