Ajker Patrika

একটি মৃত্যুদণ্ড ও ৭১ বছর পর বিচারিক ভুল সংশোধন

নাসিম শামসুজ্জোহা
একটি মৃত্যুদণ্ড ও ৭১ বছর পর বিচারিক ভুল সংশোধন
অত্যাচারী প্রেমিককে হত্যার দায়ে রুথ এলিসকে সাত দশক পর মরণোত্তর ক্ষমা করা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

১৯৫৫ সালের ১৩ জুলাই লন্ডনের হলওয়ে কারাগারে ২৮ বছর বয়সী রুথ এলিসের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর প্রেমিক ডেভিড ব্লেকলিকে গুলি করে হত্যা করেছেন। হত্যাকাণ্ডটি তিনি অস্বীকার করেননি। বিচারও হয়েছিল তৎকালীন প্রচলিত আইনে। জুরি তাঁকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এবং পরিণতি হিসেবে আদালত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন। এ ঘটনার ৭১ বছর পর, ২০২৬ সালের ৮ জুলাই, ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস সরকারের পরামর্শে রুথ এলিসকে মরণোত্তর ক্ষমা করেছেন। এই সিদ্ধান্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত হত্যার অভিযোগ বাতিল করা হয়নি; প্রতীকীভাবে তাঁর মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তন করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার বলেছে, পারিবারিক সহিংসতা, নিপীড়ন এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের যে প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি ঘটেছিল, আধুনিক আইন ও সামাজিক উপলব্ধির আলোকে তার বিচার ভিন্ন হতে পারত।

ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে একই সঙ্গে স্বস্তি ও অস্বস্তি দুটোই রয়েছে। স্বস্তি এই কারণে যে, রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে, আইনসম্মত বিচারেও ত্রুটি থাকতে পারে, কারও জন‍্য তা অন্যায‍্য হতে পারে। আর অস্বস্তি এই কারণে যে, মৃত‍্যুদণ্ড কার্যকর করা ব‍্যক্তির সাজা পরিবর্তন করা হলেও তাঁকে আর জীবিত করা যাবে না। রাষ্ট্র নথি সংশোধন করতে পারলেও কাউকে কবর থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।

রুথ এলিসের ঘটনা তাই মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে মানবসভ্যতার সামনে রাখা একটি মৌলিক প্রশ্ন—মানুষ ও প্রতিষ্ঠান যখন ভুল করতে পারে, তখন রাষ্ট্রকে কি এমন শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া ন্যায়সংগত, যে শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর আর সংশোধন করা সম্ভব নয়?

১৯৫৫ সালের ১০ এপ্রিল রুথ এলিস লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডে একটি পানশালার বাইরে অত‍্যাচারী বয়ফ্রেন্ড ডেভিড ব্লেকলিকে গুলি করেন। প্রত্যক্ষ ঘটনা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু ঘটনার পেছনের মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস ছিল অনেক বেশি জটিল। এলিস দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। গর্ভাবস্থায় এলিসের তলপেটে ডেভিড ব্লেকলি তীব্র আঘাত করার ফলে তাঁর গর্ভপাত হয়েছিল বলেও অভিযোগ ছিল। তাঁকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং মারধরের ঘটনা তৎকালীন বিচারব্যবস্থা যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। বর্তমানে যাকে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ (কোয়েরসিভ কন্ট্রোল) বলা হয়, ১৯৫০-এর দশকে তার কোনো আইনি স্বীকৃতি ছিল না।

বিচারপ্রক্রিয়া মাত্র এক দিনে শেষ হয়েছিল। জুরিবোর্ড খুব অল্প সময়ের মধ্যে রায় দেয়। তৎকালীন আইনে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সাজা নির্ধারণে বিচারকের হাতে কার্যত আইনের বাইরে অন‍্য কোনো কথা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগই ছিল না। মৃত্যুদণ্ড ছিল প্রমাণিত হত‍্যাকাণ্ডের অবশ‍্যম্ভাবী পরিণতি।

পরবর্তী আইনি পরিবর্তনে ব্রিটেনে মানসিক সক্ষমতা হ্রাসজনিত দায় (ডিমিনিশড রেসপনসিবিলিটি) এবং পরে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর (লস অব কন্ট্রোল) মতো প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে। এগুলো হত্যাকে বৈধ করে না, কিন্তু অপরাধ সংঘটনের মানসিক, সামাজিক ও সহিংসতার প্রেক্ষাপট বিবেচনার সুযোগ দেয়।

এখানেই আইন ও ন্যায়বিচারের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। কোনো সিদ্ধান্ত আইনসম্মত হলেই তা সর্বকালের জন্য ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। আইন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার সম্পর্ক ধারণ করে। সময় বদলালে দেখা যায়, যে বিচার একদিন নির্ভুল মনে হয়েছিল, তার ভেতরেও অজ্ঞতা, পক্ষপাত, লিঙ্গবৈষম্য কিংবা সামাজিক নিষ্ঠুরতাও থেকে যেতে পারে।

রুথ এলিসের ক্ষমা রাষ্ট্রীয় অনুশোচনা মাত্র। এলিসের সন্তানদের যে সামাজিক লজ্জা, মানসিক আঘাত ও বিপর্যয় বহন করতে হয়েছে, সরকারি ঘোষণায় তার প্রতিকার হয় না। মৃত্যুদণ্ড শুধু দণ্ডিত ব্যক্তির জীবন নেয় না; পরিবার, সন্তান এবং কখনো কয়েকটি প্রজন্মের জীবনেও তার প্রভাব বিস্তার করে।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আলোচনা আবেগমুক্ত রাখা সহজ নয়। বিশেষ করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, শিশু হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা, সন্ত্রাসবাদ কিংবা গণহত্যার মতো অপরাধে জনমনে কঠোরতম শাস্তির দাবি ওঠা স্বাভাবিক। নিহত ব্যক্তির পরিবার যে অসহনীয় ক্ষতি ও শোকের মধ্য দিয়ে যায়, তা উপেক্ষা করা যায় না। মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা সাধারণত যুক্তি দেন যে কেউ অন্যের জীবন নিলে সে নিজেও জীবনের অধিকার হারায় এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর কখনো সমাজে ফিরে এসে অপরাধ করতে পারবে না।

এসব যুক্তিকেও হালকাভাবে দেখা উচিত নয়। অপরাধীর মানবাধিকারের কথা বলতে গিয়ে নিহত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের অধিকারকে ছোট করে দেখাও ন্যায়বিচার নয়। কিন্তু শাস্তি কি কেবল প্রতিশোধের সংগঠিত রূপ হবে, নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বড়—সত্য অনুসন্ধান, অপরাধ প্রতিরোধ, সমাজের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা? আর মৃত্যুদণ্ডও কি সত্যিই হত‍্যার অপরাধ কমায়?

অপরাধবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনা, দ্রুত তদন্ত, বিশ্বাসযোগ্য বিচার এবং শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ প্রতিরোধে বেশি কার্যকর। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড হিসাব করে, দণ্ডবিধির ধারা পড়ে বা ফাঁসির সম্ভাবনা বিবেচনা করে সংঘটিত হয় না। ক্রোধ, প্রতিশোধ,মাদক, পারিবারিক সংঘাত, মানসিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা তাৎক্ষণিক পরিস্থিতিরমধ্যে অপরাধ ঘটে।

যে দেশে অপরাধ তদন্ত দুর্বল, সাক্ষী সুরক্ষিত নয়, আলামত সংগ্রহে ঘাটতি থাকে এবং বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, সেখানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অপরাধ দমন হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কঠোর শাস্তি দুর্বল বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।

অন‍্যদিকে বিচারিক ভুল হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় আপত্তি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভুল হলে একজন মানুষকে মুক্তি দেওয়া যায়, ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়, অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে ভুল সংশোধন করা যায়। মৃত্যুদণ্ডে সেই সুযোগ নেই।

বিচারকার্য মানুষই পরিচালনা করে। তদন্ত কর্মকর্তা, সাক্ষী বা সংশ্লিষ্টদের ভুল হতে পারে, আইনজীবী অদক্ষ হতে পারেন, ল‍্যাবরেটরি রিপোর্টের ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে, বিচারক আইনের প্রয়োগে ভুল করতে পারেন। বিচারব্যবস্থাও বৈষম্যমুক্ত নয়। দরিদ্র আসামি দক্ষ আইনজীবী পান না; প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহজে সন্দেহভাজন হয়; নারী, সংখ্যালঘু বা অগ্রহণযোগ্য পেশার মানুষের চরিত্র বিচারকার্যে প্রমাণের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।

রুথ এলিসের ক্ষেত্রে তাঁর পোশাক, পেশা, শ্রেণিগত অবস্থান এবং তখনকার সংবাদপত্র রিপোর্ট প্রভৃতি বিচারিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছিল বলেও অনেকে মনে করেন। তাঁকে সহিংসতার শিকার হিসেবে না দেখে একজন অনৈতিক নারী হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিচার তখন আইনে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের প্রচলিত নৈতিক বিচারে পরিণত হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের মূল সমস্যা তাই এর অপরিবর্তনীয় চরিত্র।

মৃত্যুদণ্ডের বিতর্কের কেন্দ্রে আরও একটি দার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্র হত্যাকে অপরাধ বলে, কারণ মানুষের জীবন পবিত্র এবং আইনবহির্ভূতভাবে জীবন কেড়ে নেওয়া অন্যায়। কিন্তু সেই রাষ্ট্রই পরিকল্পিত উপায়ে, নির্ধারিত তারিখে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে একজন হত‍্যাকারীর জীবনাবসান সম্পন্ন করে। রাষ্ট্র কি সেই কাজ করতে পারে, যেটিকে আইনের ভাষায় অপরাধ বলে?

ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য যদি আরেকটি মৃত্যু হয়, তাহলে বিচারব‍্যবস্থা ভুক্তভোগীর শোককে প্রতিশোধের ভাষায় রূপ দেয়। প্রতিশোধ মানুষকে সাময়িক তৃপ্তি দিলেও তা সব সময় ক্ষত সারায় না। অপরাধীর মৃত্যুও নিহত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।

মৃত্যুদণ্ড বিলোপ মানে অপরাধকে ক্ষমা করা নয়। এর অর্থ হত্যাকারীকে মুক্তি দেওয়া নয়। গুরুতর অপরাধে দীর্ঘমেয়াদি বা আমৃত্যু কারাদণ্ড, কঠোর নিরাপত্তা, পুনর্বাসনের সীমিত সুযোগ এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা—সবই থাকতে পারে। মূল পার্থক্য হলো, রাষ্ট্র নিজে আর ইচ্ছাকৃতভাবে জীবন নেবে না।

রুথ এলিসের ফাঁসির ৯ বছর পর, ১৯৬৪ সালে ব্রিটেনে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ১৯৬৫ সালের আইনে গ্রেট ব্রিটেনে হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান করা হয়; ১৯৬৯ সালে এই ব্যবস্থা স্থায়ী হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডে হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ হয় ১৯৭৩ সালে। রাষ্ট্রদ্রোহ ও জলদস্যুতার মতো অবশিষ্ট অপরাধ থেকে মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি অপসারণ করা হয় ১৯৯৮ সালে।

মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পর ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থাও অকার্যকর হয়নি কিংবা হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায়নি। বরং রুথ এলিসের মতো ঘটনা দেশটির আইন সংস্কারে ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫৭ সালের হোমিসাইড অ্যাক্ট হত্যার দায় ও মানসিক সক্ষমতার প্রশ্নে নতুন প্রতিরক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। পরবর্তী দশকগুলোতে পারিবারিক সহিংসতাও জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে আইন আরওঅগ্রসর হয়েছে।

ন্যায়বিচার মানে অপরাধীর দায় নিশ্চিত করা, সমাজকে নিরাপদ রাখা, ভুক্তভোগীর মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা এবং ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধ করা। যদি মৃত্যুদণ্ড না দিয়েও এসব উদ্দেশ্য অর্জন করা যায়, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নটি তাই বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এবং আমরা কেমন সভ্যতা নির্মাণ করতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত