Ajker Patrika

সড়ক দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ আবেদনের সময় বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব

  • সময় বাড়াতে বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের
  • সারা দেশে দুই বছরে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে ২,৪৪৪ পরিবার
  • ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করার দাবি
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

সাধারণ মানুষের কাছে কার্যত অজানা থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হলে সড়ক পরিবহন আইনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইনে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য ৫ লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তির জন্য ৩ লাখ টাকা দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এই ক্ষতিপূরণ পেতে দুর্ঘটনা ঘটার এক মাসের (৩০ দিন) মধ্যে আবেদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আবেদনের এই সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সময়সীমা ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬০ দিন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, দুর্ঘটনা ঘটার ৬০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পেতে আবেদন করার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, এটি খুব শিগগির কার্যকর হবে এবং এতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা উপকৃত হবেন; পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের আবেদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা তহবিলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা রয়েছে ৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা। গত নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১০৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই কার্যক্রমের আওতায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪৪৪টি পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০০টি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। এ সময়ের মধ্যে ১২০ কোটি টাকার এফডিআর এবং ১০০ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড কেনা রয়েছে আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে।

ক্ষতিপূরণ পাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরের বেশি সময়ে বিআরটিএর টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা সার্কেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এসব এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে চাঁদপুর সার্কেলে, যা সেখানে দুর্ঘটনার হার কম হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সহায়তায় কাজ করা বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড অকুপেশনাল হেলথ সেফটির প্রধান সমন্বয়কারী মো. সেলিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ পেতে পরিবহনশ্রমিকদের নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে গিয়ে বিআরটিএর বিভিন্ন সার্কেল অফিসে ভিন্ন ভিন্ন নথি চাওয়া হয়, যা কেন্দ্রীয়ভাবে স্পষ্ট নয়। এতে আবেদনকারীরা হয়রানির শিকার হন। অনেক সময় আগেই ধরে নেওয়া হয়, দুর্ঘটনার জন্য পরিবহনশ্রমিকেরাই দায়ী। এতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।’

মো. সেলিম আরও বলেন, ‘অনেক সময় সার্কেল অফিস আবেদন নিতে গড়িমসি করে; পাশাপাশি পুলিশ জিডি নিতে অনীহা দেখায়। অথচ জিডি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। এসব কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সময়মতো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান না।’

সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে আদায় করা জরিমানার অর্থ, সরকারি অনুদান, গাড়িমালিকদের দেওয়া চাঁদা, মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনের অনুদানসহ অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের অর্থ আসার কথা ছিল। তবে বাস্তবে তহবিলে অর্থ আসছে মাত্র একটি খাত থেকে। ট্রাস্টি বোর্ডের জন্য নির্ধারিত জনবল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে বিআরটিএ এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কারণে ক্ষতিপূরণ পেতে দেরি হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।

পরিবহন ইস্যু ও যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বড় দুর্ঘটনার পর পরিবারগুলো শোক, চিকিৎসা ও আইনি জটিলতায় পড়ে যায়। তাই আবেদন করার সময়সীমা ৬০ দিনে বাড়ানোর প্রস্তাবটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া অনলাইন আবেদন দ্রুত চালু করা দরকার। জেলা পর্যায়ে একক ও স্পষ্ট নির্দেশনা নিশ্চিত করাও জরুরি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত