
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা আমাদের সবার জানা। সেদিন যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই আন্দোলনকে আমরা ভাষা আন্দোলন বলি। এবং সেই যে আন্দোলন হয়েছিল, তা কোনো দুর্ঘটনার জন্য হয়নি, কারও ব্যক্তিগত ভুলের জন্য ঘটেনি। কেননা আন্দোলন অনিবার্য ছিল। শাসক এবং শাসিতের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্বের একটা প্রকাশ হলো আন্দোলন।
এটাও আমরা জানি। কিন্তু আমরা যখন একে ভাষা আন্দোলন বলি, তখন এ কথা তো ভুলি না যে ভাষার যতই মূল্য থাকুক, ভাষা শেষ পর্যন্ত চিহ্নমাত্র এবং যারা ভাষা ব্যবহার করে, তাদের ওপরই ভাষার উৎকর্ষ নির্ভর করে। ভাষার জন্য আন্দোলন তো আসলে জীবনের বিকাশের জন্যই আন্দোলন ছিল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে, তখনো এই আন্দোলন থেমে যায়নি।
আমরা এ-ও জানি, যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তখনো এই আন্দোলন থামেনি, এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতিসত্তার ওপর যে নিপীড়ন চলছিল, তা থেকে মুক্তির আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছিল এবং সেই আন্দোলনের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল।
কিন্তু আজকেও, স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে একটা নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পরেও, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, একুশে ফেব্রুয়ারি আজকেও আমাদের কাছে আবেদন জানায়, আজকেও আমাদের ডাকে, আমাদের মনে এক অনুভূতির সৃষ্টি করে। কেন করে? সে কি শুধু এ কারণেই করে যে বাংলা ভাষা শিক্ষার সর্বস্তরে প্রযুক্ত হয়নি? সে কি শুধু এই কারণেই করে যে বাংলা ভাষা সরকারি সকল কার্যে ব্যবহৃত হচ্ছে না? মনে হয়, তার চেয়ে বড় তাৎপর্য এখানে আছে। আর সেটি হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল শাসকশ্রেণির নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের নিপীড়নবিরোধী যে চেতনা, তার প্রকাশ লাভ করেছিল। সে জন্যই নিপীড়ন যত দিন আছে, নিষ্পেষণ যত দিন থাকছে, অন্যায় যত দিন চলবে, তত দিন তো মনে হয় একুশে ফেব্রুয়ারি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে থাকবে।
একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন মধ্যবিত্ত তরুণেরা করেছিল। কিন্তু আন্দোলনের মূল শক্তি কোথা থেকে এসেছিল? আন্দোলন যত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যত দিন রমনা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, তত দিন প্রবল ছিল না। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই গুলি চালনার দিনে যখন এই আন্দোলন রমনা পার হয়ে পুরান ঢাকায় এসে পৌঁছেছিল, যখন পুরান ঢাকা পার হয়ে সমগ্র বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে পৌঁছে গেল, যখন এই আন্দোলনে কৃষকের বিক্ষোভ যুক্ত হলো, শ্রমিক অসন্তোষ এর সঙ্গে মিশে গেল, যখন রিকশাওয়ালা এসে যোগ দিল, যখন নিম্নমধ্যবিত্ত এর সঙ্গে যুক্ত হলো, তখনই সে অত্যন্ত প্রবল হলো। দুর্দমনীয় হয়ে উঠল।
এর আগে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা একবার আন্দোলন করেছিলেন বেতনের জন্য, বায়ান্ন সালের আগেই, কিন্তু সেই আন্দোলন সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি এবং পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়েও যায়নি। কেন যায়নি? পুলিশের
ওপর কম নির্যাতন হয়নি, পুলিশকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আন্দোলন বিস্তৃত হলো না এ জন্য যে তা সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে। এবং এই যে একুশের আন্দোলন এত প্রবল হলো, দুর্দমনীয় হলো, সে যে এত দূর এগিয়ে এল, তার কারণ হচ্ছে এর সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সব মানুষের বিক্ষোভ জড়িত ছিল।
আমরা যদি আজকে একুশে ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়ে আমাদের পুরোনো ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব একুশে ফেব্রুয়ারির এই যাত্রাপথ ধরে নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছে, নতুন সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা জানি। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া প্রবল হয়েছে, সেটিও জানি। কিন্তু এককভাবে এগুলোর কোনোটা একুশের একক অবদান নয়।
একুশের মূল সৃষ্টি চিহ্নিত করতে হলে বলতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারি একটি চেতনার নাম। এবং সেই চেতনাকে চিহ্নিত করতে চাইলে তার পরিচয় দিতে হবে কতগুলো লক্ষণ দ্বারা; সে ছিল ইহজাগতিক, ছিল গণতান্ত্রিক, সে চেতনা ছিল অন্যায়বিরোধী, বিদ্রোহী। এবং সর্বোপরি সে ছিল সৃজনশীল। এই যে ইহজাগতিকতা, গণতান্ত্রিকতা, এই যে বিদ্রোহের চেতনা, এই যে সৃজনশীলতা—এর সবকিছু একত্র করেই একুশের পরিচয়। এতকাল আমাদের অনুভূতিগুলো নানা প্রকার আধ্যাত্মিক পথে বিচারণ করত। ধর্ম ছিল আমাদের একটা বড় সাংস্কৃতিক উপাদান। সেখানে ভাষা এসে বস্তুজগৎ এবং চারদিকের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন করল। এবং যে গণতান্ত্রিক চেতনা এল, সেটা অসাম্প্রদায়িক চেতনা। আগে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভাগাভাগি ছিল।
হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানগুলো আলাদা, প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা এবং তারা আলাদা থাকত। একুশে ফেব্রুয়ারি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ভেঙে দিল। সব মানুষের গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করল। একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যায়ের, শোষণের এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল! এই সবকিছুকে, এই ইহজাগতিকতাকে, গণতান্ত্রিকতাকে, বিদ্রোহকে সম্মিলিত করে সে একটা নতুন সৃজনশীলতার জন্ম দিল। সেই সৃজনশীলতার পথ ধরেই আমরা দেখেছি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ওই পথেই দেখেছি যে আমরা আরও এগোতে পারছি, একটা নতুন সমাজব্যবস্থা চাচ্ছি, একটা নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে যাচ্ছি। কাজেই একুশের প্রধান সৃষ্টি কোনো সংগঠন নয়, কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। কোনো একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা তাকে দেখব না। সে একটা নতুন চেতনার সৃষ্টি করেছিল। সেই চেতনা সৃষ্টিমুখর।
একুশে ফেব্রুয়ারি আরও একটা কাজ করেছে, তা হচ্ছে এই, সে একটা বিভাজনের রেখা আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিভাজনটা হচ্ছে আলোর সঙ্গে অন্ধকারের। এ হচ্ছে তারুণ্যের সঙ্গে বার্ধক্যের, প্রগতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার বিভাজন। এবং সেইখানে দাঁড়িয়ে আলো এবং অন্ধকার, তারুণ্য এবং বার্ধক্য, প্রগতি এবং প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়ে গেছে, একুশের মানদণ্ডে।
একুশে ফেব্রুয়ারি তারুণ্য ও বার্ধক্যকে আলাদা চিহ্নিত করে। তারুণ্য এখানে বয়সের নাম নয়, তারুণ্য এখানে শক্তির নাম। আর তারুণ্যের গুণ যে সৃজনশীলতা, একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেই গুণে গুণান্বিত। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা দুঃসাহস দেখেছি মানুষের, দুঃসাহস দেখেছি তারুণ্যের।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা সৃজনশীলতা দেখেছি তারুণ্যের। সেই জন্য তারুণ্যের চিহ্নে তাকে চিহ্নিত করতে চাই। এবং আমরা তখনই দুঃসাহসী হই, যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, যেমন আমরা একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি। আমরা যখন আলাদা, বিচ্ছিন্ন, যখন পরস্পর পরস্পরের শত্রু, তখন আমরা সবাই ভীরু, তখন সবাই সন্ত্রস্ত। যখন আমরা সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, যখন আমরা এক হতে পারি, যখন আমাদের চেতনা একসঙ্গে গ্রথিত হয়, তখনই আমরা দুঃসাহসী হয়ে উঠি। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেই দুঃসাহসকে আমরা দেখেছি। কাজেই আবার আমরা দুঃসাহসী হতে পারব, যখন আমরা সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারব।
একুশে ফেব্রুয়ারি একটা প্রশ্ন রাখে আমাদের সবার সামনে। আর তা হলো—আমরা কে কোন পক্ষে? আলোর, নাকি অন্ধকারের? যদি আলোর পক্ষ হই, তাহলে কি আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? দায়িত্ব পালন না করলে দেশ কেমন করে এগোবে। প্রশ্নটা শুরুতে ছিল, এখনো আছে, আর থাকবে আগামীকালও।

একটা সমাজে বাস করলে একজনের সঙ্গে আরেকজনের মনোমালিন্য হওয়াটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তার জের ধরে কাউকে হত্যা করা বর্বরতার শামিল। আমরা আদিম সমাজ থেকে সভ্য সমাজে প্রবেশ করেছি। কিন্তু আধুনিককালে এসেও যখন সেই আদিমতার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পেরেছি?
২ ঘণ্টা আগে
আফ্রিকার জায়ারের ইতুরি বনের এমবুটি পিগমিরা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন মানবগোষ্ঠী। শারীরিকভাবে তারা ক্ষুদ্রকায় হতে পারে, কিন্তু তাদের জীবনদর্শন এবং সামাজিক কাঠামোর বিশালতা আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত ‘উন্নত’ সভ্যতাকেও হার মানায়। অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ শতাব্দী থেকে মিসরের ফারাওদের নথিপত্রে তাদের উপস্থিতির...
২ ঘণ্টা আগে
সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি—বাংলাদেশের জনজীবনে এই দুটি শব্দ বহু বছর ধরেই একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার আসে, সরকার যায়; মন্ত্রিসভা বদলায়, নীতির ভাষা বদলায়; কিন্তু মহাসড়কের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায় না। বরং অনেক সময় পরিস্থিতি আরও জটিল ও দুঃসহ হয়ে ওঠে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে যাচ্ছি, অন্যদিকে সেই সাফল্যের পেছনে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে অধিক ফলনের আশায় জমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির স্বাভাবিক শক্তিকে ক্ষয় করেছে।
১ দিন আগে