Ajker Patrika

গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাজনীতিতে সহিংসতার অবসান হয়নি: ইফতেখারুজ্জামান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৪: ২৬
গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাজনীতিতে সহিংসতার অবসান হয়নি: ইফতেখারুজ্জামান
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ছবি: আজকের পত্রিকা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান হয়নি; বরং এসব প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব বিকাশ ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

এমনটাই বলেছেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’—শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির কারণে রাজনৈতিক দলগুলোতে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক দলের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এ পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।’

দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত থাকা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা ও দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিযোগিতায় এ প্রবণতা দৃশ্যমান। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ ধরনের রাজনীতির অবসান বা পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও নিয়মিত বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।’

গবেষণায় সাতটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সংবিধানের সাংঘর্ষিক অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান দলগুলোর নাম উল্লেখ করেন। এগুলো হলো—জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বিএনএল।

গবেষণার জন্য ১০টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে কেন তথ্য পাওয়া যায়নি। এই বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, তাঁরা বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। লিখিত চিঠি, টেলিফোন এবং সরাসরি দলীয় কার্যালয়ে গিয়েও তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দলগুলো সাড়া দেয়নি। এ তালিকায় বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ রয়েছে বলে তিনি জানান।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন বাণিজ্য এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনো কোনো দলীয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তৃণমূল পর্যায়েও একজন প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ নিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অর্থের উৎস এবং কারা অর্থায়ন করছেন, তা জানার সুযোগ খুবই সীমিত। অধিকাংশ লেনদেন অপ্রকাশ্যে হওয়ায় অর্থের বৈধতা ও প্রকৃত উৎস যাচাই করা কঠিন। রাজনৈতিক দল পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা নয়, বরং অর্থের উৎস ও সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ এবং বৈধতার আওতায় আনা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে বৈধভাবে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনপ্রণেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়ন করা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে।’

গবেষণায় রাজনৈতিক সহিংসতার যে পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে, এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবর ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গবেষণার ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং একই দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আহত ও নিহত নেতা-কর্মীদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার হতাহতদের এ পরিসংখ্যানে যুক্ত করা হয়নি। কারণ, ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা শুধু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ছিলেন না; সাধারণ মানুষও এতে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘাতের হিসাবের সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের হতাহতের তথ্যের তুলনা করা যাবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর অনিয়ম সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন আগে থেকেই অবগত থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় অনেকেরই জানা। তবে গবেষণার মাধ্যমে তথ্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা। কেন বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সে প্রশ্নের জবাব রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত