Ajker Patrika

তিমিসমাজ যা শেখাতে পারে

আসিফ
তিমিদের ভাষা ডিকোড করার লক্ষ্যে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: পেক্সেলস
তিমিদের ভাষা ডিকোড করার লক্ষ্যে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: পেক্সেলস

বর্তমান পৃথিবী এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ, অন্যদিকে মানুষে-মানুষে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব, যুদ্ধবিগ্রহ এবং প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। আমরা যখন শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে মত্ত হয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছি, তখন সমুদ্রের অতল গহ্বর আমাদের এক ভিন্নধর্মী উচ্চতর চেতনার নীরব বার্তা দেয়। মহাকাশে ‘ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড’ পাঠানোর সময় মানুষ কেবল ভিনগ্রহের প্রাণের কথা ভাবেনি, বরং পৃথিবীর বুকে বাস করা তিমি ও ডলফিনের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে সেই মহাজাগতিক রেকর্ডে স্থান দিয়েছিল একটি বিশেষ স্বীকৃতির জায়গা থেকে। এই স্বীকৃতি ছিল এক বিনীত স্বীকারোক্তি—যে ‘চেতনা’ বা ‘বুদ্ধিমত্তা’ কেবল মানুষের একক বৈশিষ্ট্য নয়।

যখন আমাদের এই স্থলভাগের সভ্যতা ক্রমাগত সংঘাত আর বিভাজনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন সমুদ্রের বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণীরা আমাদের শেখাচ্ছে নিঃস্বার্থ পরার্থপরতা (আলট্রুইজম) এবং গভীর সামাজিক সংহতির এক অনন্য দর্শন। তিমির গান বা ডলফিনের সংকেত কেবল শব্দ নয়, বরং তা একটি অ-প্রযুক্তিগত সভ্যতার ভাষা; যা অস্ত্র বা হাতিয়ার ছাড়াই কেবল ‘সম্পর্ক’ ও ‘স্মৃতি’র ভিত্তিতে টিকে আছে লাখ লাখ বছর ধরে। পৃথিবীর এই অস্থির সময়ে তিমির রহস্যময় জগৎ এবং তাদের চেতনার স্বরূপ বোঝা কেবল বিজ্ঞানের কৌতূহল নয়, বরং এটি আমাদের নিজস্ব মানবিকতা ও বিশ্বদর্শনকে নতুন করে চেনার এক অপরিহার্য তাগিদ।

যেখানে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে প্রকৃতি ও অন্য প্রজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে, সেখানে তিমির ‘আন্তপ্রজাতি পরার্থপরতা’ বা আলট্রুইজম এবং মাতৃতান্ত্রিক নেতৃত্বে গড়ে ওঠা স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামো আমাদের সহাবস্থানের নতুন পাঠ দেয়। শুধু তা-ই নয়, তিমির ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা তাদের অ-প্রযুক্তিগত সভ্যতার ভিত্তি—যা অস্ত্র বা হাতিয়ার ছাড়াই ‘সম্পর্ক’ ও ‘স্মৃতি’র ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা সমুদ্রদূষণে পৃথিবীর পরিবেশই বিপন্ন করে ফেলিনি, সেই চেতনাকেও ধ্বংস করছি।

সমুদ্রের গভীরে উপাঙ্গের অভাবে এবং পরিবেশগত কারণে প্রাযুক্তিক সভ্যতার বিকাশ না ঘটলেও এক মর্যদাসম্পন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে বলেই সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো প্রতীয়মান করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির তিমি এবং ডলফিনের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কেবল শিম্পাঞ্জি বা মানুষের সঙ্গেই তুলনাযোগ্য। তিমিরা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। তারা কেবল তথ্য আদান-প্রদান করে না, বরং নিজেদের সামাজিক সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটায় তাদের শব্দে। তারা নিজেদের মধ্যে গল্প করে এবং তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তিমির বিশাল মস্তিষ্ক, তাদের প্রখর আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি ধারণে সহায়তা করে, যার মাধ্যমে তারা বছরের পর বছর তাদের পরিভ্রমণের পথ এবং সদস্যদের ইতিহাস মনে রাখতে পারে।

শরীরের তুলনায় তিমির চেয়ে মানুষের মস্তিষ্ক বেশি হলেও পরিমাণের দিক থেকে তিমির মস্তিষ্ক গড়ে ছয় গুণ বড়। বিজ্ঞানীরা যখন তিমির মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করেছেন, তখন তাঁরা এমন কিছু গঠন খুঁজে পেয়েছেন, যা মানুষের চেয়েও বিস্ময়কর। যেমন, তিমির নিওকর্টেক্স মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভাঁজযুক্ত (জাইরিফিকেশন)। ভাঁজ যত বেশি, তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা তত উন্নত। এটি তাদের জটিল সামাজিক সংকেত বিশ্লেষণে অবিশ্বাস্য গতি দেয়। স্পিন্ডল নিউরন নামের এই বিশেষ কোষগুলো সহানুভূতি, সামাজিক সচেতনতা এবং অনুভূতির জন্য দায়ী। একসময় মনে করা হতো এটি কেবল মানুষের আছে, কিন্তু তিমির মস্তিষ্কে এই কোষের সংখ্যা মানুষের চেয়েও বেশি। এটি প্রমাণ করে যে তিমির আবেগময় জগৎ অত্যন্ত গভীর এবং তারা অন্য প্রজাতির প্রাণীর কষ্টও অনুভব করতে পারে।

স্পার্ম তিমিরা প্রধানত ‘কোডাস’ নামক দ্রুত এবং উচ্চশব্দের ক্লিক ব্যবহার করে যোগাযোগ করে, যা অনেকটা মোর্স কোডের মতো শোনায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তিমিরা ক্লিকের কম্পাঙ্ক এবং সময় পরিবর্তন করে এমন কিছু প্যাটার্ন তৈরি করে যা মানুষের স্বরবর্ণের (যেমন ‘a’ বা ‘i’) মতো অর্থাৎ ধ্বনিগত বর্ণমালার কাজ করে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে কোডাসের আলাদা ভান্ডার থাকে। একেকটি গোষ্ঠীর সদস্যতা নির্ধারিত হয় তাদের নির্দিষ্ট উপভাষা বা ডায়ালেক্ট দ্বারা। এই পরিচয়গুলো বংশগত নয়, বরং বড়দের কাছ থেকে তারা সাংস্কৃতিকভাবে শেখে।

দাঁতবিহীন হাম্পব্যাক তিমিরা তাদের জটিল ও সুরেলা গানের জন্য বিখ্যাত। এই গানগুলো স্তরক্রমিকভাবে (হায়ারারকিকাল) গঠিত। এগুলোর মধ্যে হাম্পব্যাক তিমির রহস্যময় সংগীত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন কাঠামো: ছোট ছোট ইউনিট মিলে তৈরি হয় ফ্রেজ, ফ্রেজ থেকে থিম এবং থিম মিলে তৈরি হয় দীর্ঘ গান, যা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে সাংস্কৃতিক বিবর্তন: একটি অঞ্চলের সব পুরুষ তিমি একই গান গায় এবং সময়ের সঙ্গে সেই সুর ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়। এই সাংস্কৃতিক সঞ্চালন মানব ভাষার বিবর্তনের সঙ্গে এক বিস্ময়কর সমান্তরালতা তৈরি করে।

তিমিদের মধ্যে আন্তপ্রজাতি পরার্থপরতা লক্ষ করা যায়। হাম্পব্যাক তিমিরা প্রায়ই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিল মাছকে খুনি তিমির হাত থেকে রক্ষা করে। আবার স্পার্ম তিমিরা গভীর সমুদ্রে খাবার ভাগ করে খায় এবং অসুস্থ সদস্যকে পানির উপরিভাগে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। এই আচরণগুলো প্রমাণ করে যে, নিঃস্বার্থ সহযোগিতা একটি সফল সামাজিক গোষ্ঠীর জন্য একটি মৌলিক বিবর্তনীয় কৌশল। এমনকি সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজের নাবিক বা যাত্রীকে বাঁচানোর রেকর্ডও রয়েছে।

তিমির ভাষা ডিকোড করার লক্ষ্যে বর্তমানে ‘প্রজেক্ট সেটি’ নামে আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের গভীরে হাইড্রোফোন অ্যারে এবং তিমির পিঠে বায়ো-সেন্সর ট্যাগ লাগিয়ে শব্দ ও আচরণের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁরা দেখছেন তিমির ভাষা মানুষের ভাষার মতো ‘জিপ্ফের সূত্র’ (জিপ্ফ’স ল) মেনে চলে কি না। প্রজেক্ট সেটির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কেবল তিমিদের ভাষা বোঝা নয়, বরং এআই ব্যবহার করে তাদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন করা।

এখানে একটি গভীর প্রশ্ন জাগে: হাতিয়ার ব্যবহার ছাড়াই কি সভ্যতা সম্ভব? মানুষের সংজ্ঞায়িত সভ্যতা মূলত পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। তিমির ক্ষেত্রে হাত বা আঙুল এবং আগুনের অভাব প্রযুক্তিগত উন্নতির পথকে রুদ্ধ করেছে। সমুদ্রের তরল পরিবেশে স্থায়ী কাঠামো বা লিখিত নথি সংরক্ষণ করা অসম্ভব। ফলে তিমির সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে তাদের কণ্ঠস্বর ঐতিহ্যের ওপর। মানুষের সভ্যতা যদি হয় হাতিয়ারের, তবে তিমির সভ্যতা হলো সম্পর্ক ও স্মৃতির। তাদের বিশাল মস্তিষ্ক ও উন্নত লিম্বিক সিস্টেমই হলো তাদের অলিখিত লাইব্রেরি।

যদি আমরা তিমির সঙ্গে একটি দ্বিমুখী যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি, তবে আমাদের বিশ্বদর্শনে আমূল পরিবর্তন আসবে: আমরা বুঝতে পারব ভাষা এবং চিন্তা কেবল মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়। আমাদের নৃতাত্ত্বিক অহংকারের অবসান ঘটবে। পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের চেতনার সঙ্গে সহ-অবস্থানের শিক্ষা আমাদের ভিনগ্রহের প্রাণের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আরও ধৈর্যশীল করে তুলবে। যখন সমুদ্রের তলার না বলা ইতিহাস আমরা তাদের নিজস্ব বয়ানে শুনতে পাব, তখন প্রকৃতির প্রতি আমাদের ধ্বংসাত্মক মনোভাব বদলে এক গভীর মমতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে। তিমিদের কোনো দালানকোঠা নেই, কিন্তু তাদের একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাস থাকার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি তাই হয়, তাদের জটিল সামাজিক বন্ধন এবং নিঃস্বার্থ সহযোগিতা আমাদের শেখায় যে—সভ্যতা মানে কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, সভ্যতা মানে হচ্ছে জ্ঞান, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত