Ajker Patrika

প্রতিটি হত্যাকারীর বিচার নিশ্চিত করবে বিএনপি: মাহদী আমিন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২০: ৩৮
প্রতিটি হত্যাকারীর বিচার নিশ্চিত করবে বিএনপি: মাহদী আমিন
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন শুক্রবার দিয়াওতাই হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং আহতদের আর্তনাদকে ধারণ করে বিএনপি প্রতিটি হত্যাকারীর বিচার নিশ্চিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘যারা গুম-খুন, হামলা-মামলা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, অবশ্যই তাদের প্রত্যেকের বিচার হবে। বর্তমান সরকারের সময়ে আমরা যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলছি, অবশ্যই বিচার বিভাগ তাঁর মতো স্বাধীনভাবে–হত্যাযজ্ঞে যাঁরা ছিলেন, যাঁরা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, যাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের যে প্রাপ্য সাজা, তা নিশ্চিত করবে।’

আজ শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন। বর্তমান সরকারের পাঁচ মাস পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

গত ৫ মাসে সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন থাকবে, বাক স্বাধীনতা থাকবে, মানবাধিকার থাকবে। এটা শুধু কথার কথা না। গত ৫ মাসে তা প্রমাণিত হয়েছে।’

উপদেষ্টা মাহদী বলেন, ‘একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মাত্র পাঁচ মাসে বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে জনগণের সমর্থন ও আস্থার কারণে। গত ১৫০ দিনে সরকার কেবল সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন সরকারের পাঁচ মাসের সাফল্যকে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে বিভক্ত করে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। সরকারের প্রথম অর্জন হিসেবে জনগণের আস্থা ও সমর্থনকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সময়ে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের একটি শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা করা হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তনু হত্যা মামলা ও শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামি এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

সংসদের প্রথম ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাস হয়েছে, যার মধ্যে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ অন্যতম। মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা প্রত্যাখ্যানের নজিরও তৈরি হয়েছে। ঢাকা মহানগরের বাইরে ৪টি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ঢাকায় ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশে নেমেছে, রিজার্ভ ৩৬.৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং মার্চে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

সরকারের দ্বিতীয় অর্জন হিসেবে মাহ্দী আমিন উল্লেখ করেন, ইশতেহার বাস্তবায়নে নারীদের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের কৃষক কার্ড, ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়া কার্ড এবং প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালু করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এ রূপ নেবে। ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অনার্স পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা মূল্যে শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, মিড-ডে মিল, এবং প্রবাসে উচ্চশিক্ষায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা চালু করা হয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্য ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’এবং পথশিশু পুনর্বাসনে ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং ২০০ সরকারি ভবনকে চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় ও হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানো হয়েছে।

সরকারের তৃতীয় অর্জন হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা হয়েছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জনবান্ধব বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ এবং ব্যাংক পুনমূলধনীকরণের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাসের পাশাপাশি শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১০টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২০.০৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।

চতুর্থ অর্জন হিসেবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে লালগালিচা সংবর্ধনা মিলেছে। চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। ভারতের ভিসা সেবা পুনরায় চালু ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিরক্ষায় গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০ রাডার স্থাপন এবং পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’শব্দের পুনর্বহাল করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

পাঁচ নম্বর অর্জন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি, বন্যাদুর্গত ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-জেলেদের সরাসরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ভিআইপি প্রটোকল কমিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিরোধী দলকে অবাধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিয়ে সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, বর্তমান সরকার ইশতেহারের ৩১ দফা ও জুলাই সনদ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে উন্নয়নের গালগল্প হলেও বাস্তবে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছিল। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী কোনো ব্যক্তি-বন্দনায় বিশ্বাসী নন। তিনি দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এবারের জীবন বান্ধব বাজেট পাসের পর বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়নি।

অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার মনে করে। তবে স্বাধীন সাংবাদিকতার আড়ালে অপসাংবাদিকতা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সাম্প্রতিক একটি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে আন্দোলনকারীর সংখ্যা সীমিত থাকলেও বিপুলসংখ্যক মোবাইল সাংবাদিকের উপস্থিতির কারণে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। দীর্ঘদিনের ঋণগ্রস্ত ও অকার্যকর ব্যবস্থা রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি ৫ মাস বয়সী সরকারকে সংস্কারের জন্য সময় দিতে এবং ভিত্তিহীন প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত