Ajker Patrika

আধুনিক নগরসভ্যতার অভিশাপ বায়ুদূষণ

ফারজানা আক্তার
আধুনিক নগরসভ্যতার অভিশাপ বায়ুদূষণ
ছবি: আজকের পত্রিকা

ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। অথচ শহরটি যেন আধুনিক নগরসভ্যতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে, যা চারদিকে তাকালেই প্রমাণ মেলে। আকাশজুড়ে ঘন ধোঁয়ার চাদর, যানবাহনের কালো বিষাক্ত ধোঁয়া, কলকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া, নির্মাণ প্রকল্পের ধুলাবালু, যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানো আর অনিয়ন্ত্রিত ধূমপান—সব মিলিয়ে ঢাকাবাসীর জীবনে বায়ুদূষণ যেন নিয়মতান্ত্রিক বিষপান সমতুল্য হয়ে উঠেছে। বায়ুদূষণ বলতে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থের কারণে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াকে বোঝায়। এর বাইরেও বায়ুদূষণের বিভিন্ন কারণ এবং উৎস রয়েছে। তবে ঢাকায় বায়ুদূষণের প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষাবিধি অমান্য করার প্রবণতা ঢাকাকে ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত করছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। যা একে বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহরে পরিণত করেছে। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত যানবাহনব্যবস্থা ও শিল্পকারখানার বিস্তার শহরের বায়ুকে ক্রমেই বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, বিশেষ করে গত বছর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই শীর্ষ তিনের মধ্যে অবস্থান করছে। তবে শীতকালে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যেখানে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া মানে বিষকে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রহণ করা। অনেক সময় বায়ুদূষণের মাত্রার স্কোর এতই বেশি হয় যে, তা ২৭০-৩০০ ছুঁয়ে ফেলে, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বা ‘জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শীতকালে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ধুলাবালু, ইটভাটার ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে আটকে থাকা। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে দূষণ কিছুটা কমে এলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। গবেষণায় দেখা যায়, এ সময়ে ঢাকার মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৬৫ শতাংশ ঘটে থাকে। ফলে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষের মতো ঢাকার মানুষও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি দূষিত বাতাস গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪.২ মিলিয়ন মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণ দায়ী। বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, কয়লা-তেল-গ্যাসসহ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধূলিকণা এবং বর্জ্য পোড়ানো। এসব উৎস থেকে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা বায়ুতে মিশে মানুষের ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এই দূষণের প্রভাব সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে। ঢাকায় শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বয়স্করা হয়ে পড়ছেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু স্বাস্থ্যই নয়, বায়ুদূষণের এই অতিমাত্রায় বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতি ও পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই অবস্থায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ অতীব জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহার বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো, ধূমপান পরিহার, গাছ লাগানো ও বর্জ্য না পোড়ানোর মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সামাজিকভাবে নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। অবৈধ ইটভাটা ও কারখানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বিশাল। যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ, ইটভাটা আধুনিকীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, গণপরিবহন ও ইলেকট্রিক যানবাহনের প্রসার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সবুজায়ন প্রকল্প জোরদার করা। গাছ কাটা নিরুৎসাহিত করে বন ও বনায়ন সংরক্ষণ, নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও তার রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষিত হবে, অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়বে এবং পরিবেশ ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক ভারসাম্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশও পারে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সফল হতে। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রণয়ন, জরিমানা এবং কার্যকর তদারকি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের সংকট। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাব এক বিষাক্ত নগর, যেখানে শ্বাস নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধ নিয়ে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকার আকাশকে আবার নির্মল করে তোলাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত