Ajker Patrika

গণতান্ত্রিক ভারতের অগণতান্ত্রিক আচরণ

লাবনী আক্তার কবিতা
গণতান্ত্রিক ভারতের অগণতান্ত্রিক আচরণ
ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন এখনো চলমান। ছবি: এএফপি

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম একটি দেশ। নিজেদের প্রায়ই গণতান্ত্রিক ও উন্নত বলে প্রচার করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি সমীকরণটা একটু বদলে গেছে। ভারতে চলমান সিজেপি-এর আন্দোলন দমাতে সরকারের পদক্ষেপ যেন প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে ভারতের গণতন্ত্র এবং সরকারসহ পুরো সরকারব্যবস্থাকে।

বর্তমান বিশ্বের রাজনীতিই যেন অন্যদিকে যাচ্ছে। ভারতের আন্দোলন শুরু হয়েছিল ছোট একটি কটাক্ষ থেকে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটা মামলার শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের তেলাপোকা বা ককরোচ বলে ঠাট্টা করেন। মূলত তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তেলাপোকার উপদ্রবে মাঝে মাঝে যেমন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তেমনি এই তরুণেরা সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করে তাদের অতিষ্ঠ করে তুলছে এবং এই তারা হলো তেলাপোকা অর্থাৎ পরজীবী প্রাণী। এই কটাক্ষের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। ভারতের সিস্টেমের ব্যর্থতা, তরুণদের ক্ষোভ এখানে তুলে ধরা হতো। কিন্তু এই পার্টি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে যায় যে কিছুদিনের মধ্যেই এর ফলোয়ার সংখ্যা বেড়ে যায় সরকারের আসনে আসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চেয়ে। ফলে ভারত সরকার সিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ভারতে ব্যান করে দেয়।

পরবর্তী সময়ে মেডিকেল ভর্তি (নিট) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এই পর্যায়ে আন্দোলনে যুক্ত হন লাদাখের পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলন কর্মী সোনম ওয়াংচুক। দুই সপ্তাহের বেশি অনশন করার কারণে ৫৯ বছর বয়সী সোনম ওয়াংচুকের অবস্থার অবনতি ঘটলে পুলিশ জোর করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ২০ জুলাই সোনমসহ তাঁরা সংসদ অভিমুখে রওনা দিলে অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে যায়। প্রশাসন বাধ্য হয়ে ইন্টারনেট ও মেট্রোরেল সেবা বন্ধ করে দেয়।

তারপরও আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের কাছাকাছি যন্তর মন্তর চত্বরে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করে, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবু আন্দোলনকারীরা দমে যায়নি, আন্দোলন এখনো চলমান। কিন্তু এখানেই কিছু প্রশ্নের জন্ম নেয়।

১. শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি—শিক্ষামন্ত্রীকে বদলানো হচ্ছে না কেন? যদি ধরি ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মোদি সরকারের মাঝে কোনো ঝামেলা নেই, তাহলে এত দিনে শিক্ষামন্ত্রী বদলে দেওয়ার কথা। কারণ, শিক্ষামন্ত্রী যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস, নির্ভুল ফলাফলের মতো বিভিন্ন কাজে ব্যর্থ হন এবং এর জন্য ২২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, তখন তাঁর মন্ত্রীর চেয়ারে বসার যৌক্তিকতা থাকে না। তাহলে শিক্ষামন্ত্রীকে বদলানো হচ্ছে না কেন? মোদি সরকার কি সত্যিই ভণ্ড আর স্বৈরাচার? নিশ্চয়ই মোদি সরকার জানে, একবার যদি আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তন করা হয় তাহলে জনগণের মাঝে আত্মবিশ্বাস চলে আসবে। তখন তারা সবকিছুর জন্য আন্দোলন করবে। দেখা যাবে তাঁর গদিও উল্টে যাচ্ছে!

২. ভারতের জনসংখ্যা ১৪৭ কোটি। অথচ আন্দোলনে জড়িত হয়েছে ৪-৫ লাখের মতো মানুষ (যদিও অনলাইনে কোটি সমর্থন রয়েছে), যা ০.০৩৪ শতাংশের কাছাকাছি। তাহলে কি ভারতের জনগণ পরিবর্তন চাইছে না? মূলত ভারত একটি অনেক বড় রাষ্ট্র, তাই চাইলেই এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে গিয়ে আন্দোলন করা সবার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু মানুষ সমর্থন জানাচ্ছে। তারা অনলাইনে সমর্থন জানাচ্ছে, এমনকি তারা ভারতের বিভিন্ন অনলাইন ফুড অ্যাপ থেকে খাবার অর্ডার করে সেই আন্দোলনস্থলে পাঠাচ্ছে। যে খাবার পাঠাচ্ছে সে জানে না কার কাছে খাবার যাবে, যে খাচ্ছে সেও জানে না কে খাবার পাঠিয়েছে। এ থেকেই মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কতটা, তা বোঝা যায়।

৩. ভারতের আন্দোলন কি নতুন কোনো পরিবর্তন আনবে? কারণ, এর আগেও এমন অনেক আন্দোলন দেখা গেছে কিন্তু ফলাফলশূন্য। এর উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। আগে জেনে নিই কী কী কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে।

ভারত জাতিগতভাবে খুবই ধর্মভীরু একটা দেশ। বছরের পর বছর ধরে শুধু ধর্মকে পুঁজি করে এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন চলে আসছে। অথচ জনগণ যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। যেই দেশের জনগণ শুধু ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো দলকে ভোট দিয়ে তার গণতান্ত্রিক অধিকারের বহিঃপ্রকাশ করে, তখন বুঝে নিন তাদের আন্দোলন সফল হবে না।

এই আন্দোলন যখন আরও বেগবান হবে, তখন ভারতের মোদি মিডিয়ায় খবর আসবে, ‘অমুক প্রদেশে হিন্দুধর্মের কাউকে জোর করে গরুর মাংস খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে কোনো মুসলিম গোষ্ঠী’ অথবা ‘কোনো মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা’, ‘যারা আন্দোলন করছে তাদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি শনাক্ত হয়েছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আর পরিবর্তনের আন্দোলন চলবে না, তখন আন্দোলন হবে মুসলিমমুক্ত ভারত করার। এইভাবে ‘ভাগ কর, শাসন কর’ নীতি ব্যবহার করে বছরের পর বছর জনগণকে ঠকানো হচ্ছে। অথচ ভারতের জনগণ কিছু বোঝার চেষ্টাও করছে না।

এত কিছু পেরিয়ে যদি আন্দোলন সফল হয়, তবে সেটা অলৌকিক কোনো ঘটনা হবে!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত