Ajker Patrika

২০২৬ সালের সাত মাসের ছিনতাই

পথ চলতে ছিনতাইয়ের ভয়

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 
পথ চলতে ছিনতাইয়ের ভয়
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

রাজধানী ঢাকার পথচলতি মানুষের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে ছিনতাই। নগরের ছিনতাইপ্রবণ বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও ছিনতাই হচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন সড়কে গত শনিবার প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন নিহত হওয়ার ঘটনা ছিনতাইকারীদের বেপরোয়াভাবকেই সামনে এনেছে। তবে মামলার সংখ্যায় নগরের ছিনতাই পরিস্থিতি বোঝার উপায় নেই।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে মাত্র ১৮৯টি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত বা আহত না হলে কিংবা বড় অঙ্কের টাকা ছিনতাই না হলে ভুক্তভোগীরা হয়রানি, ঝামেলার ভয়ে অভিযোগ নিয়ে থানায় যান না। কেউ কেউ ছিনতাই মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এদিকে একের পর এক ছিনতাই এবং শনিবারের ঘটনার পর পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, সারা দেশে তালিকা অনুযায়ী ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে টহল জোরদার করতে বলা হয়েছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারির কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে সারা দেশে ১ হাজার ৬৭টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ও ডিএমপি এলাকায় মামলা হয়েছে ৪৪৩টি। অর্থাৎ সারা দেশে মোট ছিনতাই মামলার প্রায় ৪১.৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগে। ঢাকা বিভাগের মোট মামলার ১৮৯টিই ডিএমপি এলাকায়।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে শনিবার ভোরে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা স্বামীর সঙ্গে রিকশায় থাকা বগুড়ার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে তিনি রিকশা থেকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নিলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ওই প্রধান শিক্ষক চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন এবং বাস থেকে নেমে রিকশায় করে ফার্মগেটে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। নিহত শিক্ষিকার স্বামী আব্দুল মতিন শনিবার মর্গের সামনে বলেন, সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা সংসদ ভবনের সামনে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা তাঁর ধারণাতেই ছিল না।

র‍্যাব গতকাল রোববার ওই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে।

এর আগে ১০ আগস্ট উত্তরায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে ডিএল পেট্রলপাম্পের কর্মীদের বহন করা গাড়ি থামিয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় ডিবি ও র‍্যাব অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

বিভিন্ন এলাকায় পথচলতি মানুষের টাকা, মোবাইল ও মালামাল ছিনতাই হচ্ছে হরহামেশা। নারীরাও ছিনতাইকারীদের টার্গেট।

বাংলাদেশ পুলিশের মাসভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে দস্যুতার মামলা ছিল ১৬৩টি। ফেব্রুয়ারিতে ১৩৪টি, মার্চে ১৪২, এপ্রিলে ১৫২, মে মাসে ১৬৭, জুনে ১৪৯ এবং জুলাইয়ে ১৬০টি মামলা হয়েছে।

পুলিশের হিসাব বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০৯টি ছিনতাই মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। রাজশাহীতে ১২০, খুলনায় ১০২, সিলেটে ৬৬, রংপুরে ৪৩, ময়মনসিংহে ৩৩ এবং বরিশালে ৩০টি ছিনতাই মামলা হয়েছে। রেলওয়ে এলাকায় হয়েছে ২১টি।

ডিএমপির সদর দপ্তর জানায়, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডিএমপির ৫০ থানায় ১৮৯টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ ডিএমপি এলাকা ছাড়া ঢাকা বিভাগে ২২৫টি ছিনতাই মামলা হয়েছে।

পুলিশের সূত্র বলছে, জনসংখ্যার ঘনত্ব, বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, নগদ অর্থের লেনদেন, যানজট, রাত ও ভোরের নির্জন সড়ক এবং অপরাধীদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ—এসব কারণে রাজধানীতে ছিনতাই বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি ভোর ও রাতে কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত আলো, নজরদারি ও টহলের ঘাটতিও এই অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে কিছুদিন পর তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার পুরোনো অপরাধে জড়াচ্ছে।

যাত্রাবাড়ীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ এলাকায় হরহামেশা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পথ চলতে ভয়ে থাকতে হয়।

মানবাধিকার সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ, বেশির ভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় না।

গত জুনে মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের মাথায় বেড়িবাঁধে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে মোবাইল ও মানিব্যাগ খোয়ান অটোমোবাইল কোম্পানির কর্মী ইমতিয়াজ ও সাদমান। তবে তাঁরা মামলা করেননি। মোবাইলের জন্য সাদমান জিডি করেন। তবে ইমতিয়াজ জিডিও করেননি। তিনি বলেন, মামলা বা জিডি করলে কিছু ফেরত পাওয়া যাবে, এমন আশা তিনি করছেন না।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গ্রেপ্তার বা আটকের পাশাপাশি বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত হওয়াটা জরুরি। অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত হলে এর একটা প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, চলন্ত রিকশার নারী যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ায় মোটরসাইকেল ব্যবহার এবং গাড়ির ব্যবহার নগরে ছিনতাইয়ের একটি পরিচিত কৌশল। এমন ঘটনায় শুধু অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী হারানো নয়, প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মৃত্যু সেই ঝুঁকিই সামনে এনেছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সারা দেশে ছিনতাইকারীদের তালিকা করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের কাছে তাদের এলাকার তালিকা রয়েছে। সেই অনুযায়ী অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করাও হচ্ছে। তবে আসামিদের অনেকেই জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই পুলিশের সব ইউনিটকে টহল জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত