Ajker Patrika

ডিজিটাল সময়ে এসে নিয়মরক্ষার হালখাতা

সোহানুর রহমান, জবি
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬: ৫৫
ডিজিটাল সময়ে এসে নিয়মরক্ষার হালখাতা
হালখাতার অন্যতম অনুষঙ্গ টালিখাতা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগরেরা। গত রোববার পুরান ঢাকা বাবুবাজারে। ছবি: আজকের পত্রিকা

জীর্ণ পুরোনোকে ঝোড়ো হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে এসেছে নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩। সারা দেশে চলছে বর্ষবরণে নানা আয়োজন। আর এই বর্ষবরণের ঐতিহ্যেরই অন্যতম বিলীয়মান অনুষঙ্গ হালখাতা উৎসব। নতুন বছরের প্রথম দিন ব্যবসায়ীদের খদ্দেরের সঙ্গে দেনা-পাওনা মিটিয়ে লেনদেন হালনাগাদ করার পর্বই হালখাতা।

বড় মুদিদোকান থেকে শুরু করে নানা রকম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত লাল কাপড়ে বাঁধানো হিসাবের খাতাই হলো হালখাতা। তাতে লেখা থাকত নিয়মিত খদ্দেরের সঙ্গে দেনা-পাওনার হিসাব। পয়লা বৈশাখের সকালে ব্যবসায়ীরা তাঁদের পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরোনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করাতেন। নবায়ন হতো ব্যবসায়িক লেনদেনের। অতীতের সহজ-সরল বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসবই ছিল এটি। কালের প্রবাহে প্রযুক্তির পরিবর্তনে অনেক ব্যবসায়ীই আর মোটা খাতায় লেনদেনের বিবরণ রাখেন না। সে কাজ এখন হচ্ছে কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে। হালখাতা অনুষ্ঠানের দাওয়াতের চিঠির জায়গা নিয়েছে মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ। চৈত্রের শেষ দিকে বাণিজ্যিক এলাকায় লাল সালুতে বাঁধানো নুতন হিসাবের খাতা ফেরি করে বিক্রি করার দৃশ্যও এখন বিরল।

হালখাতার প্রস্তুতি দেখতে এ প্রতিবেদক পয়লা বৈশাখের সপ্তাহখানেক আগে রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার,পাটুয়াটুলি, সূত্রাপুর, ইসলামপুর ও শ্যামবাজার ঘুরে দেখেন। দেখা যায় বিভিন্ন দোকানের সামনে টাঙানো হচ্ছে বেলুন, রঙিন ফিতা। ভেতরে সাজানো হচ্ছে মুখোশ, ঘুড়ি, বৈশাখী টুপি, একতারা ও ডুগডুগির মতো লোকজ সংস্কৃতির উপকরণ দিয়ে। তবে ঘটা করে হালখাতা আয়োজনের প্রস্তুতি নেই তেমন।

বাংলাবাজারের এম মান্নান অ্যান্ড কোং-এর কর্মচারী শ্যামল বলেন, আগে হালখাতাকে ঘিরে আলাদা প্রস্তুতি থাকত। নতুন খাতা, দাওয়াত কার্ড, আপ্যায়ন—সবকিছু মিলিয়ে একটা বড় আয়োজন হতো। এখন বেশির ভাগ লেনদেন সারা বছরই অনলাইনে মিটে যাচ্ছে, তাই আগের মতো প্রস্তুতির প্রয়োজনও পড়ছে না।

তাঁতীবাজারের শরীফ জুয়েলার্সের স্বর্ণ ব্যবসায়ী মাধব বলেন, ‘ডিজিটাল পেমেন্ট চালু হওয়ার পর বকেয়া বেশি দিন পড়ে থাকেই না। আগে বছরশেষ হলে হালখাতার দিন পুরোনো দেনা শোধ করতে আসতেন ক্রেতারা। এখন সে চিত্র নেই বললেই চলে।’

এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী বললেন, একসময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল হালখাতার জমজমাট আয়োজন। সকাল থেকেই পুরোনো খদ্দেরদের ভিড়ে সরগরম থাকত দোকানপাট। বকেয়া পরিশোধ, মিষ্টিমুখ, আপ্যায়ন সব মিলিয়ে তৈরি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেক স্থানে গান-বাজনা ও বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থাও থাকত। কিন্তু এখন তা চোখেই পড়ে না।

ইসলামপুরের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের সময়ের পরিবর্তন ছাড়াও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরলেন। তিনি বলেন, ব্যবসার ইদানীংকালের পরিস্থিতিও হালখাতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বড় আয়োজন করার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। তাই অনেকে ছোট পরিসরে হালখাতা করছে। শুধু নিয়মরক্ষার জন্য আর কি।

আপ্যায়নের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে ব্যবসায়ী নিজের দোকান বা গদিতেই মিষ্টিমুখের আয়োজন করতেন। এখন অনেক ব্যবসায়ী খদ্দেরদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে আপ্যায়ন করাচ্ছেন। তাতে চাকচিক্য থাকলেও থাকছে না আগের মতো ঘরোয়া আন্তরিকতা।

শাঁখারীবাজারের দোলা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক বিকাশ সেন বলেন, আগে হালখাতা ছিল ব্যবসায়ী ও ক্রেতার সম্পর্ক জোরদারের একটা বড় মাধ্যম। এখন ডিজিটাল লেনদেনের কারণে সে সম্পর্ক অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। তাই হালখাতাও অনেক ক্ষেত্রে শুধু নিয়মরক্ষার আয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে। সে সময় বাংলার কৃষকেরা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করতেন। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাঁদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সরকারের প্রতি প্রজার দায়দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রমেই পয়লা বৈশাখ দিনটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও আনন্দের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত