Ajker Patrika

গণতন্ত্র, ভোট ও মৌলিক অধিকার

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ৩৫
গণতন্ত্র, ভোট ও মৌলিক অধিকার

ধর্মীয় রাজনীতির মূল্য আরও বেড়েছে বিদ্যমান ব্যবস্থায় এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান হতাশায়। সমাজের ধনী যারা, তারাও আস্থা রাখতে পারছে না নিজের শক্তির ওপর। পেট্রো-ডলারের মালিকেরা নিজেরা তেমন ধার্মিক নয়। তবে ধর্মবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারলে তারা খুশি হয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরাও খুশি হয় ধর্মকর্ম দেখতে পেলে, এ জন্য প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করে।

নিজেরা তারা পুরোমাত্রায় বস্তুতান্ত্রিক, কিন্তু এদেশবাসীকে করে রাখতে চায় আধ্যাত্মিক। উদ্দেশ্য অভিন্ন। অবনত রাখা। বলাই বাহুল্য, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা তখনই আসবে, যখন মানুষের মানুষ হিসেবে বাঁচার আন্দোলনই প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। এটা সম্ভব শ্রমিকশ্রেণির সঠিক রাজনৈতিক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।

এই সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে আসছে সমাজের চিন্তাশীল মানুষের কাছে। ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের নেতৃত্ব চাই। গণতন্ত্রের জন্যও চাই। গণতন্ত্রের কথা এই দেশে অনেককাল ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু গণতন্ত্র কখনো সুযোগ পেল না প্রতিষ্ঠিত হওয়ার।

গণতন্ত্র বলতে যদি শুধু ভোট বোঝাত, তাহলে সেই গণতন্ত্র অর্থাৎ ভোটের গণতন্ত্রও টেকেনি, কেননা নির্বাচিত সরকার স্বৈরাচারী হয়েও ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, যেমন নির্বাচিত হয়েও কেউ কেউ ক্ষমতা পায়নি—অতীতে। কিন্তু গণতন্ত্র তো শুধু ভোটের ব্যাপার নয়, ব্যাপার মৌলিক অধিকারের। মৌলিক অধিকার সমাজে কেমন আছে, কতটা আছে তাই দেখে বুঝতে হবে দেশে গণতন্ত্র চলছে, নাকি চলছে স্বৈরতন্ত্র।

স্বাধীন দেশের এযাবৎ একটি ক্ষমতাসীন সরকারও গণতন্ত্রী ছিল না, তাদের অন্যান্য গুণ থাকা সত্ত্বেও নয়। তারা জনমত জানতে চায়নি, তাকে শ্রদ্ধা করেনি, ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাস করত না এবং জনগণকে মৌলিক অধিকার দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল না তাদের। পুরস্কার ও তিরস্কারে তারা বিশ্বাস করত, অধিকার দেওয়াতে নয়। দলীয় শাসন চেয়েছে, জাতীয় শাসন চায়নি।

তারপরে তো সামরিক শাসনই সরাসরি এবং ছদ্মবেশে এসেছে। সংস্কৃতিতে যে সামন্তবাদী উপাদানগুলো বিদ্যমান, তারা গণতন্ত্রের সমর্থক নয়। সেগুলো আনুগত্য ও বশ্যতা শেখায়, দ্বন্দ্ব শেখায় না, অন্ধকারকে পুষে রাখতে চায়, দূর না করে। সাম্রাজ্যবাদী মুরব্বিরা এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা চাইবে কেন? তারা তাঁবেদার রাষ্ট্র চায়, তাঁবেদার শ্রেণির শাসন কায়েম রাখাই অভিপ্রায় তাদের। কিন্তু আজকের বিশ্বে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চারদিকে যে ধরনের ধিক্কার ধ্বনি উঠেছে, বিশেষ করে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্রের একটা ভান চলছে, একধরনের ভঙ্গিও বলা যায়। এই ভান ও ভঙ্গির ব্যবস্থা থাকলেই বলা যাবে যে দেশে গণতন্ত্র আছে। বাস্তবতা কিন্তু গণতন্ত্রের ঠিক বিপরীত। তবে গণতন্ত্রের জন্য সমাজে আকাঙ্ক্ষাটা তীব্র হয়ে উঠেছে। স্বৈরশাসন অপমানকর।

তদুপরি স্বৈরশাসনে বাক্‌স্বাধীনতা থাকে না, বুর্জোয়ারা যে স্বাধীনতাকে বিশেষ মূল্যবান মনে করে। ওদিকে সরকারও চায় তার ক্ষমতায় অবস্থানটাকে দীর্ঘায়িত করে নিতে। কিন্তু সরকার যেভাবে নির্বাচনকে দেখে, রাজনৈতিক দলগুলো সেভাবে দেখে না। দলগুলো মনে করে, তাদেরকে জিততে হবে। বিরোধ আদতে এখানেই। তবে জনগণের দিক থেকে নির্বাচনে যে উৎসাহ আছে, তা বলা যাবে না। নির্বাচন তারা আগেও দেখেছে, তাতে সরকার বদল হয়েছে হয়তো, কিন্তু তাদের ভাগ্য মোটেই বদলায়নি। তা ছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে যাঁরা প্রধান ভূমিকা নিচ্ছেন, তাঁরা সবাই একসময়ে সরকারে ছিলেন আগে-পিছে। যেমন সরকার, তেমনি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—একইভাবে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আছে, রাজনৈতিক দলগুলো বাইরে রয়েছে। এ ছাড়া তাদেরকে আলাদা করে চেনা খুব যে সহজ, তা মোটেই নয়।

তবে বুর্জোয়া রাজনীতির পক্ষে নির্বাচন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রাজনীতিকেরা ক্ষমতায় যেতে চান, ক্ষমতায় যাওয়ার উপায় দুটি—একটি নির্বাচন, অপরটি সামরিক অভ্যুত্থান। সামরিক এবং ছদ্মবেশী অভ্যুত্থানে কেউ কেউ মন্ত্রী পদ-মর্যাদায়, অন্যরা, যাঁরা পারেননি তাঁরা, কেমন করে হবেন নির্বাচন না হলে? নির্বাচনে তাঁদের আগ্রহ সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু মুশকিল হলো, নির্বাচিত যে হতে পারবেন, তার নিশ্চয়তা নেই, কিংবা হতে পারলেও যে ক্ষমতা পাবেন, তারও প্রতিশ্রুতি নেই।

বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে বুর্জোয়া রাজনীতি এখন একটি কঠিন সংকটের মুখোমুখি। এমন সংকট আগে কখনো দেখা দেয়নি। তার গোটা অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে নির্বাচন ভিন্ন অন্য কোনো উপায় নেই ক্ষমতায় যাওয়ার। দাবার কিস্তিমাতের মতো অবস্থা। বুর্জোয়া বলেই রাজনৈতিক দলগুলো এমন কোনো আন্দোলন চায় না, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের বিন্যাস বিপর্যস্ত হয়। অতীতের ঝাঁকুনি সহ্য করা গেছে, আগামীর ঝাঁকুনি সহ্য করা অত সহজ না-ও হতে পারে।

ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব ক্রমেই সহিংস হওয়ার নানা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কার ভাগে কতটা পড়বে, সে মীমাংসা একেবারেই অসম্ভব; দ্বিতীয় সমস্যা, বাংলাদেশের সম্পদ এতই সীমিত যে ভাগের দাবিদার খুব বেশি হলে ভাগাভাগি অর্থহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা। ভাগাভাগি করা যাচ্ছে না, অথচ এক পক্ষ যে অপর পক্ষকে হটিয়ে দেবে, তা-ও কঠিন। সরকার পারে আরও কড়া হতে, তাতে আপাতত লাভ হলেও শেষরক্ষা হবে কি না, তা বলা মুশকিল। রাজনৈতিক দল পারে আরও প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলতে, কিন্তু বিপদ এই যে তাতে আম ও ছালা—দুটোই হাতছাড়া হওয়ার ভয় আছে, নেতৃত্ব চলে যেতে পারে ‘চরম’পন্থীদের হাতে, শুধু আশু নয়, ক্ষতি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী।

রাজনৈতিক দলগুলোর মূল শক্তি হলো জনসমর্থন, সেই সমর্থন পাওয়ার জন্য তারা নানা পন্থা অবলম্বন করে, এখন মনে হয় বুঝতেই পারছে না কী করবে। সমস্যাটা চোখে নেই, আছে থলিতে, রয়ে গেছে স্বার্থে। জনসাধারণের দৃষ্টিতে দেখলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। জনসাধারণ তার ভাগ্যের পরিবর্তন চায়, তার দরকার বিকল্প রাজনীতির। কিন্তু বর্তমান সরকার-সমর্থিত এবং বুর্জোয়া দলগুলো, এরা কেউই একে অপরের বিকল্প নয়। সবাই প্রায় সমানে সমান—ক্ষমতায় সবারই পরীক্ষা হয়ে গেছে এবং কেউ যে কারও চেয়ে খুব বেশি ভালো করেছে, তা নয়।

দলগুলোর প্রতিটি বুর্জোয়াদের এবং এরা সবাই মোটামুটি মার্কিনদের দ্বারা সমর্থিত। সমস্যাটার কেন্দ্রবিন্দুতে তাহলে রয়েছে এই ঘটনা যে বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্য দিয়ে সমাজের ইচ্ছা অভিব্যক্ত হচ্ছে না এবং সেই ইচ্ছা রাষ্ট্রের ওপর যে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, তা-ও অসম্ভব।

সমাজ একদিকে রাষ্ট্র, অন্যদিকে যদিও রাষ্ট্র চায় কর্তৃত্ব করবে সমাজের ওপর, তার ইচ্ছাকেই সমাজের ইচ্ছা বলে চালাতে চায় সর্বক্ষণ। রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে সমাজের বিরোধ পাকিস্তানি আমলের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। বারবার মুখোমুখি হয়েছে তারা একে অপরের, একাত্তরের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দুই পক্ষের। এখন পাকিস্তান নেই, তারপরও দুই পক্ষ আছে, তারা মুখোমুখি হচ্ছে বারবার। বর্তমান সরকারের শাসনামলে দ্বন্দ্বেরই প্রকাশ ঘটেছে, অধিক নগ্নভাবে।

রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজেরবিরোধটাকে এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে, যা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পর আর কখনো ঘটেনি, ঘটতে পারত এই আমলেই, যদি অনির্বাচিত সরকার দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সংসদকে কার্যকর করার সুযোগ দিত। সমাজ চায় রাষ্ট্র থাকবে তার নিয়ন্ত্রণে, অর্থাৎ সব সময়ে স্পষ্ট না হলেও সমাজের আকাঙ্ক্ষা সমাজতন্ত্রই। বুর্জোয়া রাজনীতি চড়ায় ঠেকেছে, সে তার নিজের অভিপ্রায় (ক্ষমতায় যাওয়ার) সফল করার সহজ পথ পাচ্ছে না দেখতে, অন্যদিকে জনগণের আস্থাও হারিয়ে ফেলছে। গণতন্ত্রের অর্জন করার রাস্তা খোলা নেই। জনগণের বাঁচার দাবিগুলো প্রতিষ্ঠা করা বিদ্যমান ব্যবস্থায় মোটেই সম্ভব নয়। চলতি সময় বুর্জোয়া রাজনীতির সংকটেরও বটে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত