Ajker Patrika

নতুন এক যুগের সূচনা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
নতুন এক যুগের সূচনা
বিশ্বজুড়ে আজ ফিলিস্তিন ও ইরানের পক্ষে মানুষের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ছবি: এএফপি

ইতিহাসের পাতায় মাঝেমধ্যে এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যখন বাতাসের গন্ধে পরিবর্তনের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, যখন মজলুমের দীর্ঘশ্বাস আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বিস্ফোরিত হয়। গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে-বাতাসে সেই মহাবিপ্লবের পদধ্বনি শোনা গেছে। মার্কিন-ইসরায়েলি সাম্রাজ্যবাদের যে দম্ভ একসময় অপরাজেয় মনে হতো, ইরানের অকুতোভয় প্রতিরোধের মুখে তা আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

এটি কেবল একটি সামরিক জয় নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক বিজয়। কবি নজরুল যেমন বলেছিলেন, ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।’ ইরানের এই জাগরণ যেন সেই উৎপীড়িতের পক্ষে এক চরম জবাব, যা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে—নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ক্ষুদ্র ডেভিড মহাকায় গোলিয়াথের দম্ভ চূর্ণ করে দেয়। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আমরা তেমনই এক দৃশ্যপটের সাক্ষী হচ্ছি। দীর্ঘদিনের মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসন, অবরোধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ইরান আজ এক অপরাজেয় শক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কেবল একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক প্রতিরোধ। বিশ্লেষকেরা একে দেখছেন ‘নতুন যুগের শুভসূচনা’ হিসেবে, যেখানে পশ্চিমা আধিপত্যের সূর্য অস্তমিত হয়ে পুব আকাশে উদিত হচ্ছে প্রতিরোধের নতুন সূর্য।

২. একসময়ের দাম্ভিক নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আসা ইরানের কৌশলগত বিজয়ের সবচেয়ে বড় আলামত। যে হাত একসময় অবরোধের খড়্গ চালাত, আজ সেই হাত সন্ধির জন্য প্রসারিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে তেহরানের শক্তিমত্তা এখন হোয়াইট হাউসের হিসাবনিকাশ বদলে দিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির ধমনি বলে পরিচিত হরমুজ প্রণালি আজ ইরানের একক কর্তৃত্বের অধীনে। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে সাম্রাজ্যবাদী নৌযানগুলো প্রবেশের আগে হাজারবার ভাবছে। হরমুজ প্রণালি রক্ষা করতে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মিত্রদের সহযোগিতা চাওয়া প্রমাণ করে যে আমেরিকার একক আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। ‘একক সুপারপাওয়ার’ আজ তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় অন্যদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মাগছে।

ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী যারা একসময় স্থলযুদ্ধের হুমকি দিত, তারা আজ লেজ গুটিয়ে পালানোর পথ খুঁজছে। ইরানের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ দেখে তারা বুঝতে পেরেছে, মাটির লড়াইয়ে নামলে তাদের জন্য কেবল কফিন অপেক্ষা করছে।

আক্রমণের শিকার হওয়ার পরও পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর এই নীরবতা ইরানের আধিপত্যের এক নীরব স্বীকৃতি। তারা বুঝতে পেরেছে, আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলা আত্মঘাতী। তেহরানের মিম্বর থেকে যে হুংকার শোনা যাচ্ছে, তা কেবল শব্দ নয়, তা এক অমোঘ সত্যি। এই গর্জন আজ আটলান্টিকপারের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং বিশ্ববাসীকে জানান দিচ্ছে যে সিংহের খাঁচায় খোঁচা দেওয়া কতটা বিপজ্জনক।

বিশালকায় মার্কিন রণতরিগুলো, যেগুলোকে ভাসমান দুর্গ বলা হতো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে আজ দিগন্তের ওপারে পালিয়ে যাচ্ছে। এটি আধুনিক নৌযুদ্ধের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃশ্য।

বিশ্বজুড়ে আজ ফিলিস্তিন ও ইরানের পক্ষে মানুষের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা ভেঙে মানুষ আজ বুঝতে পারছে যে ইরানই হচ্ছে জালিমের বিরুদ্ধে একমাত্র রুখে দাঁড়ানো শক্তি।

কেবল আমেরিকা নয়, সমুদ্রের ওপারে ইউরোপের দেশগুলোও আজ ভয়ে তটস্থ। ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা তাদের রাজধানীতে পৌঁছে গেছে জেনে তারা আজ কূটনৈতিক আলোচনার জন্য মরিয়া।

যে ইসরায়েল অন্যকে গৃহহীন করত, আজ তাদের পুরো জনগোষ্ঠী বাংকারের অন্ধকারে দিনাতিপাত করছে। এটি একটি জাতির মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের চূড়ান্ত লক্ষণ।

ইরান কেবল যুদ্ধের ময়দানে নয়, প্রযুক্তির লড়াইয়েও পশ্চিমাদের পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাদের জ্যামিং সিস্টেম এবং সাইবার হামলা শত্রুর রাডারগুলোকে অন্ধ করে দিয়েছে, যা এক অলৌকিক বিজয়ের সমান।

৩. ইরান বলেছিল তারা ‘ক্র্যাশিং’ বা চূর্ণবিচূর্ণ করার মতো জবাব দেবে এবং তারা তা করে দেখিয়েছে। মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হেনে তারা প্রমাণ করেছে, তাদের শব্দগুলো ফাঁপা বুলি ছিল না।

শত্রুর সুরক্ষিত ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানা ছিল বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। এটি প্রমাণ করেছে যে কোনো ‘আয়রন ডোম’ বা ‘থাড’ ইরানি সংকল্পকে রুখতে পারবে না। ইরানি প্রযুক্তির ক্লাস্টার বোমাগুলো শত্রুর সামরিক অবকাঠামোকে তছনছ করে দিয়েছে। এটি ছিল শত্রুর দম্ভের ওপর এক বজ্রাঘাত।

আমেরিকা যখন দেখল ইরান সরাসরি তাদের ঘাঁটিতে হামলা করতে দ্বিধা করছে না, তখনই তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই মানসিক দৃঢ়তাই ইরানকে জয়ী করেছে। আক্রমণের পর ইরান মুহূর্তকাল দেরি না করে যে পাল্টা আঘাত হেনেছে, তা শত্রুকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। এই ক্ষিপ্রতাই যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়।

কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি বিশ্ববাজারে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তা আমেরিকাকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। ইরানি সাইবার ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে ইরান একক আধিপত্য বজায় রেখেছে। ইরানের তৈরি ‘কামিকাজে’ ড্রোনগুলো শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কম খরচে বিধ্বংসী এই ড্রোনগুলোই আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে।

শত্রুর যেকোনো সহযোগীকে সরাসরি হামলার মাধ্যমে এবং পুনরায় শত্রুদের সহযোগিতা করলে হুমকি দিয়ে ইরান তার প্রতিবেশীদের নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য করেছে, যা শত্রুকে একঘরে করে ফেলেছে। হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে ইয়েমেনের হুতি—ইরানের মিত্ররা চতুর্মুখী আক্রমণ চালিয়ে শত্রুকে দিশেহারা করে দিয়েছে। এটি ছিল এক নিপুণ সমরকৌশল।

ইরানের এই বিজয় কেবল একটি দেশের জয় নয়, এটি বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণা। এটি প্রমাণ করে, যদি লক্ষ্য স্থির থাকে এবং আত্মত্যাগ করার মানসিকতা থাকে, তবে আধুনিক আবরাহাদের আবাবিল পাখি দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব। ইরানের এই অগ্রযাত্রা থামার নয়; এটি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা, যেখানে শক্তির চেয়ে সত্যের জয় হবে অনিবার্য। আজ বিশ্বের প্রতিটি কোণে যারা শোষিত, তারা ইরানের দিকে তাকিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখছে। এই বিজয় নতুন এক যুগের সূচনা করল, যেখানে কোনো একক পরাশক্তি বিশ্বের ভাগ্যবিধাতা হতে পারবে না। ইরানের এই বিজয়গাথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা হয়ে থাকবে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন, প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত