নানা জল্পনাকল্পনার পর অবশেষে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হবে। আশা করা যায় কয়েক দিনের মধ্যে দেশের মানুষ একটা নতুন সরকার দেখতে পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার জনগণের চাওয়া কতটুকু পূরণ করতে পারবে? কারণ, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশার পারদ উচ্চে পৌঁছেছিল, সেটা যদি আবার নিষ্প্রভ হয়ে যায়, তাহলে দেশের মানুষ সেটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরে মানুষের মনে যে আশা জেগেছিল, সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে প্রথম বিদেশ সফরে গেলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পরবর্তী সময়ে চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিগত সরকারগুলোর মতোই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে এ সরকারের ক্ষেত্রেও। তাই বলা যায়, নানা ক্ষেত্রে এ সরকার সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পরিচয়ই দিয়েছে।
অস্বীকার করার সুযোগ নেই, জুলাই আন্দোলন এ দেশের মানুষের মনে নতুনভাবে আশাবাদের সঞ্চার করেছে। নতুন সরকার যদি সে জায়গায় ভুল কিছু করে তাহলে মানুষ যে নীরব আর থাকবে না, সেটা জনগণের ভাষায় বোঝা যায়।
বিগত স্বৈরশাসনের সময়ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে মানুষ তা সহজে মেনে নেবে না। হাসিনা সরকার একদিকে উন্নয়নের কথা বলে মেগা প্রকল্প করে মহা দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক আধিপত্য আর দলীয়করণ করে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করেছে মানুষকে ভোট থেকে বঞ্চিত করে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেছে। ফলে শিক্ষার্থী-জনতা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। জুলাই আন্দোলন দেশের মানুষের মধ্যে সাহসের সঞ্চার করেছে। এ কারণে তারা আর কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে মেনে নেবে না। সে জন্য নতুন সরকারকে অনেকগুলো চালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের দিকে পথ বাড়াতে হবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ক্রাইসিস গ্রুপের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মতে, পাঁচটি প্রধান বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। সেখানে অভ্যন্তরীণ বিষয়ের চেয়ে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বেশি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো বৈশ্বিক বিষয়ের চেয়ে অভ্যন্তরীণগুলোই বেশি প্রকট। তাই নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের প্রধান সমস্যা এখন অর্থনৈতিক খাত। একটি দেশের চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ না হলে মানুষ ভালো থাকতে পারে না। অতীতের কোনো সরকারই মানুষের সামান্য মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারেনি। জনগণ আশাহত হয়েছে। এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে তাই মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিন্তু নির্বাচনের পর নতুন সরকারের ওপর অর্থনৈতিক দৈন্যের নানা চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আশা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেনি। বিনিয়োগ সম্মেলন, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েও কোনো সাফল্য আসেনি। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের অনেক কারখানা সচল রাখতে সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগ করেছে মালিকপক্ষ। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে চালু কারখানা বন্ধের নজিরও রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় তিন হাজার ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ছোট ছোট ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে।
ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার। ফলে তারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘সুখকর’ কোনো পরিস্থিতি পাচ্ছে না। প্রথমেই আসবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত এ হার ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। নির্বাচনের কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ায় বর্তমানে এ হার আরও বাড়তে পারে। রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণেও মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে টানা ছয় মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর হয়ে আছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এ খাতকে চাঙা করাটা নতুন সরকারের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ।
জ্বালানি সমস্যা আমাদের নতুন নয়। আমদানিনির্ভরতার কারণে এ খাতের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মূলত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি কোম্পানিকে বেশি মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য জ্বালানি আমদানি করতে দেওয়া হয়েছে। একদিকে জ্বালানি আমদানির কারণে এ খাত ধ্বংসের কিনারে চলে গেছে, অন্যদিকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে জ্বালানি খাতের সংকট না কমে বেড়ে চলছে।
পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলে অনেক বেসরকারি কোম্পানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অনেক কোম্পানি কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে শুধু বসে বসে সার্ভিস চার্জ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। মূলত দেশে কোনো জনবান্ধব জ্বালানিনীতি না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান বাড়াতে হবে।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীকে সে মাত্রায় সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত এ বাহিনীকে ভঙ্গুরই বলা যায়। এরপর জরুরি হলো পুরো রাষ্ট্রকাঠামোতে ক্রিয়াশীল দলীয়করণের ছায়া মুছে ফেলা। বিগত সরকারের সময়ে প্রায় প্রতিষ্ঠিত দলীয়করণের ছাপ লাঘব করতে না পারলে, ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ এই মূল সংকটগুলো মোকাবিলা করার পাশাপাশি নতুন সরকারকে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে। রাষ্ট্রটি কার জন্য, কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই প্রশ্নকে শুধু উচ্চারণই করেনি, রাষ্ট্রের সামনে তার উত্তর দেওয়ার দায়ও চাপিয়ে দিয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি ক্ষমতা, রাষ্ট্রযন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নগুলোকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ফলে নতুন সরকারের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটির সঙ্গে আরেকটি গভীরভাবে সংযুক্ত।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট গ্রুপের দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। এ বছরের সূচক এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তার আগের বছরে বিশ্বজুড়ে ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রচর্চার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এসব দেশের মধ্যে
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত’ নির্বাচন। এই নির্বাচনের নির্ণায়ক বা নির্ধারক ভূমিকায় তরুণেরা। গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে
৪ ঘণ্টা আগে
আজ জাতীয় নির্বাচন। বহু ঘটনা-অঘটনের মধ্য দিয়ে দেশ আজ নির্বাচনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে দেশের জনগণ আজ তাদের রায় জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে। আজকের দিনটিতে দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসবে। তারই অপেক্ষায় রয়েছে মানুষ
৪ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রভাষার বিষয়টা তো দ্বন্দ্বেরই ঘটনা একটা। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব। বাংলা ভাষার কপালেই ছিল এটা যে, একেবারে শুরু থেকেই তাকে যুদ্ধ করে এগোতে হবে; যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। রাষ্ট্র কখনোই তার পক্ষে ছিল না। এত শত বছর পরে, হাজার বছরের ইতিহাস পার হয়েই...
১ দিন আগে