Ajker Patrika

পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’

বাসস, ঢাকা 
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৩৪
পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। সেই সঙ্গে তাঁর তৎকালীন ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির ছবিও বইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকে নতুন অধ্যায় হিসেবে এটি স্থান পাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে বহুল আলোচিত এই দলিলটিকে পাঠ্যভুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, আগামী বছরের শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘এনসিসিসি সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবে।’

এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিত অংশে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল মুক্তিকামী মানুষের জন্য ‘তূর্যধ্বনি’র মতো’।

এনসিটিবি জানায়, প্রবন্ধটির মূল বর্ণনা শুরুর আগে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ব্যাখ্যায় ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ ও ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গদ্যের প্রবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের এক অনন্য আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রবন্ধের মূলকথায় যা আছে—

মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি। নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল—সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো...২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এল। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম।’

চট্টগ্রামে পাক বাহিনীর ষড়যন্ত্র অনুধাবন ও ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সন্দেহজনক গতিবিধির বিবরণ দিয়ে মেজর জিয়া উল্লেখ করেন—‘১লা মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আঁচ করতে পারছিলাম কী ঘটতে যাচ্ছে...১৩ই মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো। এর মধ্যেই পাকিস্তানি জেনারেলরা একের পর এক বিমানে আসতে লাগলেন...এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস...দ্রুত ঘনিয়ে এলো পঁচিশ-ছাব্বিশের সে রাতটি। রাত ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার আমার কাছে নির্দেশ পাঠালেন। নৌবাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হলো আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য...’

নিবন্ধে জিয়াউর রহমান আরও লেখেন, ‘আগ্রাবাদের এক ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেল...ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চস্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে বহু নিরীহ মানুষ। যে সময়ের জন্য এত দিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, “উই রিভোল্ট।” নির্দেশ দিলাম, ষোলোশহর ছুটে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটালিয়নের সবাইকে।’

জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘ষোলোশহর এসে মুহূর্তে একটি রাইফেল কেড়ে নিলাম তাদের একজনের কাছ থেকে...ব্যাটালিয়নের সব অফিসার আর জোয়ানদের এক জায়গায় একত্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলাম। বললাম, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি। তারা এই ঘোষণাটির জন্যই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উল্লাসধ্বনি করে সাড়া দিল। পর মুহূর্তেই সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন ২টা ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ ১৯৭১। জাতির জন্যে অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তটি।’

পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন ও সামরিক কৌশলের বর্ণনা দিয়ে মেজর জিয়া লেখেন, ‘রাত ৪টায় রেললাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রা করলাম। পথে ইপিআর-এর একশজন আমাদের সঙ্গে যোগ দিল...২৬শে মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের বাহিনীকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো হানাদারের মোকাবিলার জন্য। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই প্রথম সম্মুখসমর, পাকিস্তানি শিবিরে তখন আতঙ্ক। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো।’

কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণার স্মৃতিচারণা করে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ...সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম—স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছি, সে কথাও লেখা হলো সেই প্রথম ঘোষণায়...বেতার তরঙ্গের সে ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা পড়ল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনল: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে...২৭শে মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়ে গেল “স্বাধীন বাংলাদেশ” কথাটি। “সে ছিল সত্যি এক অলৌকিক ব্যাপার!”’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত