যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট গ্রুপের দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। এ বছরের সূচক এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তার আগের বছরে বিশ্বজুড়ে ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রচর্চার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এসব দেশের মধ্যে মাত্র ২৫টি রাষ্ট্রে পূর্ণমাত্রায় গণতন্ত্রের চর্চা ছিল। ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ছিল ৪৬টি দেশে। ৩৬টি দেশে ছিল হাইব্রিড সরকারব্যবস্থা। আর কর্তৃত্ববাদী সরকার ছিল ৬০টি দেশে।
২০২৪ সাল ছিল ‘নির্বাচন বর্ষ’। কারণ, ওই বছর বিশ্বের শীর্ষ ১০ জনবহুল দেশের মধ্যে আটটিসহ ৬৪টি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীর্ষ ওই আট জনবহুল দেশ হলো—বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভোটও হয়েছে ২০২৪ সালে। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, অর্থাৎ ৪০০ কোটি মানুষ ওই বছর ভোট দিয়েছে। সে হিসাবে ২০২৪ সালে গণতন্ত্রের চর্চার পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইআইইউর ২০২৫ সালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের চর্চার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
এ কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন সম্ভবত নেই যে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। কারণ, নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু না হয়, তাহলে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ মানুষের ভোটাধিকারসহ সব ধরনের মৌলিক অধিকার খর্বিত হওয়া।
ইআইইউর প্রতিবেদনে আবার ফেরা যাক। এই প্রতিবেদনে যে ২৫টি রাষ্ট্রে পূর্ণমাত্রায় গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি হলো—নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ। এই ১০টি দেশের মধ্যে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে নির্বাচন হয়েছে ২০২৪ সালে। এর মধ্যে আইসল্যান্ডে ওই বছরের জুনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও নভেম্বরে পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছে। ফিনল্যান্ডে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই ধাপে হয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর আয়ারল্যান্ডে জুনে স্থানীয় নির্বাচন ও নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গণতন্ত্র সূচকের চতুর্থ অবস্থানে থাকা আইসল্যান্ডে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শতভাগ সুষ্ঠু। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শতভাগ না হলেও ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। রাজনৈতিক সংস্কৃতি শতভাগ সৌহার্দ্যপূর্ণ। নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা ৯৭ ভাগের বেশি। ফিনল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের অবস্থাও আইসল্যান্ডের মতোই, কিছু ক্ষেত্রে উনিশ আর বিশ।
ইআইইউর প্রতিবেদনে ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চার দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের ‘মোড়লখ্যাত’ এই দেশটির প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস নির্বাচনও হয়েছে ২০২৪ সালে। মার্কিন নির্বাচনের দিকে পুরো বিশ্বের নজর থাকায় এই দেশটির ভোটের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই দেশটির নির্বাচনী প্রক্রিয়া ৯১ শতাংশের বেশি যথাযথ। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রায় ৯০ ভাগ, আর নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা ৮৫ ভাগের বেশি নিশ্চিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে থাকায় ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চার দেশগুলোর কাতারে ঢুকে গেছে।
সহজ ভাষায় গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হলো যে শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসনকার্য পরিচালনা করে, তাকেই গণতন্ত্র বলে। গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার এবং জনকল্যাণের জন্য সরকার।
গণতন্ত্রের এই সংজ্ঞার ভেতরেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ভোটার যদি ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পান কিংবা ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর নিরুৎসাহ থাকে, ভোটের পরিবেশ যদি উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, ভোটের ফলাফলে জনগণের রায়ের প্রতিফলন যদি না থাকে, তাহলে সেই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা যায় না। আর নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবেশও আর থাকে না। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ দেশ কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থার দিকে চলে যাওয়া। দিনে দিনে সেই কর্তৃত্ববাদী সরকারই স্বৈরশাসনের রূপ নেয়। আধুনিক বিশ্বে এমন অহরহ উদাহরণ আমরা দেখতে পাই।
এখানে দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের একটি তথ্য আবারও উল্লেখ করতে হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৬০টি দেশেই কর্তৃত্ববাদী সরকার ছিল। ৩৬টি দেশে ছিল হাইব্রিড সরকারব্যবস্থা, যেখানে সরকার ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছিল। মোটের ওপর ৯৬টি রাষ্ট্রেই গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত ছিল ওই বছর। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখা যাবে, ওই ৯৬টি রাষ্ট্রের কোনোটিতেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় না।
শাসকগোষ্ঠী যখন তার অবস্থান সুসংহত করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে, তখন প্রথমেই তারা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে। কারণ, তাদের শঙ্কা থাকে, জনগণের রায়কে যদি পাল্টে দেওয়া না যায়, তাহলে ক্ষমতায় থাকা তাদের জন্য অসম্ভব। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ কিংবা ওই সব প্রতিষ্ঠানে অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে করায়ত্ত করার। এসব করতে শাসকগোষ্ঠীকে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে হয়। এসব কাজে সফল হলে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা সরকারব্যবস্থা তারপর একধরনের ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে করে জনগণ কখনো মাথা উঁচু করে কথা বলতে না পারে, তাদের চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। এই ভীতির পরিবেশ সৃষ্টির জন্য শাসকগোষ্ঠী বেছে নেয় কণ্ঠরোধের সব পথ, বেড়ে যায় দমনপীড়ন, গুম-খুন। কণ্ঠরোধ করা হয় সমাজের দর্পণ সংবাদমাধ্যমেরও। ভীতির সেই পরিবেশে সংবাদমাধ্যম হাঁটে সেলফ সেন্সরশিপের পথে। কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা শাসকগোষ্ঠী দেশের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাকেও আঘাত করে। কারণ, সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে যেভাবে শাসকগোষ্ঠীকে প্রশ্ন করা যায়, তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা যায়, তা আর কোনো মাধ্যমে সেভাবে করা যায় না।
এদিকে গণতন্ত্রের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দু-একটি উদাহরণ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণতন্ত্র মার খেলে অর্থনীতিও দুর্বল হতে থাকে। কারণ, দুর্নীতি। ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ পাচার, লুটপাটের কারণে ভেঙে পড়ে অর্থনীতি। ‘দলদাস’ হয়ে ওঠা ব্যবসায়ী সমাজ তখন অধিক মুনাফার লোভে বাজারে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যাতে ভোক্তারা ‘জিম্মি’ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের আয় বাড়ে না, কিন্তু ব্যয় যায় বেড়ে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’। বাড়তে থাকে জনরোষ। বছরের পর বছর জমতে থাকা সেই রোষ কোনো এক ছুতোয় বিস্ফোরিত হয়। সেই বিস্ফোরণে কখনো কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটে, আবার কখনো বিস্ফোরণ ব্যর্থ হয়। বিস্ফোরণ ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে আরও বেশি মাত্রায় দমনপীড়ন।
ঠিক এ কারণেই নিজের ভোটের ব্যাপারে সব ভোটারের সতর্ক থাকা জরুরি। আপাতদৃশ্যে একজন ভোটার মানে একটি ভোট। কিন্তু একজন একজন করেই একটি দেশে কোটি ভোটার। হিসাবটা তখন এত সুবিশাল যে ভোটার সচেতন থাকলে, নিজের ভোট নিজে দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকলে নির্বাচনে কারচুপি করা, কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা শাসকগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও যে ভোট গণনার সময় নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা হয় না কিংবা ফল বদলে দেওয়া যে হয় না, তা বলা যাবে না। তবে সেটাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই প্রত্যেক ভোটারের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় হৃদয়ে ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ বাক্যটি ধারণ করা। পাশাপাশি নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। কারণ, জনপ্রতিনিধিকে যত বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি করা হবে, তত বেশি তাঁর পক্ষে প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া কঠিন হয়। ফলে একধরনের জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি হয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কিন্তু এটাই।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত’ নির্বাচন। এই নির্বাচনের নির্ণায়ক বা নির্ধারক ভূমিকায় তরুণেরা। গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে
৪ ঘণ্টা আগে
নানা জল্পনাকল্পনার পর অবশেষে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হবে। আশা করা যায় কয়েক দিনের মধ্যে দেশের মানুষ একটা নতুন সরকার দেখতে পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার জনগণের চাওয়া কতটুকু পূরণ করতে পারবে? কারণ, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
৪ ঘণ্টা আগে
আজ জাতীয় নির্বাচন। বহু ঘটনা-অঘটনের মধ্য দিয়ে দেশ আজ নির্বাচনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে দেশের জনগণ আজ তাদের রায় জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে। আজকের দিনটিতে দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসবে। তারই অপেক্ষায় রয়েছে মানুষ
৪ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রভাষার বিষয়টা তো দ্বন্দ্বেরই ঘটনা একটা। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব। বাংলা ভাষার কপালেই ছিল এটা যে, একেবারে শুরু থেকেই তাকে যুদ্ধ করে এগোতে হবে; যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। রাষ্ট্র কখনোই তার পক্ষে ছিল না। এত শত বছর পরে, হাজার বছরের ইতিহাস পার হয়েই...
১ দিন আগে