Ajker Patrika

প্রতিটি অপরাধের পেছনে জুয়া নয়তো মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ০৩
প্রতিটি অপরাধের পেছনে জুয়া নয়তো মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বুধবার ক্র্যাব-এর ৪৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিটি অপরাধের পেছনে কোনো না কোনোভাবে জুয়া অথবা মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বিশেষ করে, যুবসমাজের অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে তারা মাদকাসক্ত হয়ে অপরাধে জড়িয়েছে অথবা মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে অপরাধ করেছে। একইভাবে জুয়ায় আসক্তিও নানা অপরাধের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

আজ বুধবার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার ও সাজা দিলেই অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। কেন অপরাধ হচ্ছে, সমাজকে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করে সেই মূল কারণ চিহ্নিত করতে হবে। অপরাধকে তিনি উপসর্গের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, জ্বর যেমন কোনো রোগের উপসর্গ, তেমনই অপরাধও অনেক সময় অন্য সমস্যার উপসর্গ। মূল কারণ চিহ্নিত করে সেখানে সমাধান আনতে পারলে অপরাধের হার কমানো সম্ভব।

বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে র‍্যাবের বিশ্লেষণের বরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেখা গেছে, কিছু গুরুতর অপরাধের পেছনে জুয়া ও মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্প্রতি একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মাদকাসক্ত ছিলেন। কেউ নেশার কারণে অপরাধ করেছেন, আবার কেউ নেশার সামগ্রী কেনার অর্থ জোগাড় করতে অপরাধে জড়িয়েছেন। একইভাবে জুয়া ও মাদকের অর্থের প্রয়োজন থেকে একজন অপরাধী আরও নানা অপরাধে জড়িয়েছেন বলেও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মন্ত্রী বলেন, জুয়া ও মাদকের জায়গায় যদি নিয়ন্ত্রণ আনা যায়, তাহলে সমাজে অপরাধের হারও কমবে। এ জন্য অপরাধের মূল কারণ নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ জরুরি।

অনুষ্ঠানে অপরাধের ধরন নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কারণে অপরাধের ধরনও বদলে গেছে। এখন সাইবার স্পেসে মাদক, জুয়া, ব্ল্যাকমেলসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধ শনাক্ত করতে শুধু ঘটনাস্থল বা অবস্থান শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; টেলিফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ডিজিটাল তথ্য আদালতে মামলার প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপন করতে হচ্ছে।

অপরাধের ধরন পরিবর্তিত হলেও সে অনুযায়ী পুলিশকে এখনো পুরোপুরি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, এ কারণে সরকার শিগগির সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন ও প্রতিটি ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়েও সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। থানা ও উপজেলা পর্যায়েও এ বিষয়ে কর্মকর্তারা কাজ করবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদক শনাক্তকরণ ও পরীক্ষার জন্য জেলা পর্যায়ে ল্যাবরেটরি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড এবং ফরেনসিক ও কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধের তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে অনেক অপরাধই ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে, স্ক্যাম ও সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে একাধিক দেশের অপরাধী চক্র জড়িত থাকে। বিভিন্ন দেশে পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেলসহ নানা ধরনের সাইবার অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় দেশীয় সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।

অপরাধবিষয়ক রিপোর্টারদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ক্রাইম রিপোর্টিং মূলত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের সাংবাদিকতায় অনেক পড়াশোনা ও অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে, ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম ও সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা এবং কর্মকর্তার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান প্রয়োজন হতে পারে।

ক্রাইম রিপোর্টারদের ঝুঁকি ভাতার দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ঝুঁকি ভাতা মূলত সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে ঝুঁকি নিয়ে ক্রাইম রিপোর্টিং করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত হলে তাঁর জন্য কোনোভাবে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা তিনি চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতা অথবা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) প্রকল্পের মাধ্যমে এ ধরনের সহায়তার সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রিপোর্টিং ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ক্রাইম রিপোর্টারদের সনদ দেওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখার আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন ও সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়। সে অনুযায়ী আইনও সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করতে হয়। পুরোনো আইনের মাধ্যমে নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলা অনেক সময় সম্ভব হয় না।

অনলাইন জুয়ার উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, পুরোনো জুয়া প্রতিরোধ আইনের মাধ্যমে বর্তমানের অনলাইন ও সাইবার স্পেসভিত্তিক জুয়া মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে আধুনিক আইন করা হয়েছে। সেখানে সাইবার স্পেসে জুয়া, ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম, ফিক্সিংসহ বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব হচ্ছে সমাজে সচেতনতা তৈরি করা এবং নতুন আইনে কোন অপরাধের কী শাস্তি রয়েছে, তা মানুষকে জানানো। আইন, বিচারব্যবস্থা, সাংবাদিকতা ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত ভূমিকার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অ্যাসিড সন্ত্রাসের উদাহরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সাংবাদিকদের ভূমিকার কারণে অ্যাসিডসংক্রান্ত অপরাধ প্রায় বিলুপ্তির পর্যায়ে এসেছে। একইভাবে অন্যান্য অপরাধও নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে আইনি ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব।

ক্র্যাবের সভাপতি মির্জা মেহেদী তমালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব পদমর্যাদা) মো. রাশেদ খান প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত