Ajker Patrika

পিগমি জীবনদর্শন: আধুনিক সভ্যতার পাঠ

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮: ০৮
পিগমি জীবনদর্শন: আধুনিক সভ্যতার পাঠ
ইতুরি বনের পিগমিরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যতের মডেল। ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার জায়ারের ইতুরি বনের এমবুটি পিগমিরা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন মানবগোষ্ঠী। শারীরিকভাবে তারা ক্ষুদ্রকায় হতে পারে, কিন্তু তাদের জীবনদর্শন এবং সামাজিক কাঠামোর বিশালতা আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত ‘উন্নত’ সভ্যতাকেও হার মানায়। অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ শতাব্দী থেকে মিসরের ফারাওদের নথিপত্রে তাদের উপস্থিতির কথা জানা যায়।

সাড়ে চার হাজার বছর ধরে কোনো রাজপ্রাসাদ, পিরামিড বা পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ না করেও তারা একটি অত্যন্ত পরিশীলিত সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে। নৃবিজ্ঞানী কলিন টার্নবুল এবং সংগীত নৃতত্ত্ববিদ টিমোথি ফেরিসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই মানুষগুলো প্রমাণ করেছে, শক্তির প্রকৃত রূপ যান্ত্রিক আস্ফালনে নয়, বরং প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে নিবিড় ভারসাম্যের মাঝে নিহিত। তাদের জীবনদর্শন—‘স্বীকার করে নেওয়া’ এবং ‘সহযোগিতা’—আজকের অস্থির ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের জন্য অপরিহার্য এক শিক্ষা।

বর্তমান বিশ্ব যখন ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের মেরুকরণে বিপর্যস্ত, তখন পিগমিদের সমাজ পরিচালনা পদ্ধতি এক অনন্য পথপ্রদর্শক। তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকার, রাজা বা পুরোহিত নেই। তারা যেকোনো বিবাদ মিটিয়ে নেয় বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে। পিগমি শিশুদের ‘চারাগাছের খেলা’ তাদের পুরো সমাজের একটি জীবন্ত রূপক। ছয়-সাতটি শিশু একটি তরুণ চারাগাছে চড়ে বসে যতক্ষণ না সেটি মাটি স্পর্শ করে। যদি কেউ সাহসের আতিশয্যে বেশি সময় ধরে রাখে, তবে সে ছিটকে পড়ে, আবার কেউ আগে লাফ দিলে খেলাটিই নষ্ট হয়ে যায়।

এই সাধারণ খেলা আমাদের শেখায়, উন্নয়ন মানে একা এগিয়ে যাওয়া নয়। আধুনিক বিশ্ব আজ যে আকাশচুম্বী বৈষম্যের শিকার, তা এই ভারসাম্যের অভাবেরই ফল। পিগমিরা বিশ্বাস করে, সমাজের উন্নতিতে সবাইকে সমানতালে চলতে হবে। কেউ অতি-সাহস দেখিয়ে খুব এগিয়ে যেতে চাইলে কিংবা কেউ খুব পিছিয়ে পড়লে পুরো দলের সামাজিক নিরাপত্তা ও ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাদের কাছে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, বরং সমন্বয়।

বর্তমান জলবায়ু সংকটের মূলে রয়েছে মানুষকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বের কোনো সত্তা ভাবার অহংকার। আমরা প্রযুক্তি দিয়ে প্রকৃতিকে শাসন করতে চেয়েছি, ফলে আজ আমরা বিনাশের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে, পিগমিরা অরণ্যকে জয় করতে চায় না, বরং তারা অরণ্যেরই অংশ হয়ে থাকতে চায়। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নেই; অরণ্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাই তাদের উপাসনা।

বনের রাত নিয়ে গাওয়ার সময় তারা বলে—‘যদি অন্ধকার থাকে, তবে সেই অন্ধকারই ভালো।’ কথাটি তাদের গভীর জীবনবোধের পরিচয় দেয়। তারা অপ্রিয় সত্য বা কঠিন পরিস্থিতিকে ঘৃণা না করে সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখে। প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই তাদের টিকে থাকার মূলমন্ত্র। আধুনিক মানুষ যখন কৃত্রিমভাবে পরিবেশ পরিবর্তনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন পিগমিদের এই ‘প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি’ করার নীতি আমাদের টেকসই জীবনযাপনের পথ দেখায়। তারা সাড়ে চার হাজার বছর ধরে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই টিকে আছে; কারণ, তারা প্রকৃতির সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়ায়নি।

সংগীতের হকেট পদ্ধতি

এমবুটিদের সংগীতশৈলী কেবল সুরের বিন্যাস নয়, এটি তাদের সামাজিক সংহতির এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তারা ‘হকেট’ পদ্ধতিতে গান গায়, যেখানে প্রতিটি গায়ক মাত্র একটি নির্দিষ্ট ‘নোট’ গাওয়ার দায়িত্ব পান। বিচ্ছিন্নভাবে শুনলে এটি অর্থহীন মনে হতে পারে, কিন্তু সাত-আটজন যখন নিখুঁত টাইমিংয়ে নিজেদের নোটটি উচ্চারণ করেন, তখন একটি অবিশ্বাস্য দ্রুত ও জটিল সুর আবর্তিত হতে থাকে।

এটি প্রমাণ করে যে একক কৃতিত্বের চেয়ে সমষ্টিগত প্রচেষ্টায় অনেক বেশি সুন্দর কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব। ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডে তাদের ‘দীক্ষাদান সংগীত’ (ইনিশিয়েশন সং) রাখার মূল কারণই ছিল মহাবিশ্বকে এটি জানানো যে, মানুষ শুধু যন্ত্র দিয়ে গান বানায় না, বরং নিজের শরীর ও সমাজকে ব্যবহার করেও জটিল সুর সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানের বৈশ্বিক সংকট; যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন—সমাধানে আমাদের এমন ছোট ছোট সঠিক উদ্যোগের নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন।

প্রযুক্তির ঊর্ধ্বে সংস্কৃতি

টিমোথি ফেরিস লক্ষ করেছেন, এমবুটিরা খুব কমসংখ্যক কৃত্রিম বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। অরণ্যকে তাদের বাদ্যযন্ত্র মনে করে। গাছের গুঁড়িতে বা পাতায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা নিজেদের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনিকে তারা কৌশলে গানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অর্থাৎ, অরণ্যও তাদের গানের একজন জীবন্ত শিল্পী। যেখানে অন্য সভ্যতাগুলো বিশাল মন্দির কিংবা পিরামিড বানিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়, এমবুটিরা তা করে তাদের গানের মাধ্যমে। তাদের সংগীতই তাদের ‘অদৃশ্য স্মৃতিস্তম্ভ’। তাদের গানের নিবিড় হারমোনি এবং নাচের সময় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের শরীরের ভাষা—সবই সমাজের গভীর বন্ধনের প্রকাশ।

নৃবিজ্ঞানী কলিন টার্নবুলের মতে, এমবুটিরা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও (তাদের এমনকি পাথরের বা লোহার অস্ত্রও নেই) সামাজিক এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তায় তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। আধুনিক সভ্যতায় আমরা পারমাণবিক বোমার নিয়ন্ত্রণ শিখলেও নিজেদের রাগ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের তিক্ততা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখিনি। আমরা নিয়ম, আইন আর প্রযুক্তির পেছনে এতই অন্ধভাবে ছুটে চলেছি যে মানুষের প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক ভালোবাসা কিংবা সহমর্মিতা; সেটি হারিয়ে ফেলছি।

পিগমিদের কাছে সমাজ মানেই হলো একে অপরের প্রতি খেয়াল রাখা। প্রযুক্তিগত উন্নতি আর মানবিক উন্নতি যে এক কথা নয়, এমবুটিরা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তারা আমাদের চোখে ‘আদিম’ হতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং পুরো সমাজের মঙ্গল সাধনের জন্য সেই সম্পর্কগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার দিক থেকে তারা সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী।

বর্তমান মানবজাতি এক ‘প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকাল’ পার করছে। একদিকে আমাদের ক্ষমতা অসীম, অন্যদিকে আমাদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমবুটিরা কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই স্মৃতিস্তম্ভহীন এক সুশৃঙ্খল সভ্যতা গড়েছে; যেখানে আনন্দ নিহিত শুধু গল্প বলা, গান আর নাচে। তাদের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, মানুষের প্রকৃত সুখ কৃত্রিম সম্পদে নয়, বরং পারস্পরিক নিবিড় বন্ধনে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীতে।

ভবিষ্যতের জন্য আদিম শিক্ষা

ইতুরি বনের পিগমিরা ইতিহাসের কোনো এক প্রান্তে থমকে থাকা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যতের মডেল। টিকে থাকার জন্য আমাদের আরও বড় মন্দির কিংবা আরও দ্রুততর প্রযুক্তির চেয়ে বেশি প্রয়োজন একে অপরের হাত ধরে চারাগাছটি নুইয়ে দেওয়ার সেই অমোঘ একতা। তাদের সেই আদিম সুর আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যদি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হই, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরাই পরাজিত হব। যদি ‘অন্ধকারকেও ভালো’ বলে গ্রহণ করতে শিখি এবং প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতাকে বেছে নিই, তবেই মানবসভ্যতা পরবর্তী কয়েক হাজার বছর টিকে থাকার সামর্থ্য অর্জন করবে। এমবুটিদের সেই ‘দীক্ষাদান সংগীত’ আসলে পুরো পৃথিবীর জন্যই এক নতুন দীক্ষার আহ্বান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত