বন্দর কর্তৃপক্ষের এফডিআর সরকারি ব্যাংকে রাখার সুপারিশ

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সব অর্থ সরকারি ব্যাংকে জমা রাখার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কমিটি। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে, বিশেষ করে, সমস্যাগ্রস্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে বন্দর কর্তৃপক্ষের এফডিআর বিনিয়োগ, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও অর্থ উত্তোলন না করা এবং নীতিমালাবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে বৈঠকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
আজ রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির অষ্টম বৈঠকে এসব সুপারিশ করা হয়। সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা, প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে কমিটিকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়।
গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কমিটির আগের বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট ১১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংকে রয়েছে ১৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তারল্যসংকটে থাকা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ ও ইউনিয়ন ব্যাংকে রয়েছে মোট ১ হাজার ৮২ কোটি টাকার এফডিআর।
সূত্রে জানা যায়, আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়, ব্যাংকে এফডিআর করার ক্ষেত্রে তখনকার নিয়ম ছিল ৭৫ শতাংশ সরকারি ও ২৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, কমপক্ষে পাঁচ বছরের পুরোনো ব্যাংক হতে হবে এবং তাদের সুনাম থাকতে হবে। তবে বন্দরের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বক্তব্য অনুযায়ী, এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বলা হয়, বেসরকারি ব্যাংকে ২৯ শতাংশ ও সরকারি ব্যাংকে ৭১ শতাংশ অর্থ রাখা হয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পরবর্তী সময়ে নিয়ম পরিবর্তন করে ৫০-৫০ করা হয়েছে এবং সেই নিয়মের ভিত্তিতেই তারা অর্থ রেখেছে। তবে কমিটি বিষয়টি নিয়ে আগামী বৈঠকে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করতে বলেছে।
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাবসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অডিট আপত্তি আদায়, সমন্বয়, অবলোপন, প্রমার্জন, নিয়মিতকরণ, ভূতাপেক্ষ অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে নিষ্পত্তির বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কেউ যেন দায়মুক্তি না পান, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলেও কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ই-বিলিং ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক পরিশোধ এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনার ও যানবাহন-সংক্রান্ত সমস্যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া খালি কনটেইনারের নামে বন্দর থেকে মালবাহী কনটেইনার বের করে নেওয়া এবং কনটেইনার চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়ে আগামী বৈঠকে কমিটিকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম, নির্ধারিত ড্রাফট ও নাব্যতা অর্জন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং এসব প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনিয়ম চিহ্নিত করা ও সংশ্লিষ্ট অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের তহবিল থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপচয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন কমিটির সদস্য সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক এবং মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া।









