Ajker Patrika

এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছানোর আবেদন করেছে সরকার

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছানোর আবেদন করেছে সরকার

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী গত বুধবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।

চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা ও কয়েকজন অর্থনীতিবিদের আহ্বানে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার নেপাল ও লাওসের মতো একই সময়ে উত্তরণে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। এ–সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।

গত বুধবার খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে যা যা করা দরকার, সবই করা হবে। আজ থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ বিলম্বিত করার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই দিনই ইআরডি সচিব সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন।

নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিঠিতে যুক্তি দিয়েছে, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।

আরও বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে—কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। আর দেশি সংকটের মধ্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় মতো বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের মতে, এসব অভিঘাতের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস এবং কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি কম এবং কম বিনিয়োগের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমেছে। শুধু তাই নয়, সুশাসন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণে দেশি ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। আর্থিক খাতের এই ধারাবাহিক সংকট ও ভঙ্গুরতা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনের ধারাকে বিপরীতমুখী করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে যায়। যেমন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, জীবিকা সুরক্ষা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামাল দেওয়া। এর ফলে উত্তরণ-সংক্রান্ত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এসব কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিতে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাংলাদেশ অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় অল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা হারালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উন্নয়ন গতি দুর্বল হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সরকার।

শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হলেও ধারাবাহিক সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ, ল্যান্ডলকড ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ও স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটসবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয়ের (ইউএনওএইচআরএলএলএস) করা স্বাধীন ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করেছে সরকার।

ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রস্তুতি সময়কাল ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরেই উত্তরণ জাতিসংঘের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। মূল্যায়নে এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজমের (ইএমএম) অধীন সংকট-প্রতিক্রিয়া বিধান ব্যবহার করে সময় বাড়ানোর আবেদন বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

সরকার চিঠিতে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যা উত্তরণের টেকসই ও অপরিবর্তনীয় চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ইউএন সিডিপির বার্ষিক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন (২৪-২৭ ফেব্রুয়ারি) শুরুর আগেই আবেদন জমা দিতে পরামর্শ দিয়েছিল। তার আগে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধিকে বিষয়টি উপস্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি।

তিন বছর অন্তর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)—এই তিন সূচকেই সফল হয়। ২০২১ সালে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে। না হলে আরও দুই বছর আগেই হতো।

এলডিসি থেকে উত্তরণে তিনটির মধ্যে দুটি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়—মাথাপিছু জিএনআই ১ হাজার ৩০৬ ডলার বা তার বেশি, এইচএআই ৬৬ বা তার বেশি এবং ইভিআই ৩২ বা তার নিচে। বাংলাদেশ প্রথমবার ২০১৮ সালে তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে এবং ২০২১ সালেও তা ধরে রাখে। ওই সময় মাথাপিছু জিএনআই ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, এইচএআই ৭৫ দশমিক ৪ এবং ইভিআই ২৭। ২০২৪ সালে মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮২০ ডলারে।

জানা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করে সফল হয়েছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। ২০২৩ সালে দেশটি গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানোর আবেদন করে এবং সিডিপি তা অনুমোদন করে তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের উত্তরণও নির্ধারিত সময়ে হয়নি।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, উত্তরণের মানদণ্ডের বিচারে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, টেকসই উত্তরণের জন্য স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিতে বেশি অগ্রগতি হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে দেশ। ফলে উত্তরণ টেকসই করতে আরও সময় দরকার।

তিনি আরও বলেন, সিডিপি আবেদন মূল্যায়ন করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়। সেখানে প্রস্তাবের পক্ষে–বিপক্ষে ভোট হবে। তাই ভারত, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করতে এখন থেকেই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত